জোছনাধোয়া কয়েকটি নীলপদ্ম

--এই রাবু, এসিটা ছাড় তো! ঘেমে গেলাম একেবারে।
--তোমার এত গরম লাগে কেন মণিকা আপু? কই আমরা তো ঘামিনি একটুও। আর যখনতখন এসি ছাড়লে আন্টি বকবে, জানো না, বিল আসে মেলা।
--চুপ কর, বেশি কথা বলিস না বুঝলি? সেই ন'টা থেকে চলছে দলাইমলাই। এখন বাজে তিনটা। পার্লার ফাঁকা হলো একটু, কোথায় বসে একটু গা জুড়াবো, না কেমন চটাং চটাং কথা!
--হায় হায়, রাগ করো ক্যান, আমি তো আন্টির কথা বললাম। আন্টি রাগ করে তাই বললাম।
--হ্যাঁ তাই তো! আন্টির কথাই বললি! আর ওই যে বললি, আমি একাই ঘামি, তোরা কেউ ঘামিস না, তোদের গায়ে গরম লাগে না? তোরা তো আর এসে থেকেই ফেসিয়াল করছিস না! ভ্রু প্লাক, চুল কাটা এসব করছিস। ওসবে কত সময় লাগে? বসেই তো কাটাচ্ছিস বেশির ভাগ সময়। আর সিনেমা নাটকের গল্প করছিস, না হয় টিভি দেখছিস।
আয়নার সামনে চুলে চিরুণি বোলাতে বোলাতে সুখী বলে উঠলো, সিনেমা নাটক তুইও কিছু কম দেখিস না মণিকা! আজ না হয় বেশিরভাগ ফেসিয়াল তোর ঘাড়ে চেপেছে, অন্যদিন তো আমিই সব করি। তুই সেদিন আরাম করিস না? নিজের চেহারার যত্নও তো নিস। তাই তো স্কিনের ওই জেল্লা। ছিলি তো কালোমাটির ঢ্যালা।

চোখ পাকিয়ে মণিকা কিছু বলতে যায়। হাতের ইশারায় ওকে থামিয়ে দেয় রেখা। মোটাসোটা বেঁটেখাটো রেখা বেশ ধীরস্থির। রাগে না সহজে।তারওপর গতকাল ছেলেপক্ষ দেখতে এসেছিলো ওকে। পছন্দও করেছে। বিয়ে হবে দিনদশেকের মধ্যেই। মনটা তাই বেশ ফুরফুরা হয়ে আছে ওর। এই ফুরফুরা মনে ঝগড়া দেখতে ভালো লাগে কারও? কিন্তু মণিকা দমবার পাত্রী নয়। রেখাকে ঠেলা মেরে সরিয়ে গিয়ে দাঁড়ায় একেবারে সুখীর মুখের সামনে। বলে, খুব দেমাগ না তোর? কিসের এত দেমাগ দেখাস, ওই রূপ ধুয়ে ধুয়ে পানি খাবি? বিয়ের কয়দিনের মাথায় তো স্বামী দিলো তালাক, তারপর তো আর কেউ ঘুরেও তাকায় না!

ফুঁসে ওঠে সুখী। কী বললি তুই, কী বললি? এত্তবড় সাহস! বলে একটা হাত তোলে মারার জন্য। ঠিক এমন সময়ে আসে এক কাস্টমার। ঝট করে বেড়ে ওঠা উত্তেজনাটা মাঠে মারা গেলো একেবারে। সবার এখন হাসি হাসি মুখ। ভ্রু নাকি চুল, নাকি ফেসিয়াল, নাকি হাত-পায়ের যত্ন? মিষ্টি মুখে জিজ্ঞেস করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো ওরা।

আজই জয়েন দেয়া কবিতার তো চোখ ছানাবড়া! বেশ একটা জমাটি ঝগড়া দেখার লোভে চোখ তার কেবল চকচক করে উঠেছে কী ওঠেনি, ওমনি কিনা থেমে গেলো তা? আড়াই বছরের কোলের মেয়েটাও তার বেশ কৌতুহলী হয়ে উঠেছিলো। কিন্তু নাহ্, থেমে গেলো? নিভে গেলো ঝগড়ার আগুন দপ করে?

হামারঘে পাড়াতে তো এরকুম হয় ন্যা? একটুকুনা ছুৎনা পাইলে একবারে ঝাঁপাঝাঁপি, হাতাহাতি, লাঠালাঠি। ওগল্যা ঝগড়া দেখ্যাও সুখ! কতকিছু সিখা যায়! ক্যামন কইরা হাতে তালি দিয়্যা দিয়্যা, মুখ ঝামট্যা ঝগড়া করতে হয়, ঝগড়ার কুন সময় স্বামীকে লিয়্যা খোঁটা দিতে হয়, কুন সময় পরপুরুসের সাতে সুতার কথা তুলতে হয়, সউব! এগল্যা ঝগড়া দেখ্যা আরাম নাই। সুরু হইলো কী না, সেষ! ধুরু!

নতুন কাস্টমার মেয়েটা এতক্ষণে শুয়ে পড়েছে। ভ্রু সাইজ আর ফেসিয়াল করবে সে। ঝগড়ায় আশাহত কবিতা গিয়ে দাঁড়ায় কাস্টমারের পেছনে। সুখীর তোড়জোড় দেখে। কেমন করে হাত ঘোরায় সে তরুণীর তন্বী মুখে, দেখে দেখে রপ্ত করতে হবে কবিতাকে। এটাই তার কাজ এখন। শিখে নিতে হবে সব নিখুঁতভাবে। শিখে কাজ করতে পারলেই টাকা পাবে, নইলে নয় । টাকার বড় দরকার ওর। স্বামীটা তো তাড়িয়ে দিলো। কোলের মেয়েটার খরচ পর্যন্ত দেয় না। গরিব বাপের বাড়িতে ভাইদের সংসার। বাপ মা-ই বোঝা তাদের কাছে। তারওপর আবার কবিতা আর তার মেয়ে, দু দু'টো বাড়তি পেট। মুখের ওপর ভাইয়ের বউরা কত কথা বলে! ঘাড় ধরে বের করে দেয় না এই অনেক। মণিকার বাড়ি ওর বাপের বাড়ির কাছেই। পার্লারে কাজ করে বেশ চিকনাই ওর। ভালো ভালো জামাকাপড় পরে, পায়ে সুন্দর স্যান্ডেল, মুখের ভাষাও কত সুন্দর! এক্কেবারে ভদ্দরলোকের মতো। কবিতার দুঃখের কথা শুনে নিয়ে আসে পার্লারে। বলে কাজ শেখ, কাজ শিখলে টাকা পাবি। নিজের খরচ নিজেই চালাতে পারবি। কবিতার মা রাজি হচ্ছিলো না প্রথমে। পার্লারে নাকি আল্লাহ্ পাক এর দেয়া সুন্দর ভ্রুজোড়া তুলে চিক্কন করা হয়।
মাথাভর্তি চুল কুচিকুচি করে কেটে ছোট করা হয়। এগুলা বড় পাপের কাজ। আল্লাহ্ তায়ালা মানুষকে কত সুন্দর করে তৈরি করেছে, তার ওপর ছুরি কেঁচি চালানো? আল্লাহ্ নারাজ হবে না তো কী খুশি হবে? পাপ পাপ, এইসবের জন্যেই তো পাপে ঢেকে যাচ্ছে দুনিয়াটা। সেই পাপের ভাগিদার হোক তার মেয়ে চায় না সে। এমনিতেই কোন পাপে কে জানে, স্বামীর ঘরছাড়া হলো এইটুক বয়সেই । তারওপর পার্লারে ওইসব পাপকাজ করবে নিজের হাতে? না বাবা! কিন্তু কবিতা নাছোড়। মা-কে অনেক বুঝিয়ে কোনো কাজ না হওয়ায় একরকম জোর করেই আজ এসেছে সে মণিকার সাথে। এখন কাজগুলো ঠিকঠাক শিখতে পারলেই হয়। যখন টাকা আসবে হাতে, তখন মা-ও আর নারাজ থাকতে পারবে না। টাকার কাছে সারা দুনিয়াই কাবু, আর তার মা? সারাজীবন সুখের মুখ না দেখা একজন মেয়েমানুষ, নিশ্চয়ই কাবু হবে। হতেই হবে। না খেয়ে মরবে নাকি কবিতা ওর মেয়েকে নিয়ে?

বাথরুমে পানির ধারা। ট্যাপটা ছেড়ে দিয়ে বসে আছে মণিকা সেই কখন থেকে! মন তার মেঘাচ্ছন্ন। সেই মন নিয়ে সে উঠে দাঁড়ায়। শরীরের সমস্ত আবরণ খুলে ফেলে সে একে একে। নিজেকে দেখে সে সামনের আয়নায় ঘুরিয়ে ফিরিয়ে। সবই তো ঠিকঠাক! তবু কেন আজ পর্যন্ত কোনো পুরুষের নজর কাড়তে সক্ষম হলো না সে? মুখমণ্ডলও তো যথেষ্ট আকর্ষণীয়! তাহলে কি শুধু গায়ের রঙ? গায়ের রঙটাই সব? কিন্তু পার্লারে কাজে লাগার পর থেকে তো নিয়মিত ঘষামাজায় সেটাও অনেকটাই খোলতাই। রয়েছে একমাথা ঘনকালো চুল! তবে?

এদিকে বয়স তো আর থেমে নেই। নদীর মতো বয়েই চলেছে। অবশ্য বয়সের হিসেবটা সঠিক জানাও নেই তার। মা বাপ তো একে গরিব, তায় আবার মুরুক্খু। তারওপর আবার গণ্ডায় গণ্ডায় ছেলেপুলে। হিসাব ঠিক থাকে? তবে বিয়ের বয়স পার হয়েছে অনেক আগেই, সেটা বুঝতে কোনো অসুবিধাই হয় না। পাড়ার এঘর ওঘরের লোকজনের বাঁকা কথাও যেন আরও বেশি করে প্রমাণ করে তা। আর পার্লারের এই মেয়েগুলো, বিচ্ছু একেকটা! এমনভাবে কথা বলে একেকসময়, মনের ভেতরটা জ্বলে পুড়ে ছারখার হয়ে যায়। গায়ের রঙ নিয়ে ওভাবে খোঁটা না দিলেও তো পারে? কারো মনে কষ্ট দিয়ে কি সুখ পায় কেউ কে জানে?

কই, মণিকা তো কখনও ওদের মনে কষ্ট দিতে চায় না! আজ সুখী রঙ নিয়ে খোঁটা না দিলে ও কি খোঁটা দিতো সুখীকে? দিতো না..... কখনোই দিতো না। দেয়ওনি কোনোদিন। ও তো চায়, মন থেকেই চায়.... পার্লারের এই হতভাগী মেয়েগুলোর সবারই কিছু গতি হোক। একটা করে সুখের ঘর পাক সবাই। যেমনটা পেতে যাচ্ছে রেখা।

শাওয়ারটা জোরে ছেড়ে তার নিচে দাঁড়ায় মণিকা। দু'বাহু দু'দিকে প্রসারিত করে ভিজতে থাকে অবিরাম! মনে হয়, এতক্ষণ ধরে জ্বলতে থাকা মনের ভেতরটা শীতল হচ্ছে একটু একটু করে। দরজায় করাঘাত....মণিকা আপু, হলো তোমার গোসল, আর কতক্ষণ লাগাবা?

চমকে ওঠে মণিকা। তাই তো? বেরোতে হবে ওকে তাড়াতাড়ি, আন্টি জানলে বকে কিছু রাখবে না। কয়জন কাস্টমার বসে আছে কে জানে!

চুল কাটতে গিয়ে কেন যে আজ বার বার চিরুণিটা পড়ে যাচ্ছে হাত থেকে। কিন্তু রেখা একটুও বিরক্ত নয়। বার বার পড়ছে, বার বার তুলে নিচ্ছে। ঠোঁটের কোণে কেমন এক পরিতৃপ্তির হাসি সবসময়। পর্যবেক্ষণরত কবিতা বলে, বারে বারে পড়্যা যাইছে কেনে জি আপা? ঘুরে তাকায় রেখা, শান্ত স্মিতমুখে। কোনো কথা বলে না। মনের ভেতর তার হাজার প্রজাপতির ওড়াওড়ি। হাজার রকমের রঙ। মাথায় তার একটাই শব্দ ঘুরে ফিরে আসছে, বিয়ে। কত সাধের এই বিয়ে তার! চার চারটে বোনের পর একটা মাত্র ভাই। সেই ভাইয়ের জন্মের সময় মা টা প্রায় যায় যায়। কিন্তু যায়নি। বেঁচেছিলো আরও কিছুদিন। তবে সেই বেঁচে থাকা ছিলো বড় কষ্টের। রক্তহীন হলদে মুখ, পেটে নেই খাবার। উঠে দাঁড়াতে গেলেই পড়ে যায় মাথা ঘুরে। রিক্সাওলা বাপ জোগাড় করতে পারে না খাবার, ওষুধ তো দূরের কথা। এভাবেই বেঁচেছিলো কিছুদিন। একদিন সন্ধ্যাবেলা রেখাকে ইশারায় কাছে ডাকে। কী যেন বলে ফিসফিস করে! সবটা ঠিক বুঝতে পারে না রেখা। কিন্তু কেন জানে না, বুকের ভেতরটা অসম্ভব কাঁপতে থাকে ওর। শক্ত করে আঁকড়ে ধরে মায়ের হাত। কান পাতে মায়ের ঠোঁটের কাছে। কিছুটা বোঝে, বাকিটা অনুমানে হাতড়ে নেয়। চলে যাচ্ছে তার মা.... তাদের মা!

বড় মেয়ে রেখাকে বলছে দেখে রাখতে ভাইবোন, সংসার। কত হবে তখন রেখার বয়স? বড়জোর চৌদ্দ। সেই বয়সেই বুঝে গেলো, মায়ের অভাব বুঝতে দিতে হবে না ভাইবোনকে। বুকে করে আগলে রাখবে সে সবাইকে। একবারের জন্যও ভেঙ্গে পড়তে দিলো না নিজেকে। ভেঙ্গে পড়া বাপটাকে দাঁড় করালো আবার। একসময় কাজ পেলো এই পার্লারে। বাপের রিক্সা চালানোর টাকা আর নিজের আয় দিয়ে অনেকটাই পাল্টে ফেললো নিজেদের ভাগ্য। তেরো বছর ধরে কাজ করছে সে এখানে। ভাইবোনেরা বড় হয়েছে। অনেকটা ভারমুক্ত যেন এখন সে। গরিবের ঘরে বিয়েটাই যেন জীবনের সব। যে বয়সে সংসারের হাল ধরে রেখা, সে বয়সে অনেক মেয়েই বাচ্চার মা। রেখা বিয়ে না করে ড্যাং ড্যাং করে পার্লারে যায়, আয় রোজগার করে, এ নিয়ে কত কথা চারিদিকে! বাপটাও যেন ক্ষেপে উঠেছিলো। কিন্তু রেখার ওই এক কথা, বিয়ে সে করবে, কিন্তু সময় হলে। অবশেষে সময় হলো রেখার। বিয়ে তার মাত্র কয়েকদিন পরেই। কৃষিকাজ করে ছেলে, জমিজমাও আছে অল্পস্বল্প। তবে আগে বউ ছিলো লোকটার, একটা মেয়ে রেখে কে জানে কেন চলে গেছে দুনিয়া ছেড়ে। তা হোক, রেখারও তো বয়স হয়েছে। এই বয়সে গরিবের ঘরে এর চেয়ে ভালো পাত্র জুটবে কেন?

পানিটা পাল্টে আন তো রাবু!
ইশ্, খালি হুকুম... খালি হুকুম, একটুও বসার উপায় নাই? এর ওর ফরমাস খাটতে খাটতেই দিন যায়। টিভি সিরিয়ালে শাশুড়ি বউয়ের কথার তির চলছে, এমন সময় নড়া যায় টিভির সামনে থেকে? তবুও নড়তে হবে। এক্ষুণি পানি পাল্টে না দিলে সুখী আপুর কথার তির ছুটবে যে! উঠে পানি পাল্টে আনে রাবু। রাবেয়া তার নাম। ছোট্ট করে সবাই ডাকে রাবু। সবার চেয়ে বয়সে ছোট হওয়ায় ঝাড়ু দিয়ে কাটা চুল তোলা, পানি পাল্টানো, রুমাল টাওয়েল, মেকাপ এর সামগ্রী এগিয়ে দেয়া এসবই তার কাজ। মাঝে মধ্যে ভ্রু প্লাক করে অবশ্য। ফেসিয়ালও করে দুই একটা। পার্লারে মেয়ের সংখ্যা কমে যাওয়ায় করতে হয় এসব। তা না হলে হুকুম পালন আর টিভি দেখাই ছিলো তার কাজ। আটজন মেয়ে ছিলো আগে। বিয়ে হয়েছে দু'জনের, আর দু'জন ভেগে গেছে অন্য পার্লারে। বেতন নাকি বেশি দেয় এখানকার চেয়ে। কে জানে! এদিকে আবার রেখা আপুরও বিয়ের সব ঠিকঠাক। সেজন্যেই তো মণিকাআপু কবিতা নামের নতুন মেয়েটাকে নিয়ে এসেছে আজ। বাচ্চা বেঁধে নিয়ে এসেছে আবার! কাজ করতে পারবে কিনা কে জানে? আর যা গাঁইয়া! মুখের ভাষা ঠিক করার ট্রেনিং নেক আগে, তারপরে তো পার্লারের কাজ!

কাস্টমারের সাথে ওই গাঁইয়া ভাষায় কথা বলবে নাকি? আন্টি তাহলে রাখবে ওকে? অবশ্য রাবুর মুখের ভাষা যে খুব একটা সুবিধের ছিলো আগে, তা নয়। তবে এতটাও খারাপ ছিলো না। ওর মা বাড়ি বাড়ি কাজ করে। আর মায়ের সঙ্গে ওইসব ভদ্রলোকদের বাড়ি ঘুরে ঘুরে আগে থেকেই ভাষাটা ওর কিছুটা পালিশ করা। এখানে এসে এক্কেবারে ভদ্র। চেহারাটাও মন্দ নয়। কিন্তু সুখী আপুর মতো অতটা সুন্দরও নয়। আল্লায় দিয়েছে একখান চেহারা সুখী আপুকে। কী সুন্দর নাক-মুখ! আর গায়ের রঙ? যেন দুধের মধ্যে আলতা গুলানো। তাকিয়ে থাকতেই ইচ্ছা করে শুধু। কিন্তু কপাল খারাপ। স্বামী দিলো তালাক, আর বিয়েই হচ্ছে না! অবশ্য সুখী আপুর এ নিয়ে কোনো মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না। দিব্যি আছে। সারাক্ষণ ফুর্তি আর ফুর্তি। কেউ কিছু বললেই বলে, ধুর, বিয়ে করবো না আর কোনোদিন, ভালোই তো আছি! বোঝো ঠ্যালা!

এই রাবু, এদিকে আয়! ইশ্, ছাদের দিকে তাকিয়ে অতো কি ভাবিস? সাড়ে সাতটা বাজে। বাড়ি যাবি না? টাওয়েল, রুমাল, বাটি টাটি সব পরিষ্কার করে ফেল তাড়াতাড়ি। মণিকা তুই ঝাড়ু দিয়ে দে। রেখা, তুই মেকাপগুলো গুছিয়ে ড্রয়ারে তালা মেরে চাবিটা দে, আন্টিকে দিয়ে আসি। তাড়াতাড়ি কর, আজ আবার আমার ছোট বোনটার জন্মদিন। যাওয়ার সময় দোকান থেকে একটা কেক কিনে নিয়ে যাবো। বিরিয়ানি খুব পছন্দ ওর। চারপ্যাকেট বিরিয়ানিও কিনবো। বাপ-মা আর আমাদের দুই বোনের। জলদি কর, জলদি! দোকান বন্ধ না হয়ে যায়!

--একা একা বিরিয়ানি খাবি, আমাদের ছেড়ে? পেটে সহ্য হবে? তুই খুব খারাপ সুখী!
--হাঃ হাঃ, তাই তো, ঠিক বলেছিস রে মণিকা, পেট খারাপ হবেই হবে!
--আমারও একই কথা রেখাপু!
--ঠিক কহ্যাছিস রাবু, হামারও!

প্রথমে একটু যেন লজ্জা পায়, তারপর হাসিতে ফেটে পড়ে সুখী। বলে....ঠিক আছে, ঠিক আছে.... পেট যেন খারাপ না হয় সে ব্যবস্থা করি তাহলে!

সবাই হাসতে হাসতে বেরিয়ে আসে রাস্তায়। কে বলবে ওদের দেখে, একেকজনের মনের মধ্যে কতটা ঝড় আটকে রেখেছে ওরা? কতটা দুঃখ ভেতরে পুষে রেখে ছড়িয়ে পড়ছে হাসি ওদের মুখে? এ শহরের আকাশে আজ পূর্ণিমার চাঁদ! লাইটপোস্টের অধিকাংশ বাতি জ্বলছে না কেন যেন। একটু দূরেই নিউমার্কেট। তারপাশে বিরিয়ানির দোকান। ওরা হাঁটছে একসাথে আর করছে টুকটাক গল্প। মাঝেমাঝেই হেসে গড়িয়ে পড়ছে এ ওর গায়ে। ওদের ছায়াগুলো ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে দূরে আরও দূরে। ওরা এগিয়ে যাচ্ছে পায়ে পায়ে একসাথে, হাত ধরাধরি করে। যেন পৃথিবীতে ওদের চেয়ে সুখী আর কেউ নেই আজ। আকাশ থেকে জোছনা গলে গলে যেন ধুয়ে দিচ্ছে ওদের! দূর থেকে মনে হচ্ছে, যেন নীল জ্যোৎস্নায় ধোয়া কয়েকটি নীলপদ্ম মিলিয়ে যাচ্ছে ওই অসীম আকাশে......

লেখক- রেহানা বীথি

মন্তব্য লিখুন :