পুঠিয়ার সেই ওসির বিরুদ্ধে বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ

রাজশাহীর পুঠিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাকিল উদ্দিন আহম্মেদের বিরুদ্ধে শ্রমিক নেতা নুরুল ইসলাম হত্যা মামলার এজাহার পাল্টে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ওসির বিরুদ্ধে বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

সোমবার দুপুরে (১৬ সেপ্টেম্বর) হাইকোর্ট এই নির্দেশ দেন। এ সময় আদালত মন্তব্য করেন ‘এমন ঘটনা ঘটলে দেশের মানুষ যাবে কোথায়’।

জানা গেছে, শ্রমিক নেতা নুরুল হত্যা মামলার এজাহার বদলের অভিযোগে পুঠিয়া থানার সদ্য প্রত্যাহারকৃত ওসি সাকিল উদ্দীন আহম্মেদের বিরুদ্ধে ৪৫ দিনের মধ্যে তদন্ত করে আদালতে প্রতিবেদন দিতে রাজশাহীর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে নির্দেশ দিয়েছেন উচ্চ আদালত। নুরুল ইসলামের মেয়ে নিগার সুলতানার দায়ের করা এক রিট আবেদনের শুনানি নিয়ে বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. খায়রুল আলমের হাইকোর্ট বেঞ্চ সোমবার (১৬ সেপ্টেম্বর) রুলসহ এ আদেশ দেন।

আদালতে আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া। গত ২২ জুলাই একটি জাতীয় দৈনিকে ‘এজাহার বদলে দিলেন ওসি’ শীর্ষক প্রতিবেদনসহ বিভিন্ন জাতীয় ও আঞ্চলিক দৈনিকের প্রতিবেদন যুক্ত করে এ রিট করেন।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার মোটর শ্রমিক নেতা নুরুল ইসলাম হত্যা মামলাটি পুলিশ ভিন্নখাতে নিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

নিহত নুরুল ইসলামের মেয়ে নিগার সুলতানার অভিযোগ, পুঠিয়া থানার সদ্য প্রত্যাহারকৃত (ওসি) সাকিল উদ্দিন আহমেদ মামলার এজাহার বদলে দিয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে তিনি ওসির বিরুদ্ধে রাজশাহীর পুলিশ সুপার (এসপি) মো. শহিদুল্লাহর কাছেও লিখিত অভিযোগ করেছেন। একই সঙ্গে মামলাটি বাতিলের জন্য তিনি আদালতে আবেদন করেছেন। গত ১৮ জুলাই তিনি এসপির কাছে অভিযোগ করেন। একই দিন রাজশাহীর জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ও আমলি আদালত-২ এ মামলা বাতিলের আবেদন করেন নিগার সুলতানা।

গত ১১ জুন পুঠিয়ার কাঁঠালবাড়িয়া এলাকার এএসএস নামের একটি ইটভাটা থেকে শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি নুরুল ইসলামের মরদেহ উদ্ধার করেন পুলিশ।
এরপর ১৮ জুন জেলা পুলিশ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, নুরুল ইসলামের সমকামিতার বদঅভ্যাস ছিল। এলাকার এক কিশোরকে তিনি এ কাজে বাধ্য করতেন। ১০ জুন রাতেও নুরুল ইসলাম ওই কিশোরের সঙ্গে সমকামিতায় লিপ্ত হন। এক পর্যায়ে নিহত নুরুল ইসলাম মাটিতে পড়ে গেলে ওই কিশোর তাকে ইট দিয়ে আঘাত করে। এতে তার মৃত্যু হয়। তাই ওই কিশোরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং সে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে বলে জানায় জেলা পুলিশ।

তবে নিহতের পরিবার এই বিষয়টিকে ভিত্তিহীন বলছেন। লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, গত ২৪ এপ্রিল উপজেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে নুরুল ইসলাম সাধারণ সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এ নির্বাচনে পুঠিয়া থানার ওসি ক্ষমতার অপব্যবহার করে নুরুলকে পরাজিত করান। ফলে সাধারণ সম্পাদক হন আব্দুর রহমান পটল। এ ফলাফলের বিরুদ্ধে নুরুল ইসলামসহ পরাজিত তিনজন প্রার্থী আটজনকে আসামি করে আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন। এ ঘটনায় আদালত শ্রমিক ইউনিয়নের সব কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন।

নুরুল ইসলাম যে রাতে খুন হন সেদিনই আদালতের জারিকারক উপজেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের কার্যালয়ে গিয়ে আদালতের এ নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। তার সঙ্গে নুরুল ইসলামও ছিলেন। তখন আসামিদের সঙ্গে তার বাকবিতণ্ডা হয়। এরপর রাত সাড়ে ৮টা থেকে নুরুল ইসলামের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। পরদিন সকালে ইটভাটায় নুরুল ইসলামের মরদেহ পাওয়া যায়। এ ঘটনার পর নিহতের মেয়ে নিগার সুলতানা নির্বাচনী মামলাটির তিনজন আসামিসহ মোট পাঁচজনের নাম উল্লেখ করে পুঠিয়া থানায় একটি হত্যা মামলার অভিযোগ দেন। তখন ওসি সেটি সংশোধন করতে বলেন।

নিগার সুলতানা ওসির কথামতো সংশোধন করে ওই পাঁচজনকে সরাসরি আসামি না করে ‘সন্দেহজনক’ হিসেবে তাদের নাম উল্লেখ করেন। এরপর সেটি ওসিকে দিলে তিনি ‘দেখছি’ বলে নিগারকে বাসায় চলে যেতে বলেন। কিন্তু নিগার সুলতানার একটি এজাহারও মামলা হিসেবে রেকর্ড করেননি ওসি।

নিহতের শ্যালক মাসুদ রানা দাবি করেন, ওসি সাকিল উদ্দিন আহমেদ নিগার সুলতানার কাছ থেকে একটি সাদা কাগজে স্বাক্ষর নিয়ে রেখেছিলেন। সেই কাগজেই পরবর্তীতে মামলার এজাহার করা হয়। এতে কারও নাম নেই। সেই মামলাটিই এখন তদন্ত করছে জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। এ মামলাটিতেই এক কিশোরকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।

এজাহার বদলে দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে পুঠিয়া থানার প্রত্যাহার হওয়া ওসি সাকিল উদ্দিন আহমেদ বলেন, সাদা কাগজে সই নিয়ে এজাহার করা সম্ভব নয়। যে এজাহার হয়েছে, সেটা নিহতের পরিবারের সদস্যরাই দিয়ে গেছেন। এজাহার আমরা দেইনি।

নিহতের পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রসঙ্গে ওসি বলেন, ওই মামলার এখনো অগ্রগতি নেই। তদন্ত এখনো চলছে।

মন্তব্য লিখুন :