শুল্ক্কমুক্ত পণ্য প্রবেশে ঐকমত্য ঢাকা-থিম্পু পাঁচ সমঝোতা

বাংলাদেশ ও ভুটান বেশকিছু পণ্যের শুল্ক্ক ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার নিয়ে কাজ করার ব্যাপারে ঐকমত্য প্রকাশ করেছে। গতকাল শনিবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দুই দেশের সরকারপ্রধানের বৈঠকের পর সমঝোতার পাঁচটি দলিলে স্বাক্ষর করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে এবং সফররত ভুটানের প্রধানমন্ত্রী ডা. লোটে শেরিং ভুটানের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন। 

বৈঠকে ভুটান বাংলাদেশের বাজারে ১৬টি এবং বাংলাদেশ সে পদশে ১০টি পণ্যের শুল্ক্ক এবং কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার চেয়েছে। বৈঠকের পর পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক ও প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান।

শহীদুল হক বলেন, 'ভুটানের সঙ্গে আমাদের খুবই গভীর ঐতিহাসিক সম্পর্ক। আমাদের প্রথম স্বীকৃতি দেয় ভুটান। তাই ভুটানের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক গাঢ়। পরবর্তী বছরগুলোতে সম্পর্কের আরও উন্নতি হয়েছে। ক্রমেই এ সম্পর্ক গভীর ও সম্প্রসারিত হচ্ছে। ২০১৭ সালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভুটান সফরের পর বাণিজ্য বেড়েছে এবং মানুষে মানুষেও সম্পর্ক বাড়ছে।' 

সফররত লোটে শেরিং সকাল ১০টার  দিকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পৌঁছলে তাকে ফুল দিয়ে স্বাগত জানান শেখ হাসিনা। এর পর দুই প্রধানমন্ত্রীর একান্ত বৈঠকের পর দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়। বৈঠক শেষে দুই প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে এসব সমঝোতা ও স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) সই হয়।

পররাষ্ট্র সচিব বলেন, ভুটান ডব্লিউটিওর সদস্য না হওয়ায় তাদের নিজস্ব কিছু আইন ও বিধিমালা আছে। বৈঠকে কোটামুক্ত ও শুল্ক্কমুক্ত সুবিধা নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। 

বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত ও নেপালকে (বিবিআইএন) নিয়ে আঞ্চলিক কানেকটিভিটি গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হলেও ভুটান এখনও ওই চুক্তিতে অনুস্বাক্ষর না করায় তা আটকে আছে। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, ট্রানজিটের ক্ষেত্রে একটা বড় ধরনের উদ্যোগ এ অঞ্চলে আছে। বিবিআইএনে সব দেশ সই করেছে। তবে এটা অনুস্বাক্ষরের জন্য ভুটানের পার্লামেন্টে তোলা যায়নি। এ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ভুটানের নতুন সরকার বলছে, তারা এ বিষয়টি আলোচনার জন্য সিনেটে নিয়ে আসবে। তারা খুবই আশাবাদী।

বৈঠকে আঞ্চলিক বিদ্যুৎ ও বাণিজ্য নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানান শহীদুল হক। তিনি বলেন, ভুটানে জলবিদ্যুৎ তৈরি, উৎপাদন এবং এ অঞ্চলে বাজারজাতকরণের ব্যাপারে বেশ কিছুদিন ধরে আলোচনা চলছে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বাংলাদেশ এখানে বিনিয়োগও করতে যাচ্ছে। এ আলোচনায় বেশ অগ্রগতি হয়েছে। দ্রুত এ বিষয়ে চুক্তি হবে বলে আশা করা যায়। এটা একটা ত্রিপক্ষীয় সহযোগিতা হবে। ভুটানে বিদ্যুৎ উৎপাদন হলে সেটা ভারত ও বাংলাদেশে বাজারজাত করা হবে।

চিকিৎসা খাতেও দু'দেশের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ছে জানিয়ে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, সার্ক স্কলারশিপে মেডিকেল ও নার্সিংয়ে বাংলাদেশে ভুটানিদের জন্য বরাদ্দ কোটা ১০ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে। ভুটানের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের প্রশংসা করেছেন জানিয়ে তিনি বলেন, এ দেশ থেকে তারা চিকিৎসক নেবেন।

শহীদুল হক বলেন, শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি গভীর শ্রদ্ধার কথা জানান ভুটানের প্রধানমন্ত্রী। সায়মা ওয়াজেদ হোসেনের অটিজম নিয়ে সচেতনতার বিষয়ে তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে তার বিরাট অবদান রয়েছে।

যেসব সমঝোতা ও এসওপি :দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও কার্গো পরিবহনের সমঝোতা স্মারককে কার্যকর করার লক্ষ্যে একটি এসওপি সই হয়। এতে বাংলাদেশের পক্ষে সই করেন নৌ পরিবহন সচিব আবদুস সামাদ এবং ভুটানের পক্ষে সই করেন দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বাণিজ্য বিভাগের পরিচালক সোনম তেনজিন। স্বাস্থ্য খাতে সহযোগিতা বিষয়ে সমঝোতা স্মারকে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব আসাদুল ইসলাম এবং ভুটানের স্বাস্থ্য সচিব ডা. উজেন দফু সই করেন।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি) এবং ভুটানের কৃষি ও বন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়। এতে সই করেন বিএআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান মো. কবির ইকরামুল হক এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত ভুটানের রাষ্ট্রদূত সোনম তোবদেন রাবগি।

জনপ্রশাসনে পারস্পরিক সহযোগিতা বিষয়ে সমঝোতা স্মারকে সই করেন বাংলাদেশ জনপ্রশাসন প্রশিক্ষণ সেন্টারের রেক্টর এম আসলাম আলম এবং বাংলাদেশে ভুটানের রাষ্ট্রদূত। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন এবং ভুটানের পর্যটন কাউন্সিলের মধ্যে সমঝোতা স্মারকে সই করেন বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান আখতারুজ জামান খান কবির এবং বাংলাদেশে ভুটানের রাষ্ট্রদূত।

ভুটানের প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে শেখ হাসিনার রাষ্ট্রীয় ভোজসভা :প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশ সফররত ভুটানের প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে এক রাষ্ট্রীয় ভোজসভার আয়োজন করেন। গতকাল নগরীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের গ্র্যান্ড বল রুমে এ ভোজসভা হয়।

জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, মন্ত্রিসভার সদস্য, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, সিনিয়র আওয়ামী লীগ নেতা, সংসদ সদস্য, গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং উচ্চপদস্থ বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তারা ভোজসভায় উপস্থিত ছিলেন।

চার দিনের সফরে শুক্রবার ঢাকায় পৌঁছান লোটে শেরিং। সফর শেষ করে আগামীকাল সোমবার তার ঢাকা ছাড়ার কথা রয়েছে।


মন্তব্য লিখুন :