তাঁত সামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি, কুমারখালীর অনেক কারখানা বন্ধ

কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে সুতা, রং ও তাঁত তথা পারি সামগ্রীর রেকর্ড পরিমাণ মূল্যবৃদ্ধি এবং বস্ত্রের দাম না থাকায় অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। হাতে গোনা কিছু পিটলুম তাঁত ও পাওয়ারলুম কারখানা চালু রয়েছে। অচিরেই চালু থাকা বেশ কিছু কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

কাপড় প্রস্তুতকারক তাঁত ও পাওয়ারলুম কারখানা বন্ধ হলে সেই সাথে বন্ধ হবে ৪টি ডাইং, ৫টি প্রসেসিং কারখানাও। ফলে বেকার  হয়ে পড়বে হাজার হাজার শ্রমিক।

কুমারখালী উপজেলার পান্টি, কয়া, নন্দলালপুর, যদুবয়রা গ্রাম ছাড়াও শহরের প্রায় সব এলাকাতেই ছোট বড় কয়েক শত তাঁত ও পাওয়ারলুমে তৈরি কাপড় উৎপাদন ও বিপণন করা হয়। এখানকার কাঠের তৈরি হস্তচালিত তাঁত ও চীনের রিপিয়ার পাওয়ারলুমের কাপড় সারা দেশে প্রসিদ্ধ।

স্বাধীনতার পর থেকেই কুমারখালী তাঁতশিল্প এলাকা হিসেবে সুনামের সাথেই মাথা উঁচু করে জায়গা করে নিয়েছে। কর্মসংস্থান হয়েছে কয়েক লক্ষ বেকার নারী-পুরুষের। এখানকার স্বনামধন্য দেশীয় পোশাক তৈরি প্রতিষ্ঠান রানা টেক্সটাইল, বুলবুল টেক্সটাইল, নুরুল টেক্সটাইল, তাসলিমা টেক্সটাইল, গাফফার লুঙ্গি, উপহার লুঙ্গি, রয়েল-রিপন ফেব্রিকস বেশ সুনাম অর্জন করেছে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারও লাভ করেছে অনেক প্রতিষ্ঠান। কিন্ত তাঁত শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নির্ধারিত হয়নি আজও।

মালিক পক্ষের ইচ্ছা মাফিক কাজ করে প্রতিটি শ্রমিক। কোন নিয়োগ চুক্তি না থাকায় যখন তখন ছাটাই বা বের করে দিলেও কিছুই করার থাকে না। মালিকদের কাছে কারখানা বন্ধের কারন জানতে চাইলে তারা বলেন, সম্প্রতি অনেক কারখানায় কাঁচামাল, রং, সুতা তথা পারি সামগ্রীর যন্ত্রাংশ সংকট চলছে। তাঁত সামগ্রীর সরবরাহ কম থাকার কারনে দাম বেড়ে রেকর্ড পরিমাণ, ফলে শতাধিক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। আরো অনেক কারখানা বন্ধ করে দেয়ার মৌখিক নোটিশে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে এসব কারখানায় কর্মরত শত শত শ্রমজীবী মানুষ।

কুমারখালীর বস্ত্র শিল্পের কাঁচামালের ৯০ ভাগই আসে চীন থেকে। কিন্তু করোনা পরিস্থিতির কারণে কাঁচামালের সরবরাহ কমে যাওয়ায় এই চরম বিরূপ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে অনেক দ্রব্যের দাম দ্বিগুণ বেড়ে গেলেও কাপড়ের দাম বাড়েনি। ফলে লোকসান গুণতে গুণতে পুঁজি হারিয়ে ফেলেছে অনেক শিল্প মালিক। বাধ্য হয়েই তারা ব্যবসা বন্ধ করে দিচ্ছে। কেউ কেউ আমদানী নির্ভর ব্যবসায় টিকে থাকার চেষ্টা চালাচ্ছেন।

কুমারখালীর ‘বিকল্প লুঙ্গি‘র মালিক মাজেদুল ইসলাম ও রয়েল রিপন ফেব্রিক্স-এর মালিক আলাল হোসেন জানান, সুতাসহ অনেক তাঁত সামগ্রীর দাম অতীতের সকল রেকর্ড ভেঙ্গে ফেলেছে। এক‘শ পাউন্ড সুতা এক বছর আগেও সাড়ে ১২ হাজার টাকা ছিল। বর্তমানে সেটা ১৮ হাজার টাকায়ও পাওয়া যাচ্ছে না। ২ হাজার টাকার প্রতি বস্তা সাগুর দাম এখন ২ হাজার ৯ শত টাকা, মোম এক বছরের ব্যবধানে সাড়ে ৫ হাজার থেকে বর্তমানে ৮ হাজার টাকার উপরে,  হাইড্রোজ, কষ্টিক, নীল, এ্যসিড, রোডা, তুতেসহ সকল মাড়ি সামগ্রী দাম প্রায় দ্বিগুন হয়ে গেছে।

তিনি আরো জানান, সুতা, রং ও পারি সামগ্রীর রেকর্ড পরিমান মূল্যবৃদ্ধি এবং বস্ত্রের দাম বৃদ্ধি না থাকায় অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। বাধ্য হয়েই পেশা ছাড়ছে অনেকেই। কুমারখালীর কয়েকজন শিল্প কারখানার মালিক দেনার দায়ে এলাকা থেকে পালিয়েও গেছে। ব্যাংক নিলাম করে দিচ্ছে অনেক কারখানার জমি জায়গাও। সব মিলে কুমারখালীর তাঁতশিল্প সুতা সংকট রং ও পারি সামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধিতে তার ঐতিহ্য আর ধরে রাখতে পারছে না।