প্রয়োজনে গ্রামীণফোনের লাইসেন্স স্থগিত করবে বিটিআরসি

গ্রামীণফোনের কাছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) পাওনা প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা আদায়ে আইন অনুযায়ী যা যা করার দরকার সবই করবে সংস্থাটি।

এ কথা জানিয়েছেন বিটিআরসির চেয়ারম্যান জহিরুল হক। তিনি বলেছেন, টাকা মাফ করার কোনো ক্ষমতা নেই বিটিআরসির। টাকা আদায়ে প্রয়োজনে গ্রামীণের নেটওয়ার্ক বন্ধ ও লাইসেন্স স্থগিত করা হবে। গ্রামীণফোনকে টাকা পরিশোধের জন্য ১০ দিনের সময় দেয়া হয়েছিল। সে সময় পার হয়ে গেছে। আগামী বোর্ডসভায় এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

অপর দিকে মোবাইল ফোন অপারেটরদের সঙ্গে লাইসেন্স পাওয়া টাওয়ার কোম্পানির সৃষ্ট দ্বন্দ্ব নিরসনে একটি গাইডলাইন তৈরি করে দেয়া হবে বলেও জানান তিনি। জহিরুল হক বলেন, গত বছর নভেম্বর মাসে চারটি কোম্পানিকে মোবাইল নেটওয়ার্ক টাওয়ার অবকাঠামো ভাগাভাগি সংক্রান্ত টাওয়ার শেয়ারিং লাইসেন্স দিয়েছে সরকার।

কিন্তু মোবাইল ফোন অপারেটরদের সঙ্গে টাওয়ার কোম্পানিগুলো নানা ক্ষেত্রে একমত হতে না পারায় এখনও তা ঝুলে আছে। এ কারণে গ্রাহকরা মোবাইল ফোনের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ অবস্থা নিরসনে বিটিআরসিও দু’পক্ষের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছে। কিন্তু কোনো ফল পাওয়া যায়নি। কিছু দিন আগে দুই সপ্তাহের সময় বেঁধে দিয়ে বিটিআরসির পক্ষ থেকে চিঠি দেয়া হয়েছিল মোবাইল অপারেটরদের। সেই সময়ও পার হয়ে গেছে। এখন বিটিআরসি এ বিষয়ে করণীয় নির্ধারণে একটি গাইডলাইন তৈরি করে দেবে।

বিটিআরসির কার্যালয়ে সোমবার টেলিকম রিপোর্টার্স নেটওয়ার্ক বাংলাদেশের (টিআরএনবি) নতুন কমিটির সঙ্গে মতবিনিময় অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন টিআরএনবি সভাপতি মুজিব মাসুদ, বিটিআরসির কমিশনার রেজাউল কাদের, কমিশনার আমিনুল ইসলাম, ডিরেক্টর জেনারেল দেলোয়ার হোসেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শহিদুল আলম, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহফুজুল করিম মজুমদার, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল একেএম শহীদুজ্জামান, আশিষ কুমার কুন্ডু, সচিব জহিরুল ইসলাম, টিআরএনবি সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল আনোয়ার খান শিপু প্রমুখ। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বিটিআরসির জ্যেষ্ঠ সহকারী পরিচালক (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিকেশন্স) জাকির হোসেন।

বিটিআরসি সূত্রে জানা গেছে, তাদের নিয়োগকৃত অডিট ফার্মের হিসাব অনুযায়ী গ্রামীণফোনের কাছে পাওনা রয়েছে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে এনবিআরের পাওনা প্রায় চার হাজার ৮৫ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। বিটিআরসি চেয়ারম্যান বলেন, অডিট অনুযায়ী গ্রামীণফোনের কাছে প্রায় এক যুগ ধরে এই টাকা পাওনা হয়েছে। প্রতিনিয়তই সুদসহ এই টাকা বাড়ছে। এখন ১৩ হাজার কোটি টাকার ওপর প্রতিদিন ১৫ শতাংশ লেট ফি হিসেবে টাকা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই টাকা পাওয়ার বিষয়ে অডিট কোম্পানি যথেষ্ট সময় দিয়েছে। এককভাবে অডিট হয়নি। তারা বারবার কোর্টে গিয়ে সময় নিয়েছে। কোর্ট সময় দিলে মানতে হবে। তবে টাকা তাদের দিতেই হবে। গ্রামীণফোন বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়ে টাকা না দিতে শুধু সময় নিচ্ছে।

এখন টাকা আদায় করার জন্য যা যা করার বিটিআরসি তাই করবে। প্রয়োজনে গ্রামীণফোনের নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দেয়া হবে। কল ব্লকসহ লাইসেন্স বন্ধে শোকজ করা হবে। টাওয়ার শেয়ারিং গাইডলাইন অনুযায়ী চারটি কোম্পানিকে টাওয়ার লাইসেন্স দেয়া হলেও তারা ব্যবসা করতে পারছেন না- এ বিষয়ে জানতে চাইলে মহাপরিচালক (লিগ্যাল ও লাইসেনসিং) শহীদুজ্জামান বলেন, মোবাইল ফোন অপারেটরের অসহযোগিতার কারণে টাওয়ার লাইসেন্স পাওয়া কোম্পানিগুলো ব্যবসা করতে পারছে না। আমরা তাদের এক সপ্তাহের সময় দিয়েছিলাম দুই পক্ষকে ঐকমত্যে পৌঁছতে। কিন্তু হয়নি। তাই বিটিআরসি আগামী ২-৩ সপ্তাহের মধ্যে চূড়ান্ত গাইডলাইন তৈরি করে চারটি টাওয়ার ও মোবাইল অপারেটরদের চিঠি দিয়ে সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেবে। তারা এটা মানতে বাধ্য হবে।

অভিযোগ উঠেছে মোবাইল ফোন অপারেটরদের অনীহার কারণে টাওয়ার শেয়ারিং কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে বন্ধ রয়েছে টাওয়ার সেবার সব ধরনের কার্যক্রম। এ অবস্থায় বড় ধরনের বিপাকে পড়েছেন দেশের ১৬ কোটি মোবাইল ফোন গ্রাহক। টাওয়ার নেটওয়ার্ক সমস্যার কারণে প্রতিদিনই বাড়ছে কল ড্রপসহ নানা বিভ্রাট। দেশের সবচেয়ে বড় অপারেটর গ্রামীণফোনের গ্রাহকরাও পড়ছেন নানা সমস্যায়। অন্য অপারেটদের কলেও হচ্ছে নানা ভোগান্তি।

আইন অনুযায়ী লাইসেন্স দেয়ার পরদিন থেকেই মোবাইল ফোন অপারেটররা আর টাওয়ার ব্যবসা করতে পারবে না। তাদের নিজস্ব টাওয়ারগুলোও লাইসেন্স পাওয়া চার টাওয়ার কোম্পানির কাছে বিক্রি করে দিতে হবে। এরপর তাদের কাছ থেকে ভাড়া বা বৈধ পন্থায় টাওয়ার সেবা নিতে হবে। কিন্তু বিক্রি দূরের কথা এখন পর্যন্ত টাওয়ারের মূল্য পর্যন্ত নির্ধারণ করে দিতে পারেনি বিটিআরসি। এ সুযোগে বিদেশি একটি কোম্পানির দখলে চলে গেছে টাওয়ার ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ। লাইসেন্স পাওয়া টাওয়ার কোম্পানিগুলো বলছে, ইতিমধ্যে তারা গড়ে ৪৫ থেকে ৫০ কোটি টাকা করে খরচ করে ফেলেছে। কিন্তু সরকার ও অপারেটরদের কাছ থেকে কোনো ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছে না। মোবাইল ফোন অপারেটরদের সঙ্গে তাদের একাধিক বৈঠক হয়েছে। অপারেটররা কালক্ষেপণের জন্য বিদ্যমান টাওয়ারের আকাশ-কুসুম দাম হাঁকাচ্ছে। নানা টালবাহানা করছে।


মন্তব্য লিখুন :