মালয়েশিয়া-থাইল্যান্ডে পাচার হচ্ছে রোহিঙ্গারা

দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের ঘিরে ফের তৎপর হয়ে উঠেছে মানবপাচারকারী চক্র। গত দুইদিনে মালয়েশিয়ায় পাচারকালে ছয় দালালসহ ৫৩ জন রোহিঙ্গাকে আটক করেছে কোষ্টগার্ড ও বিজিবি সদস্যরা।

জানা গেছে, সাগর এখন শান্ত। এই সুযোগে মানবপাচারকারী চক্রগুলো সাগরপথে তাদের পাচার কার্যক্রম শুরু করে দিয়েছে। মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ড পৌঁছে দেওয়ার নাম করে সিন্ডিকেটগুলো রোহিঙ্গাসহ নানান জন থেকে প্রলোভন দেখিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছে হাজার হাজার টাকা। মূলত কক্সবাজারে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের টার্গেট করেই জমে উঠেছে এই প্রতারণার খেলা।

কোস্টগার্ড টেকনাফ স্টেশনের কমান্ডার লে. ফয়েজুল ইসলাম মন্ডল বলেন, বুধবার (৭ নভেম্বর) বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে সেন্টমার্টিন দ্বীপের দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গোপসাগর থেকে একটি ট্রলার থেকে ছয় দালালসহ ৩৯ রোহিঙ্গাকে আটক করা হয়েছে। এদের মধ্যে ১০ জন নারী, ১৪ জন পুরুষ ও ৯ জন শিশু রয়েছে।

তিনি জানান, এর আগেরদিন মঙ্গলবার টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের উপকূল থেকে ১৪ রোহিঙ্গাকে উদ্ধার করেছে বিজিবি। মালয়েশিয়া নেওয়ার কথা বলে টাকা নেওয়া হয় তাদের কাছ থেকে। দু’দিন ধরে সাগরে এদিক-ওদিক ঘোরানোর পর ‘থাইল্যান্ডের তীরে পৌঁছেছি’ বলে টেকনাফের সৈকতে তাদের নামিয়ে দেয় মানবপাচারকারী চক্রের সদস্যরা। ওই ১৪ জনের মধ্যে পাঁচ জন নারীও ছিল। তাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা করে নিয়েছে পাচারকারীরা। আরও একলাখ ৯০ হাজার টাকা করে দেওয়ার কথা ছিল উদ্ধার পাওয়া এই রোহিঙ্গাদের।

সূত্র জানায়, গত বছরের আগস্ট মাসের পর থেকে মিয়ানমারে হত্যা, নির্যাতন ও বাড়িঘরে আগুনের ঘটনায় প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে আট লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা। এছাড়া আগে থেকে রয়েছে প্রায় চার লাখ রোহিঙ্গা। সব মিলিয়ে ১২ লাখের মতো রোহিঙ্গার বসবাস বাংলাদেশে।

উখিয়া লম্বাশিয়া রোহিঙ্গা শিবিরের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ রফিক বলেন, নির্যাতনের শিকার হয়ে মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। কিন্তু এপারে আসার পরে তারা সবাই বেকার জীবন কাটাচ্ছে। আগামী ১৫ নভেম্বরে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু এই মুহূর্তে তারা সেদেশে যেতে প্রস্তুত নয়। অনেক রোহিঙ্গার আত্মীয়স্বজন মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে রয়েছে। প্রবাসী স্বজনের কাছে পৌঁছাতে রোহিঙ্গাদের অনেকেই সাগরপথ বেছে নিয়েছে। আবার অনেকে দালালের খপ্পরে পড়ে এসব কাজে জড়িয়ে পড়ছে।

টেকনাফের লেদা ক্যাম্প ও উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্পের দুই নেতা (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) জানান, গত দুই মাসে এই দুই ক্যাম্পের কমপক্ষে ৩০ নারী ও শিশু নিখোঁজ হওয়ার খবর তারা পেয়েছেন। তবে তারা কোথায় পাচার হয়েছে তা জানা নেই তাদের।

এ প্রসঙ্গে টেকনাফ লেদা রোহিঙ্গা শিবিরের ডেভেলপমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান আবদুল মোতালিব (৬৮) বলেন, এ জাতীয় অনেক ঘটনার খবর আমাদের কানে আসেই না। পরিবারের সদস্যরা নিজেরাই উদ্যোগী হয়ে নানাভাবে তাদের খোঁজার চেষ্টা করে।

রোহিঙ্গা শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) দেওয়া তথ্য মতে, ক্যাম্প থেকে গত এক বছরে প্রায় ৫৮ হাজার রোহিঙ্গা পালাতে চেষ্টা করেছে। এর মধ্যে ৫৪ হাজার ৫৫৯ রোহিঙ্গা কক্সবাজারে আটক হয়েছে। আরও তিন হাজার ২২১ জন রোহিঙ্গা দেশের অন্যান্য জেলা থেকে আটক হয়েছে। পরবর্তীতে তাদের সবাইকে শরণার্থী শিবিরে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।

মন্তব্য লিখুন :