পণ্যের কর হার আলাদা নির্ধারণের সুপারিশ

নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়নের আগে ‘নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার’ মূল্য নিয়ন্ত্রণে আলাদা করহার নির্ধারণে পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে। নতুন আইনে সংকুচিত ভিত্তি ও ট্যারিফ মূল্যের কোনো বিধান না থাকায় নিত্যপণ্য ও সেবার মূল্যবৃদ্ধির শঙ্কায় এ পদক্ষেপ নেয়ার কথা বলা হয়েছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এ সংক্রান্ত নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ে। ভ্যাট আইন কার্যকরের পর কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে তার ওপর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে একটি বিশ্লেষণও তৈরি করা হয়েছে। সেখানে আগামী পহেলা জুলাই আইনটি বাস্তবায়নের আগে আলাদা করহার নির্ধারণ ছাড়াও আরও ৪টি পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া গেছে এসব তথ্য।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, নতুন আইনে অসাধু কর্মকর্তাদের দায়মুক্তি দিতে ‘সরল বিশ্বাসে কৃত কাজকর্ম রক্ষণ’ শিরোনামে একটি ধারা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সেটি প্রত্যাহার বা না রাখার সুপারিশ করা হয় ওই প্রতিবেদনে। পাশাপাশি সতর্ক করে বলা হয়েছে, সম্পূর্ণ অটোমেশন কাজ শেষ না করে আইনটি পুরোপুরি বাস্তবায়ন করলে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে। এটি কার্যকরের আগেই ভ্যাট ব্যবস্থাপনা পুরোপুরি অনলাইন করা দরকার।

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছেন, ১ জুলাই থেকে নতুন ভ্যাট আইনের আংশিক কার্যকর করা হবে। পর্যায়ক্রমে পুরো আইনটি বাস্তবায়ন করা হবে। তবে নতুন আইনে ভ্যাটের হার তিন স্তরের হবে- ৫, ৭ এবং ১০ শতাংশ। এছাড়া বর্তমানে যেসব ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ ভ্যাট আছে সেটি ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা হবে। তিনি বলেন, নতুন আইনে ‘নিত্যপণ্যের ক্ষেত্রে কোনো ভ্যাট দিতে হবে না। এমন বিধান রাখা হচ্ছে। ভ্যাট আদায়ে ফাঁকি রোধে ইলেকট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস বা ইএফডি ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হবে।

জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ভ্যাট রেট ১৫ শতাংশ, এটি বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশে বেশি। নতুন আইনে এই হার কমানো উচিত। তিনি বলেন, দেশে পুরোপুরি ভ্যাট কালচার গড়ে উঠেনি। এর বড় উদাহরণ- হাজার হাজার পোশাক ও মিষ্টির দোকান থাকলেও সে পরিমাণে ভ্যাট আদায় হচ্ছে না। ফাঁকি দেয়ার প্রবণতা এখনও বেশি। এজন্য ভ্যাটের হার কমিয়ে আওতা সম্প্রসারণ করতে হবে।

২০১৬ সলেই নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়নের কথা থাকলেও ১ জুলাই থেকে এটি কার্যকরের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আইনটি কার্যকরের পর এর প্রভাব ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে করা প্রতিবেদনে করণীয়সহ কয়েকটি সুপারিশও তুলে ধরা হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়কে এসব সুপারিশ পরীক্ষা করে দেখতে বলা হয়েছে।

সূত্র মতে, নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়নে পাঁচটি চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করে বলা হয়েছে, আইনটি সম্পূর্ণ অটোমেশনের ওপর নির্ভর হলেও ভ্যাট নিবন্ধন, রিটার্ন দাখিল, অনলাইনে কর পরিশোধ, হিসাব সংরক্ষণ, চালান ব্যবস্থাপনাসহ অন্যান্য বিষয়ে অটোমেশন কার্যক্রম শেষ হয়নি। এ অবস্থায় আইনটির বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এখন ১৫ ভাগ হারে ভ্যাট বিদ্যমান। নতুন আইনে সংকুচিত ভিত্তিমূল্য ও ট্যারিফ মূল্যের বিধান না থাকায় কতিপয় পণ্যের করহার বেড়ে মূল্যবৃদ্ধির শঙ্কা রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন আইনে করযোগ্য পণ্য ও সেবার মূল্য ঘোষণা এবং সেটি মূসক কর্মকর্তা কর্তৃক নির্ধারণের ব্যবস্থা নেই। এতে কার্যকর নিরীক্ষা ও কর দায়িতা নিরূপণ কঠিন হয়ে পড়তে পারে। এছাড়া ভৌগোলিক অবস্থান ও পণ্যভেদে একত্রে হিসাব সংরক্ষণের শর্তে কেন্দ্রীয় নিবন্ধন প্রদানের বিধান রয়েছে। অর্থাৎ একই প্রতিষ্ঠানের ভিন্ন ভিন্ন পণ্য ভিন্ন ভিন্ন স্থান থেকে সরবরাহ করলেও একত্রে হিসাব সংরক্ষণের শর্তে কেন্দ্রীয় নিবন্ধন গ্রহণ করতে পারবে। ফলে কার্যকর মনিটরিং দুরূহ হতে পারে এবং কর ফাঁকির শঙ্কা থাকবে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। সর্বশেষ বলা হয়েছে, এ আইনে কর রেয়াত গ্রহণের সুযোগ অবধারিত করা হয়েছে। কিন্তু উপকরণ ক্রয় সংক্রান্ত চালানপত্র অনলাইনে দাখিল নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে উপকরণ কর রেয়াত গ্রহণের যথার্থতা যাচাই করা সম্ভব না-ও হতে পারে। এতে রাজস্ব ফাঁকি দেয়ার প্রবণতা সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাতীয় আয়ের অন্যতম ভিত্তি ভ্যাট। বর্তমানে রাজস্ব আয়ের প্রায় ৩৮ শতাংশ আসে ভ্যাট থেকে। বিশ্বব্যাংকের প্রাক্কলন অনুযায়ী মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করতে হলে ২০২১ সালের মধ্যে রাজস্ব আয় সাড়ে চার লাখ কোটি টাকা হতে হবে। কিন্তু ২০১২ সালের এ আইনটি নানা কারণে কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। সার্বিক প্রস্তুতি নিয়ে ২০১৭ সালের জুলাই থেকে এটি কার্যকরের কথা থাকলেও ২ বছর পিছিয়ে ২০১৯ সালের জুলাই থেকে চালুর কথা রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রতিবেদনে আইনটি বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, নিত্যপণ্য এবং সেবার ক্ষেত্রে সংকুচিত মূল্য ও বিধানের পরিবর্তে ভিন্ন ভিন্ন ভ্যাট হার নির্ধারণ, ভৌগোলিক সীমার ভিত্তিতে মূল্য সংযোজন কর আইন ১৯৯১-এর অনুরূপ কেন্দ্রীয় ও ইউনিটভিত্তিক নিবন্ধন করা যেতে পারে। করণীয় সম্পর্কে বলা হয়েছে, নতুন আইনে যেহেতু কর রেয়াতের সুযোগ অবধারিত করা হয়েছে। ফলে অনলাইনভিত্তিক চালানপত্র দাখিল নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সব ক্ষেত্রে রেয়াত প্রদান অবারিত করা যাবে না।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনলাইনভিত্তিক ভ্যাট আদায় হলে স্বচ্ছতা আসবে এবং অসাধু কর্মকর্তাদের দৌরাত্ম্য কমার সঙ্গে ব্যবসায়ীদের ভ্যাট ফাঁকির প্রবণতা হ্রাস পাবে এবং বৃদ্ধি পাবে রাজস্ব আদায়। ভ্যাট আদায় লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় বেশি হলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পুরস্কার ও প্রণোদনা নতুন আইনে কার্যকর করারও পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

মন্তব্য লিখুন :