নায়করাজ রাজ্জাক: কলকাতার ছেলে যেভাবে বাংলাদেশের কিংবদন্তী

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতে যে কজন কিংবদন্তী অভিনেতা আছে তাদের মধ্যে সবার উপরের সারিতেই নাম আসবে নায়করাজ রাজ্জাকের। এ নায়কের আসল নাম আব্দুর রাজ্জাক। তবে বাংলা চলচ্চিত্র পত্রিকা চিত্রালীর সম্পাদক আহমদ জামান চৌধুরী তাকে নায়করাজ উপাধি দিয়েছিলেন। এরপর থেকেই তাকে ডাকা হয় নায়ক রাজ রাজ্জাক নামে।

নায়করাজ রাজ্জাকের দ্বিতীয় প্রয়াণ দিবস আজ। দিনটি স্মরণে রাখতে এফডিসিতে আজ মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। সকাল থেকে পড়ানো হচ্ছে কোরআন খতম। বাংলাদেশ শিল্পী সমিতি এই মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করেছে।

রাজ্জাক ১৯৪২ সালের ২৩শে জানুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ কলকাতার টালিগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম আকবর হোসেন ও মাতার নাম নিসারুননেছা। রাজ্জাকরা ছিলেন নাকতলা এলাকার জমিদার। তিনি কলকাতার বাশদ্রোণীর নিকটে খানপুর হাইস্কুলে পড়াশুনা করেন।

সপ্তম শ্রেণীতে পড়ার সময় স্বরসতী পূজা চলাকালীন সময়ে মঞ্চ নাটকে অভিনয়ের জন্য তার শিক্ষক রবীন্দ্রনাথ চক্রবর্তী তাঁকে কেন্দ্রীয় চরিত্রের জন্য বেছে নেন। শিশু-কিশোরদের নিয়ে লেখা নাটক বিদ্রোহীতে গ্রামীণ কিশোর চরিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়েই নায়ক রাজের অভিনয়ে সম্পৃক্ততা। অভিনয়ের জন্য ১৮ বছর বয়সে মুম্বাইয়েও যান রাজ্জাক।

রাজ্জাক ১৯৬২ সালে লক্ষীকে বিয়ে করেন। টালিগঞ্জে রাজ্জাকের এক আত্মীয়ের বাড়ির পাশে ছিল লক্ষীদের বাড়ি। সেই আত্মীয়দের একজন লক্ষীকে বাড়ির সামনে দেখে পছন্দ করে এবং বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যায়। সেদিন রাজ্জাক আর লক্ষীর আংটিবদল হয়। এর দুই বছর পরে তাদের বিয়ে হয়।

১৯৬৪ সালের কলকাতায় হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা শুরু হলে এক রাতে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে এক হিন্দু পরিবারের বাড়িতে আশ্রয় নেন রাজ্জাক। পরের দিন ২৬ এপ্রিল পরিবার নিয়ে ঢাকায় চলে আসেন। তার সাথে ছিল তার স্ত্রী লক্ষী ও পুত্র বাপ্পারাজ এবং পীযূষ বসুর দেওয়া একটি চিঠি ও পরিচালক আব্দুল জব্বার খান ও শব্দগ্রাহক মণি বোসের ঠিকানা। স্ত্রী পুত্রকে শরনার্থী শিবিরে রেখে তিনি আব্দুল জব্বার খানের সাথে সাক্ষাৎ করলে খান তাকে কাজের আশ্বাস দেন।

তখন রাজ্জাক ৮০ টাকা মাসিক ভাড়ায় স্ত্রী-পুত্র নিয়ে কমলাপুরে এক বাসা ভাড়া করেন। পরে তিনি সুভাষ দত্ত, সৈয়দ আওয়াল, এহতেশামসহ আরও চলচ্চিত্রকারদের সাথে সাক্ষাৎ করেন। আব্দুল জব্বার খানই তাকে ইকবাল ফিল্মসে কাজ করার সুযোগ দেন। ১৯৬৪ সালে তিনি কামাল আহমেদের সাথে সহকারী পরিচালক হিসেবে উজালা চলচ্চিত্রে কাজ করার সুযোগ পান। সহকারী পরিচালক হিসেবে তার দ্বিতীয় চলচ্চিত্র ছিল পরওয়ানা। কিন্তু ৮০ ভাগ কাজ হওয়ার পর তিনি এই ছবির কাজ ছেড়ে দেন।

১৯৬৬ সালে ১৩ নম্বর ফেকু ওস্তাগার লেন চলচ্চিত্রে একটি ছোট চরিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশি চলচ্চিত্রে তাঁর অভিষেক ঘটে। তিনি জহির রায়হানের বেহুলা চলচ্চিত্রে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করেন। ষাটের দশকের শেষের দিকে এবং সত্তরের দশকেও তাঁকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের প্রধান অভিনেতা হিসেবে বিবেচনা করা হত।

নায়করাজ রাজ্জাকের অভিনয় করা উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলো হচ্ছে—বেহুলা, আগুন নিয়ে খেলা, দর্পচূর্ণ, এতুটুকু আশা, নীল আকাশের নীচে, কখগঘঙ, জীবন থেকে নেয়া, নাচের পুতুল, অশ্রু দিয়ে লেখা, ওরা ১১ জন, অবুঝ মন, রংবাজ, আলোর মিছিল, শুভ দা, অভিযান, যোগাযোগ, অন্ধবিশ্বাস, টাকা আনা পাই, ছন্দ হারিয়ে গেল, মানুষের মন, অতিথি, যোগ বিয়োগ, মধুমিলন, যে আগুনে পুড়ি, দুই পয়সার আলতা, অনেক প্রেম অনেক জ্বালা, দ্বীপ নেভে নাই, পীচঢালা পথ, দুই ভাই, আবির্ভাব, বন্ধু, বাঁশরী, আশার আলো, কে তুমি, মতিমহল, আনোয়ারা, নাত বউ, অবাক পৃথিবী, কি যে করি, গুণ্ডা, অনন্ত প্রেম, অশিক্ষিত, ছুটির ঘণ্টা, মহানগর, বড় ভাল লোক ছিল, রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্ত, স্বরলিপি, বাঁদী থেকে বেগম, বাবা কেন চাকর।

২০১৫ সালে বাংলাদেশ সরকার সংস্কৃতিতে বিশেষ ভূমিকা রাখার জন্য তাঁকে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করে। ১৯৭৬, ১৯৭৮, ১৯৮২, ১৯৮৪ ও ১৯৮৮ সালে তিনি মোট পাঁচবার শ্রেষ্ঠ অভিনেতার জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। ২০১৩ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে তাকে আজীবন সম্মাননা পুরস্কার প্রদান করা হয়। এছাড়াও তিনি চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য বাচসাস পুরস্কার, মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন। ২০১৭ সালের ২১ আগস্ট ৭৫ বছর বয়সে তিনি ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।

মন্তব্য লিখুন :