সরগরম গুরুদাসপুরের লিচুর মোকাম

থরে থরে সাজানো লাল টসটসে লিচুর পসড়া সাজিয়ে বসিয়েছেন বিক্রেতারা। বিক্রির জন্য চলছে হাঁকডাক। বিকিকিনিতে যোগ দিয়েছেন স্থানীয় চাষি, ব্যবসায়ী, দূরের ফরিয়া ও পাইকাররা। গ্রামের বাগানগুলোতে চলছে লিচু সংগ্রহের কাজ। চাষিরা লিচু সংগ্রহ করে আড়তে নিয়ে যাচ্ছেন বিক্রির জন্য।

গুরুদাসপুর উপজেলা নাজিরপুর ইউনিয়নের বেড়গঙ্গারামপুর কানুমোল্লার বটতালায় গড়ে উঠা আড়তের চিত্র এটি। গুরুদাসপুরের লিচু স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে আড়ত থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে দেশজুড়ে।

এখানে প্রতিবছরই লিচুর আড়ত বসে। চলতি মৌসুমেও এ আড়তে ১৫টি ভান্ডার গড়ে ওঠেছে। নাজিরপুর ইউনিয়নে প্রায় চার হাজার বিঘা জমিতে বিভিন্ন জাতের আগাম লিচুর আবাদ হয়। এসব লিচু গাছ থেকে সংগ্রহ করে কম সময়ে মোকামে পাঠাতে প্রত্যন্ত গ্রামেই ২০০১ সালে গড়ে উঠেছে এই আড়ত।  

আড়তদার সমিতির সভাপতি মো. সাখায়াত মোল্লা বলেন, এ অঞ্চলে মধুমাসের প্রধান অর্থকারী বাহারি ফল লিচু। লিচুকে ঘিরে বৈশাখের শেষ সপ্তাহ থেকে জ্যৈষ্ঠ মাসজুড়ে ছাত্র-ছাত্রীসহ নারী-পুরুষ কর্মব্যস্ত হয়ে পড়ে। প্রথম সকাল থেকে গ্রামের বাগানগুলোতে শুরু হয় লিচু সংগ্রহ আর প্রক্রিয়াজাতকরণ। এরপর দুপুর নাগাদ এই আড়তে বিক্রির উদ্দেশ্যে লিচুর পসরা সাজানো হয়। দূরের ব্যাপারিরা লিচু কিনে তা বিক্রি করছেন দেশের বিভিন্ন জেলায়। এ আড়ত থেকে প্রতিদিন প্রায় ৮০টির মতো ট্রাকে লিচু নেওয়া হচ্ছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, যশোরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায়। প্রতি ট্রাকে ২শ ঝুড়ি থাকে। এক একটি ঝুড়িতে থাকে ২ হাজার ২০০ পিচ লিচু। ব্যাপারিরা গ্রামের চাষিদের কাছ থেকে পাইকারি দামে লিচু কেনায় লাভবান হচ্ছেন চাষিরা। দুপুর থেকে রাত ১১টা নাগাদ চলে এই আড়তের লিচু ক্রয়-বিক্রয়। জুনের প্রথম সপ্তাহের দিকে এই আড়তের সম্পাতি ঘটবে।

পুরস্কারপ্রাপ্ত কৃষক আব্দুস সালামসহ অন্তত ১০ জন চাষি জানালেন, মৌসুমের শুরুতে শিলা বৃষ্টি আর ঝড়েরর কারণে লিচুর গুটি নষ্ট হয়েছে। পরে অনুকূল পরিবেশ পাওয়ায় লিচু আকারে বড় হয়েছে। দামও ভালো।

গত শুক্রবার নাজিরপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন লিচু বাগান ঘুরে দেখা গেছে, গাছে গাছে লাল টসটসে লিচু। লিচুর ভারে ডালপালাগুলো মাটি ছঁই-ছুঁই অবস্থা। বাগান থেকে লিচু সংগ্রহ করছেন শ্রমিকরা।

বিভিন্ন ফল ভান্ডার ঘুরে জানা গেল, প্রতি হাজার লিচু রকম ভেদে ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায় কেনাবেচা হচ্ছে। বাগান থেকে আনা লিচু উন্মুক্ত ডাকের মাধ্যেমে কিনছেন পাইকার-ফরিয়ারা। সেসব লিচু আড়তে স্তুপ করে রাখা হচ্ছে।

সিলেটের বাদামতলি থেকে আসা ‘মা-বাবা ফল ভান্ডার’ এর প্রতিনিধি রফিকুল ইসলাম বলেন, সাত বছর ধরে আড়ত থেকে লিচু কিনে তিনি সিলেটে বিক্রি করেন। প্রতিদিন তিনি দেড় থেকে দুই লাখ লিচু কেনেন। তার মতে এখানকার লিচুর আকার রং স্বাদ ভালো হওয়ায় দেশজুড়ে চাহিদা ব্যপক।

গুরুদাসপুরসহ এর আশপাশের বাগান থেকে সংগৃহিত লিচু এসে জমা হয় এই আড়তে। এছাড়া উপজেলার মাহমুদপুর, ঝাউপাড়া, মোল্লাবাজার, সোনবাজু, বিন্যাবাড়ী হাজি বাজারসহ বেশ কয়েকটি আড়তে লিচু নেওয়া হয়।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল করিম বলেন, এ বছর গুরুদাসপুর উপজেলায় প্রায় ৪০৯ হেক্টর জমিতে মোজফ্ফর, বোম্বাই ও চায়না-৩ জাতের লিচু চাষ করা হয়েছে। গত বছরের তুলনায় ৯ হেক্টর বেশি চাষ হয়েছে এ বছর। প্রাকৃতিক কারণে এবার ফলন একটু কম। তবে দাম তুলনামূলভাবে একটু বেশী হওয়ায় কৃষকরা খুশি। সব মিলিয়ে গুরুদাসপুর উপজেলায় চলতি মৌসুমে ৬শ মেট্রিক টন লিচু উৎ্পাদন হয়েছে। যার বাজার মূল্যে ৪০ থেকে ৫০ কোটি টাকা।

মন্তব্য লিখুন :