আহমদ ছফা: লাখো বঞ্চিতের কণ্ঠস্বর

বাংলাদেশের সাহিত্য ইতিহাসের অন্যতম প্রতিবাদী এবং প্রগতিশীল লেখক আহমদ ছফা। ১৯৪৩ সালের ৩০ জুন চট্টগ্রাম জেলার চন্দনাইশ উপজেলার গাছবাড়িয়া গ্রামের এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি।

সাদামাটা এই মানুষটি তাই সহজেই ছুঁয়ে গেছেন সবার হৃদয়। তার পিতার নাম হেদায়েত আলী ওরফে ধন মিয়া, মার নাম আসিয়া খাতুন। দুই ভাই চার বোনের মধ্যে আহমদ ছফা ছিলেন দ্বিতীয়।

বাবার হাতে গড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দক্ষিণ গাছবাড়িয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে লেখাপড়ায় হাতেখড়ি হয় ছফার। ১৯৬০ সালে নিজের গ্রামের নিত্যানন্দ গৌরচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন তিনি। ১৯৬২ সালে চট্টগ্রাম নাজিরহাট কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষে সে বছরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ভর্তি হন তিনি। যদিও সেখানে খুব বেশি দিন ক্লাস করেননি ছফা। খুব সম্ভবত ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে ব্রাহ্মণবাড়িয়া কলেজ থেকে প্রাইভেটে পরীক্ষা দিয়ে দ্বিতীয় শ্রেণীতে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে এমএ পরীক্ষা দেয়ার আগেই বাংলা একাডেমির পিএইচডি গবেষণা বৃত্তির জন্য আবেদন করেন এবং তিন বছরের ফেলোশিপ প্রোগ্রামের জন্য মনোনীত হন। গবেষণার বিষয় ছিল ‘১৮০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাংলার মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উদ্ভব, বিকাশ এবং বাংলার সাহিত্য-সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে তার প্রভাব’।  ১৯৭১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে এম.এ ডিগ্রি অর্জন করেন ছফা। পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করা আর সম্ভব হয়নি তার।

সৃষ্টিশীল এই লেখক শুরু থেকেই ছিলেন প্রথাবিরোধী। পড়াশোনা চলাকালীন অবস্থায় সুধাংশু বিমল দত্তের মাধ্যমে কৃষক সমিতি ন্যাপ বা তৎকালীন জনপ্রিয় গোপন কমিউনিস্ট পার্টির সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। মাস্টারদা সূর্যসেনের বিপ্লবী কর্মকাণ্ড ব্যাপকভাবে অনুপ্রাণিত করে আহমদ ছফাকে। কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে চট্টগ্রাম-দোহাজারী রেললাইন উপড়ে ফেলেন তিনি। পরবর্তীতে তিনি গ্রেপ্তার এড়াতে এবং পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে পার্বত্য চট্টগ্রামে কিছুদিন আত্মগোপন করেন। এরপর ১৯৮৬ সালের দিকে এসে জার্মান ভাষার উপর গ্যেটে ইন্সটিটিউট থেকে ডিপ্লোমা ডিগ্রি লাভ করেন তিনি। গ্যেটের অমর সাহিত্য ‘ফাউস্ট’ অনুবাদের ক্ষেত্রে এটিই ছিল প্রথম সোপান।

ষাটের দশকে সাহিত্য জগতে পা রাখেন আহমদ ছফা। সমসাময়িক উপন্যাস লেখকগণের মধ্যে তিনি ছিলেন একেবারেই আলাদা। ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত হয় আহমদ ছফার প্রথম উপন্যাস ‘সূর্য তুমি সাথী’। বক্তব্যের স্পষ্টতা আর তীব্রতার জন্য খুব দ্রুত পাঠকদের মাঝে সাড়া ফেলে দেন তিনি। ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে স্বাধীনতার পথে হাঁটতে থাকা বাংলাদেশের প্রথম গ্রন্থ হিসেবে প্রকাশিত হয় ছফার প্রবন্ধ গ্রন্থ ‘জাগ্রত বাংলাদেশ’। পরবর্তীতে বাংলা একাডেমি থেকে সাহিত্যের প্রায় প্রতিটি শাখায় প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন তিনি। গল্প, উপন্যাস, কবিতা, গান, প্রবন্ধ, অনুবাদ, ইতিহাস, ভ্রমণ কাহিনী সব মিলিয়ে ত্রিশটিরও বেশি গ্রন্থের প্রণেতা আহমদ ছফা। তার লেখাগুলোর দিকে তাকালে একটি বিষয় নজরে পড়বে। প্রায় প্রতিটি লেখাই সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সমসাময়িক পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরে।

বেশ কিছু পত্রিকার সাহিত্য পাতার সম্পাদক ছিলেন আহমদ ছফা। অধুনালুপ্ত ‘দৈনিক গণকন্ঠ’ এর সম্পাদকীয় উপদেষ্টা এবং ‘সাপ্তাহিক উত্তরণ’ এর প্রধান সম্পাদক ছিলেন তিনি। স্পষ্টভাষী ছফা সত্যের প্রচারে সদা সচেষ্ট ছিলেন। তিনি খুব ধার্মিক ছিলেন এমন প্রমাণ পাওয়া না গেলেও ধর্মের প্রতি তার বিশ্বাস ছিল প্রশ্নাতীত। ১৯৭০ সালে আহমেদ শরীফের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠা করেন ‘বাংলাদেশ লেখক শিবির’, তিনি ছিলেন সংগঠনটির প্রথম সভাপতি। তার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল প্রগতিশীল লেখকদের আন্দোলনকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। ব্যক্তিত্বের ছটায় তরুণ প্রজন্মের কাছে খুব সহজেই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন আহমদ ছফা। তবে কখনোই সস্তা খ্যাতির মুখাপেক্ষী ছিলেন না তিনি। ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তাবিদ হিসেবে আলাদা কদর ছিল তার। কাব্যিক ভঙ্গিমায় স্থানীয় ভাষায় ব্যক্তিগত আবেগ-অনুভূতি ফুটিয়ে তুলতে তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। গ্যোতের লেখার পাশাপাশি বার্ট্রান্ড রাসেলের অ্যাগনোস্টিক বা ঈশ্বরে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের মাঝামাঝি অবস্থা নিয়ে বেশ কিছু লেখাও অনুবাদ করেন তিনি। তবে প্রাবন্ধিক হিসেবেই আহমদ ছফার পরিচিতি সবচেয়ে বেশি।

বাংলার নামকরা চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন আহমদ ছফা। দুজনেই ছিলেন বোহেমিয়ান বা ভবঘুরে, অবিবাহিত এবং খ্যাতি, ধন-সম্পদ বা অন্যান্য বৈষয়িক মোহ বিবর্জিত। ১০০ বছরেও এমন ব্যক্তিত্ব আর দুটি খুঁজে পাওয়া যাবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন আহমদ ছফা নিজেই।

আমি মনে করি আমার স্বীকৃতি নিয়ে পশ্চিম বাংলা কী বলতে চায় সেটা আমার লুক আউট নয়। আমি পৃথিবীর গন্ধ এবং স্বাদ বুঝি। তুমি দেখবা আমি যখন আমেরিকায় যাবো তখন ওখানেও ঝড় তুলবো। তখন ওখানকার পন্ডিতদের সাথে দেখবে আমি কিভাবে মিশে গেছি। সুলতানের বিশালত্ব চিন্তা করো, ৭৬-এর আগে এই জায়ান্ট কোথায় ছিলো? কেউ তাকে আবিস্কার করলো না কেন? এই আমি যাকে প্রেজেন্ট করেছি, আরেকজন লোক আসুক তো এমন।

আহমদ ছফার সময়’ বইটিতে এমনটাই বলেছিলেন তিনি। তার চোখে সুলতানও ছিলেন একজন দার্শনিক। বাংলার মাটির প্রতীক তিনি, বাংলার মাটির যোগ্য সন্তান তিনি। আমাদের চারপাশে ঘিরে থাকা খুঁটিনাটি সমস্যাগুলোই ছিল তার শিল্পের খোরাক। শিল্প-সংস্কৃতির জগতে তাকে সাহায্য করতে কেউ এগিয়ে আসেনি। আহমদ ছফা মনে করতেন এই বাংলায় সুলতানকে আরও বেশি দরকার। জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসানরাও বড় শিল্পী, ভদ্রলোক। তবে খেটে খাওয়া মানুষের কাছে শিল্পের জায়গা করে দিতে হলে সুলতানদের কোনো বিকল্প নেই বলেই তিনি বিশ্বাস করতেন।

সাধারণত ছোট ভলিউমে বই বের করতেন আহমদ ছফা। এই ছোট বইগুলোই চট করে পাঠকদের মনে জায়গা করে নিতো, কেননা তাতে থাকতো গণমানুষের কষ্টের প্রতিফলন, তাদের জীবনের দুর্দশার চালচিত্র। ‘সূর্য তুমি সাথী’ (১৯৬৭), ‘উদ্ধার’ (১৯৭৫), ‘একজন আলী কেনানের উত্থান পতন’ (১৯৮৯), ‘অলাতচক্র’ (১৯৯০), ‘ওঙ্কার’ (১৯৯৩), ‘গাভীবিত্তান্ত’ (১৯৯৪), ‘অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী’ (১৯৯৬), ‘পুষ্পবৃক্ষ ও বিহঙ্গপুরাণ’ (১৯৯৬) আহমদ ছফার উপন্যাস এবং ‘নিহত নক্ষত্র’ (১৯৬৯) তাঁর গল্পগ্রন্থ। কবিতার ক্ষেত্রেও সমুজ্জ্বল আহমদ ছফা। ‘জল্লাদ সময়’, ‘একটি প্রবীণ বটের কাছে প্রার্থনা’, ‘লেনিন ঘুমোবে এবার’ ইত্যাদি একাধিক কাব্যগ্রন্থের প্রণেতা তিনি। অনুভূতির প্রত্যক্ষ প্রকাশ, লোকজ ভাষার ব্যবহার, পুঁথিপুরাণের শব্দ প্রয়োগ ও বাক্যরীতির সঠিক চয়নে তার কবিতাগুলো যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে। আহমদ ছফার অন্যতম জনপ্রিয় একটি বই ‘যদ্যপি আমার গুরু’। ১৯৭০ সালে গবেষণার কাজ করতে গিয়ে জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের সান্নিধ্যে আসেন তিনি। তাদের মধ্যকার দীর্ঘদিনের সুসম্পর্কের ভিত্তিতে দেশবরেণ্য এই বুদ্ধিজীবীকে নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ বই লেখেন ছফা। রাজ্জাক ছিলেন চিন্তাবিদ, দার্শনিক, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। তার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তৎকালীন বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু তুলে ধরেন আহমদ ছফা। নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের লেখায় আহমদ ছফার প্রভাব রয়েছে।

ছফার ‘সূর্য তুমি সাথী’ বইটি হাতে পাওয়ার পর পাঠকরা মুগ্ধ হয়ে ভাবে, বহুদিন পর তারা এমন একজন লেখক খুঁজে পেয়েছেন যে তাদের মনের কথাগুলো ছাপার হরফে তুলে ধরতে জানে। ছফা কেবলমাত্র তা-ই লিখতেন যা তিনি নিজে বিশ্বাস করতেন। ভান ধরা বা কোনো কিছু নিয়ে বাড়াবাড়ি করা তিনি একদম পছন্দ করতেন না। আমাদের দেশের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য লিখতেন তিনি, তাদের প্রতিনিধিত্ব করেই লিখতেন তিনি। লেখালেখি ছিল তার নেশা। ছফার গভীর চিন্তাশীলতার প্রতিফলন ঘটেছে তার দুটি উল্লেখযোগ্য রচনা ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’ (১৯৭৩) ও ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ (১৯৭৬) গ্রন্থে। এ দুটি বিশেষ চিন্তামূলক রচনাসহ দেশ, সমাজ ও রাজনীতিবিষয়ক নিবন্ধাবলি ছফাকে বাংলাদেশের  বুদ্ধিজীবী লেখকের মর্যাদাপূর্ণ আসন দিয়েছে। এতকিছু সত্ত্বেও আরাম-আয়েশের জীবন তাকে কখনোই টানতে পারেনি। খুব সাধারণ আর চাকচিক্যহীনভাবে দিন কাটাতেন ছফা। দীর্ঘকাল যাবত তিনি একটি মাত্র ঘরে থাকতেন যার মধ্যে আসবাব বলতে ছিল শুধু একটি খাট, চেয়ার, টেবিল আর বইয়ের তাক।

‘লেখক শিবির পুরস্কার’ এবং বাংলা একাডেমি কর্তৃক প্রণীত ‘সাদত আলী আখন্দ পুরস্কার’ প্রত্যাখ্যান করেন ছফা। ১৯৮০ সালে ‘ইতিহাস পরিষদ পুরস্কার’ এবং ২০০২ সালে ‘মরণোত্তর একুশে পদক’ এ ভূষিত হন আহমদ ছফা। তার বেশ কিছু বই বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। ২০০১ সালের ২৮ জুলাই অসুস্থ অবস্থায় ঢাকা কমিউনিটি হাসপাতালে নেয়ার পথে মৃত্যুবরণ করেন ৫৮ বছর বয়সী ছফা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদে জানাজা শেষে মিরপুরের শহীদ বুদ্ধিজীবী গোরস্থানে দাফন করা হয় বাংলার কালজয়ী এই সাহিত্যিককে। তার সাহিত্যকর্মের দ্বারা বিশেষত তরুণ প্রজন্মের হৃদয়ে তিনি বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল। এই একটি লেখায় তার পুরো জীবনী তুলে ধরা প্রায় অসম্ভব। আহমদ ছফার মতো প্রতিভাবানদের জীবনী নিয়েই লেখা যায় যুগ পাল্টে দেয়ার মতো শক্তিশালী সব সাহিত্য।

মন্তব্য লিখুন :