রাজশাহীতে রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন হবে ১০০ টন

রাজশাহীর আমের খ্যাতি বিশ্বজুড়ে। দেশের চাহিদা মিটিয়ে গেল কয়েক বছর ধরেই ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যাচ্ছে রাজশাহীর আম। এ বছরও রাজশাহীতে বিদেশে রপ্তানিযোগ্য আমের উৎপাদন হবে প্রায় ১০০ মেট্রিক টন। এর মধ্যে অন্তত ৫০ মেট্রিক টন আম বিদেশে রপ্তানি করতে চায় কৃষি বিভাগ।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, বিদেশে আম রপ্তানি করতে হলে ২৬টি শর্ত মানতে হয়। ব্যাগিং হচ্ছে ২৬টি শর্তের একটি। তবে ব্যাগিং করা না হলেও আমের মান ভালো হলে বাইরে রপ্তানি করা যায়। তবে বিদেশ যেতে হলে সব আমকেই কোয়ারেন্টাইন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। এ জন্য রপ্তানিকারকরা আম ঢাকার শ্যামপুর প্ল্যান কোয়ারেন্টাইন উইং সেন্ট্রাল প্যাকিং হাউসে নিয়ে যান। আমের মান ভালো হলে সেখানে ছাড়পত্র দেয় কর্তৃপক্ষ। এরপরই জাহাজের কনটেইনারে করে আম বিদেশে যায়। গত বছর কোয়ারেন্টাইন পরীক্ষার কড়াকড়িতে আম রপ্তানি কম হয়েছে।

রপ্তানি করতে জেলায় এখন প্রায় ৫০ হাজার আম উন্নত প্রযুক্তিতে 'ফ্রুট ব্যাগিং' করা হচ্ছে। এর বাইরেও ভাল জাতের কিছু আম উৎপাদন করা হচ্ছে বিদেশে রপ্তানি করার উপযোগী করে। গত বছর নানা জটিলতায় ফ্রুট ব্যাগিং পদ্ধতিতে চাষ করা আমের রপ্তানি কমে গেলেও এবার চাষি ও কৃষি কর্মকর্তারা আশাবাদী। তাই এই মুহুর্তে রাজশাহী মহানগরী ও জেলার বাঘা উপজেলায় ফ্রুট ব্যাগিং করা হচ্ছে।

সব শর্ত মেনে গত বছর ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ২৫ মেট্রিক টন আম রপ্তানি করেছেন রাজশাহীর ১৪ জন ব্যবসায়ী। এর আগে ২০১৭ সালে রপ্তানি করেছিলেন ৩০ মেট্রিক টন। গত বছর রপ্তানিযোগ্য আম ছিল প্রায় ১০০ মেট্রিক টন। বিপুল পরিমাণ আম রপ্তানি করতে না পেরে কম দামে দেশের বাজারেই সেসব আম বিক্রি করতে হয়। অথচ এসব আম উৎপাদনে চাষিদের বাড়তি খরচ করতে হয়েছিল। তাই এ বছর আম রপ্তানি করে লাভের মুখ দেখতে চান স্থানীয় চাষিরা।

রাজশাহীর বাঘা উপজেলার পাকুরিয়া গ্রামের আম ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলাম সানা বলেন, বিদেশীদের শর্ত মেনে গত বছর আমরা ১৪ জন ব্যবসায়ী একসঙ্গে আম রপ্তানি করি। তাদের কাছ থেকে কোনো অভিযোগ আসেনি। এবারও আমরা ফ্রুট ব্যাগিং পদ্ধতিতে ভালোভাবে আম চাষ করেছি। আশা করছি, পাঠাতে পারব। কারণ, রাসায়নিক মুক্ত এই আমের গুণগত মান ভাল হওয়ায় চাহিদা রয়েছে।

তবে রাজশাহী অ্যাগ্রো ফুড অ্যাস্যোসিয়েশনের সভাপতি আনোয়ারুল হক বলেন, ২০১৬ সালে বেশি পরিমাণে আম রপ্তানি করা সম্ভব হয়েছিল। এর পরের দুই বছর কোয়ারেন্টাইনের কড়াকড়ির কারণে খুব বেশি পরিমাণ আম রপ্তানি করা যায়নি। এবার পরিস্থিতি কেমন হবে তা নিয়ে তারা উদ্বীগ্ন।

আনোয়ারুল জানান, স্থানীয় বাজারের চেয়ে আমের দ্বিগুন দাম পাওয়া যায় বিদেশে রপ্তানি করা গেলে। অবশ্য উন্নত প্রযুক্তিতে এই আম চাষে খরচও হয় বেশি। গত বছর রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রায় তিন কোটি আম ফ্রুট ব্যাগিং প্রযুক্তিতে চাষ করা হয়। কিন্তু আম পাঠাতে না পারার কারণে অনেক চাষি এতে আগ্রহ হারিয়েছেন। ফলে এ বছর ফ্রুট ব্যাগিং আমের পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে ৫০ হাজারে। তবে ক্রেতাদের সাড়া পেলে আগামী বছর আবারও ফ্রুট ব্যাগিং পদ্ধতির ব্যবহার বাড়বে।

অবশ্য এ বছর বাইরে আম পাঠানো না গেলেও দেশেই যেন বিক্রি করা যায় তার জন্য ভোক্তা তৈরি করা হয়েছে বলেও জানিয়েছেন রাজশাহী অ্যাগ্রো ফুড অ্যাস্যোসিয়েশনের সভাপতি আনোয়ারুল হক। তিনি বলেন, আমরা এ আমের দেশীয় ভোক্তা তৈরি করেছি। তারা ব্যাগিং প্রযুক্তির দেশীয় আম খাওয়ার জন্য খুবই আগ্রহী। তাই বিদেশে রপ্তানি করা না গেলেও এবার আম বিক্রি করা যাবে।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শামসুল হক বলেন, আম রপ্তানিতে আমাদের সক্ষমতা রয়েছে কমপক্ষে ১০০ মেট্রিক টন। তবে আম মানসম্মত হলে যত বেশিই উৎপাদন হোক না কেন, সবই রপ্তানি করতে পারব। মান ভালো হলে ফ্রুট ব্যাগিং ছাড়াও আম রপ্তানি করা যায়। আশা করছি, এবার অন্তত ৫০ মেট্রিক টন আম আমরা বাইরের দেশে পাঠাতে পারব।

অপরিপক্ব আমের বাজারজাত ঠেকাতে গেল কয়েক বছরের মতো এবারও আম পাড়ার ক্ষেত্রে সময় বেঁধে দিয়ে কঠোর নজরদারি করছে রাজশাহী জেলা প্রশাসন। বেধে দেয়া সময় অনুযায়ী, গত ১৫ মে থেকে রাজশাহীতে গুটি জাতের আম নামতে শুরু করেছে। উন্নতজাতের আমগুলোর মধ্যে গোপালভোগ ২০ মে, রাণীপছন্দ ২৫ মে, খিরসাপাতা বা হিমসাগর ২৮ মে এবং লখনা নামানো যাবে ২৬ মে থেকে। এছাড়া ল্যাংড়া আম ৬ জুন, আমরুপালি এবং ফজলি ১৬ জুন থেকে নামানো যাবে। সবার শেষে ১৭ জুলাই থেকে নামানো যাবে আশ্বিনা জাতের আম।

মন্তব্য লিখুন :