বর্ষা মৌসুম শুরুর আগেই ভয়াবহ হয়ে উঠেছে ঝালকাঠির বিষখালী নদীর ভাঙ্গন

বর্ষা মৌসুম শুরুর আগেই ভয়াবহ হয়ে উঠেছে ঝালকাঠির বিষখালী নদীর ভাঙ্গন। 

গত এ সপ্তাহে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং একটি প্রাথামিক বিদ্যালয় কাম সাইক্লোন সেল্টারের একাংশ নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। যে কোন সময় দুটি ভবনই সম্পুর্ন নদীতে চলে যাওয়ার আশংকা রয়েছে। হুমকির মুখে রয়েছে বিষখালীর দুই তীরের বেশ কয়েকটি বাজার, বসতবাড়ী, মসজিদসহ অসংখ্য স্থাপনা ও ফসলি জমি। 

সাম্প্রতিক ঘুর্ণিঝড়ের প্রভাবে ভাঙ্গন তীব্র হয়েছে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হলেও এব্যাপারে ঝালকাঠি পানি উন্নয়ন বোর্ড একেবারেই নিশ্চুপ রয়েছে। 

সাম্প্রতিক ঘুর্ণিঝড় ফাণির প্রভাবে অস্বাভাবিক পানি বৃদ্ধির কারণে ঝালকাঠির বিষখালী নদীর ভাঙ্গন তীব্র আকার ধারন করেছে। গত এক সপ্তাহে নদী ভাঙ্গনে রাজাপুরের মঠবাড়ী ইউনিয়ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের একটি শ্রেণী কক্ষ ও সদর উপজেলার পশ্চিম দেউরি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কাম সাইক্লোন সেল্টারের একাংশ নদীতে ভেঙ্গে গেছে। এছাড়াও হুমকির মুখে রায়েছে নদী তীরবর্তী লঞ্চ টার্মিনাল, বাজার, সড়ক, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তিন শতাধিক বসতবাড়ি, মসজিদ, কয়েকশ একর ফসলী জমি ও গাছপালাসহ বেশ কিছু স্থাপনা। 

রমজানের ছুটি থাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দুটির সমস্যা বোঝা না গেলেও ছুটি শেষে দুই প্রতিষ্ঠানে ৬শতাধিক শিক্ষার্থির পড়াশুনা অনিশ্চিত হয়ে পরার আশংকা রয়েছে। অন্যদিকে দুর্যোগের সময় সাইক্লোন সেল্টারের আশে পাশের লোকজনের আশ্রয় নেয়ার মতো জায়গা পাওয়া যাবে না।

জানাগেছে, নদী ভাঙ্গনে সদর উপজেলার পশ্চিম দেউরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কাম সাইক্লোন সেল্টারের বেজমেটের নিচের মাটি সরে গেছে। যেকোন মুহুর্তে দেবে যেতে পারে ভবনটি। আতঙ্কে স্কুলে ছাত্র-ছাত্রী আসা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। শিক্ষকরা স্কুলে এলেও সবসময় ভয়ে ভয়ে থাকেন। মাত্র ৫ বছর আগে প্রায় পৌনে তিন কোটি টাকা ব্যয়ে এ সাইক্লোন সেল্টারটি নির্মান করা হয়েছে। ইমারজেন্সি সাইক্লোন রিকভারি এন্ড রেষ্ট্রোরেশন প্রজেক্টের আওতায় বিশ্ব ব্যংকের অর্থায়নে ২০১৩-১৪ অর্থ বছরে পশ্চিম দেউরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কাম সাইক্লোন সেল্টারটি নির্মান করা হয়। এতে প্রক্কলিত ব্যায় ধরা হয়েছিল ২ কোটি ১০ লাখ টাকা কিন্তু ব্যায় হয় ২ কোটি ৭৬ লাখ টাকা।  ঐ সময় ভাঙ্গন কবলিত বিষখালী নদীর মাত্র ১০০ গজের মধ্যে এ ধরনের ভবন নির্মানে স্থানীয়রা আপত্তি জানিয়েছিল। কিন্তু কর্তপক্ষ তাতে কর্ণপাত করেনি। তখন বলা হয়েছিল পানি উন্নয়ন বোর্ড নদী শাসনের ব্যবস্থা করবে। কিন্তু এ ধরনের কোন পদক্ষেপ না নেয়ায় ভবনটি ভাঙ্গনের মুখে এসে পরেছে। ইতোমধ্যে সংযোগ সড়ক বিলীন হয়ে গেছে সরে গেছে ভবনের বেজমেমন্টের নিচের মাটি। বিলিন হয়ে গেছে স্থানীয় বাজারটিও। ভবনটি এখন শুধুমাত্র পাইলিং এর ওপর দাড়িয়ে আছে। 

নদী তীরের বসিন্দা হাওয়া বেগম বলেন, বসতঘরের পাশের জমিতে বিভিন্ন ফসলের চাষ করেছিলাম, পানি বেড়ে যাওয়ায় ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে জমিও নদীতে চলে গেছে। প্রতিদিন আতঙ্কে থাকি। সরকার আমাদের নদী ভাঙন রোধে পদক্ষেপ নিলে বেঁচে থাকতে পারতাম। 

বিদ্যালয়ের পাশের বাজারের বাসিন্দা আবদুর রব মৃধা বলেন, বিষখালীর ভাঙনে কয়েক দফায় বাজার সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এখন আবারো ভাঙন বাজারের কাছে চলে এসেছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাইক্লোন সেল্টারটি নদীর ভাঙনে পড়েছে। একাংশ বিলিন হয়ে গেছে। এখানে বাঁধ না দিলে যেকোন সময় বাজার ও বিদ্যালয় কাম সাইক্লোন সেল্টার নদীতে চলে যাবে। বিদ্যালয়ের পশ্চম শ্রেণির ছাত্র তরিকুল ইসলাম জানায়, আমরা সব সময় নদী ভাঙনের ভয়ে থাকি। ক্লাসে মনযোগ থাকে না। শিক্ষকরাও আতঙ্কের মধ্যে থাকেন। 

পশ্চিম দেউরি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ ফারুক হোসেন খান জানান, সাইক্লোন সেল্টারটি নির্মানের সময়ই স্থানটি ভাঙ্গনের মুখে ছিল। বর্তমান পরিস্থিতি সৃস্টির আগে থেকেই জেলা প্রশাসন, এলজিইডি, পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ বিভিন্ন দপ্তরে বহুবার যোগাযোগ করেও কোন সাড়া পাওয়া যায়নি।

এব্যপারে ঝালকাঠি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের সংগে যোগাযোগ করা হলে নির্বাহী প্রকৌশলী মো রুহুল আমীন জানান, ভবনটি নির্মানের সময় পানি উন্নয়ন বোর্ড নদী শাসনের একটি প্রকল্পের কাজ শুরু করলেও সেটি শেষ না করায় এ সমস্যার সৃষ্ঠি হয়েছে।

এ ব্যাপারে ঝালকাঠি পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ আতাউর রহমান এর সংগে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোন কথা বলতে রাজি হননি।

অন্যদিকে ঝালকাঠির রাজাপুরে বিশখালী নদীর ভাঙনে মঠবাড়ি ইউনিয়ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়টির পূর্বপাশের অংশটি নদীগর্ভে বিলিন হয়ে গেছে। ভাঙন অব্যাহত থাকলে যেকোন সময় পুরো বিদ্যালয়টি নদীগর্ভে চলে যাবে। ফলে অনিশ্চিত হয়ে পড়বে বিদ্যালয়ের তিন শতাধিক শিক্ষার্থীর লেখাপড়া। তীব্র বাঙনে বাদুরতলা লঞ্চ টার্মিনাল ও এর আশপাশের এলাকার সড়ক, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বাদুরতলা বাজারের অধিকাংশ ইতোমধ্যেই নদীগর্ভে বিলিন হয়ে গেছে। ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে শতাধিক বসতবাড়ী, একাধিক প্রাথমিক বিদ্যালয় ও বাদুরতলা জামে মসজিদসহ বেশকিছু স্থাপনা। 

পুখরীজানা গ্রামের বাসিন্দা মো. শহিদ শরীফ বলেন, ‘মঠবাড়ি ইউনিয়নের একমাত্র মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি ভেঙে যাওয়ায় শিক্ষার্থীরা বিপাকে পড়েছে। ঘুর্ণিঝড় ফণীর প্রভাবে বিশখালীতে আগাম ভাঙন শুরু হয়েছে। বর্ষা মৌসুমে ভাঙনের তীব্রতা আরো বাড়বে। বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী সাথী আক্তার ও অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. হৃদয় হোসেন জানান, ‘বিদ্যালয়টি ভেঙে গেলে আমাদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাবে। ‘আমাদের এলাকায় এক মাত্র মাধ্যমিক বিদ্যালয় এটি। এটি না থাকলে আমাদের দশ কিলোমিটার দূরের বিদ্যালয়ে যেতে হবে। সামনে আমাদের এসএসসি এবং জেএসসি পরীক্ষা। তাই বিদ্যালয়টি রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া একান্ত প্রয়োজন।’

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষাক মো. আইউব আলী বলেন, বিদ্যালয়টি রক্ষার জন্য একাধিকবার মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানানো হয়েছে। কর্তৃপক্ষ কার্যকর কোন উদ্যোগ না নেওয়ায় বিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি মো. হায়দার খান বিদ্যালয়ের জন্য অন্যত্র জমি কেনার চেষ্টা করছেন।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সোহাগ হাওলাদার বলেন, ঘুণিঝড় ফণির প্রভাবে অসময়ে নদী ভাঙন শুরু হয়েছে। ‘ভাঙন থেকে বিদ্যালয়টি রক্ষার জন্য ইতোমধ্যেই উর্ধতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। বিদ্যালয়টির পাঠদান যেন বন্ধ না হয়, সে বিষয়ে বিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদ ও স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের সাথে কথা বলেছি। বিদ্যালয়টি রক্ষা করতে প্রশাসনের পক্ষথেকে আন্তরিক প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে। খুব শিঘ্রই বিদ্যালয়টি সরিয়ে নেয়া হবে।

মন্তব্য লিখুন :