বৈঠকে কি সিদ্ধান্ত নিল ২০ দলীয় জোট?

বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের বৈঠকে বেশ কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এছাড়া কয়েকটি বিষয়ে জোট নেতাদের মধ্যে আলোচনা হলেও কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি।বৈঠক সূত্রে এমন তথ্য জানা গেছে। সোমবার রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে এ বৈঠক হয়।

বৈঠকজুড়েই ছিল বিএনপির প্রতি শরিকদের যত অভিযোগ।বৈঠকে অংশ নেয়া বিএনপির প্রতিনিধি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও নজরুল ইসলাম খান এগুলো মন দিয়ে শুনেন ও নিজেদের মতামত তুলে ধরেন।

একাদশ সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে প্রার্থী দেয়ার সিদ্ধান্তের কথা বিএনপি জোট শরিকদের জানিয়েছে।এছাড়া বগুড়া-৬ আসনের উপনির্বাচনেও যাওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে দলটি। তবে উপনির্বাচনে অংশ নেয়ার বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।প্রতি মাসের ৮ তারিখ জোটের নিয়মিত বৈঠকের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে।

জোটনেত্রী খালেদা জিয়ার মুক্তিসহ নারী নির্যাতন, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, হত্যার প্রতিবাদে রমজানের মধ্যে যে কোনো একদিন মানববন্ধন কর্মসূচি পালনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। ঈদের পর খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে বড় ধরনের কর্মসূচি দেয়ার বিষয়েও একমত পোষণ করেছেন জোট নেতারা। জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়া বিজেপির চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিভ রহমান পার্থকে বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও তিনি যোগ দেননি।

বৈঠক শেষে বিএনপির পাঁচ এমপির শপথকে কেন্দ্র করে জোটে যে অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে, তা অনেকটাই দূর হয়েছে বলে জানিয়েছেন শরিকরা। সার্বিক পরিস্থিতিতে বিএনপির ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট তারা। ভুলবোঝাবুঝির অবসান ঘটিয়ে ভবিষ্যতে ঐক্যবদ্ধ থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন শরিক দলের নেতারা। বিএনপির পক্ষ থেকে গুরুত্বপূর্ণ যে কোনো সিদ্ধান্তে শরিকদের মতামত নেয়া হবে বলেও প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। মাসে অন্তত দুই দিন জোটের বৈঠকের বিষয়েও সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সভাপতিত্বে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন- জোটের সমন্বয়ক নজরুল ইসলাম খান, জামায়াতে ইসলামীর আবদুল হালিম, কল্যাণ পার্টির মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহম্মদ ইবরাহিম, জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) মোস্তফা জামাল হায়দার, এলডিপির ড. রেদোয়ান আহমেদ, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি-এনপিপির ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, ইসলামী ঐক্যজোটের অ্যাডভোকেট আবদুর রকিব, খেলাফত মজলিসের ড. আহমেদ আবদুল কাদের, পিপলস লীগের সৈয়দ মাহবুব হোসেন, লেবার পার্টির ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, জাগপার খন্দকার লুৎফর রহমান প্রমুখ।

সূত্র জানায়, বৈঠকের শুরুতে শরিক দলের নেতারা বিএনপি নেতাদের কাছে জানতে চান- নির্বাচন আমরা প্রত্যাখ্যান করলাম, শপথ না নেয়ার সিদ্ধান্তও ছিল। পরে জোটের সঙ্গে আলোচনা না করে কেন শপথের সিদ্ধান্ত নেয়া হল। আবার অন্য এমপিরা শপথ নিলেও মহাসচিব কেন নিলেন না। এ নিয়ে শরিকদের ব্রিফ করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, আমরা কৌশলগত কারণে শপথ নিয়েছি। আমার শারীরিক অসুস্থতার কারণে আমি যাইনি।

আমি বাইরে থেকে কাজ করতে চাই। আমরা পার্লামেন্টে কথা বলব, আবার বাইরেও বলব। পার্লামেন্টে গিয়েই বিএনপির এমপি হারুন-অর রশিদ নির্বাচনকে অবৈধ, সরকারকে অবৈধ বলেছেন বলেও উদাহরণ দেন বিএনপি মহাসচিব। পরে সার্বিক পরিস্থিতিতে বিএনপির ব্যাখ্যায় সন্তোষ প্রকাশ করেন শরিক দলগুলো। ভুলবোঝাবুঝির অবসান ঘটিয়ে ভবিষ্যতে ঐক্যবদ্ধ থাকার প্রতিশ্রুতি দেন তারা। একই সঙ্গে বিএনপির পক্ষ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ যে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে শরিকদের মতামত নেয়া হবে বলেও প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়। মাসে অন্তত দুই দিন জোটের বৈঠকের বিষয়েও সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

জোটের এক শীর্ষ নেতা জানান, বৈঠকের একপর্যায়ে সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়নের বিষয়ে শরিকদের মতামত জানতে চান বিএনপি নেতারা। এ সময় আমরা প্রার্থী দেয়ার বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেয়ার কথা বলেছি।পরে বিএনপির এক নেতা বলেন, সংরক্ষিত নারী আসনে আমরা একজনকে মনোনয়ন দেব।

তবে কাকে দেবেন তা বলেননি। এছাড়া বগুড়া-৬ আসনের উপনির্বাচনের বিষয়ে মতামত জানতে চাইলে আমরা একই কথা বলেছি। ওই উপনির্বাচনে অংশ নেয়ার বিষয়ে বিএনপি নেতারা বৈঠকে বলেছেন, বগুড়ায় আমরা প্রার্থী দেব বলে চিন্তাভাবনা করছি। তবে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি।

সূত্র জানায়, বৈঠকের একপর্যায়ে লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরানের আলটিমেটাম নিয়ে কথা বলেন অনেকে। ইরানকে উদ্দেশ করে তারা বলেন, মিডিয়ার মুখরোচক হওয়ার দরকার নেই; যা বলবেন বৈঠকে, মিডিয়ায় কেন বলবেন। জবাবে ইরান বলেন, আমার কথা ভুলভাবে মিডিয়ায় উপস্থাপন করা হয়েছে। আলটিমেটামের কথা অস্বীকার করেন তিনি।

এছাড়া আন্দালিভ রহমান পার্থ প্রসঙ্গে বিএনপি নেতারা বৈঠকে জানান, আগে আমাদের সঙ্গে আলোচনা করে পার্থ সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন। তবুও তাকে বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল কিন্তু তিনি আসেননি। মান-অভিমান থাকতে পারে, দীর্ঘদিন একসঙ্গে আন্দোলন সংগ্রাম করেছি। তাকে জোটে ফেরানোর জন্য এখনও আমরা হাল ছাড়িনি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ব্যারিস্টার আন্দালিভ রহমান পার্থ বলেন, জোটের বৈঠকে আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। কিন্তু আমি বৈঠকে যোগ দেব না- এটাই স্বাভাবিক। কারণ ২০ দলে এখন আমি নেই। তবে রাজনৈতিক দল হিসেবে আমাকে আলাদাভাবে বিএনপি ডাকলে আমি যেতে পারি।

গত ৬ মে ২০ দল ছাড়ার ঘোষণা দেয় আন্দালিভ রহমান পার্থর দল বিজেপি। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে বেশি প্রাধান্য ও শপথ নেয়ার সিদ্ধান্তকে অনৈতিক দাবিসহ আরও কিছু ইস্যুতে জোট ছাড়েন তিনি।

সর্বশেষ গত ১১ ফেব্রুয়ারি ২০ দলীয় জোটের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সোমবার তৃতীয়বারের মতো বৈঠক করে বিরোধী এই জোট।

বৈঠক শেষে জোটের সমন্বয়ক বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান সাংবাদিকদের বলেন, বৈঠকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। সেগুলো হল- ২০ দলীয় জোট প্রতি মাসের ৮ তারিখ বৈঠক করবে। জোটনেত্রী খালেদা জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তি ও সূচিকিৎসার দাবিতে ২০ দলীয় জোট একক ও পৃথক পৃথক কর্মসূচি দেবে। তিনি বলেন, কৃষক ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। তাই কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্যের দাবি এবং কৃষিপণ্যের দাম কমানোর দাবি করা হয়েছে বৈঠক থেকে। মিডনাইট নির্বাচন বাতিল করে পুনরায় নির্বাচনের দাবিতে বৃহত্তর ঐক্য গঠনের লক্ষ্যে ২০ দলের বাইরের রাজনৈতিক দলগুলোকে একত্র করার উদ্যেগ নেয়া হয়েছে।

বিজেপির চেয়ারম্যান আন্দালিভ রহমান পার্থ ২০ দল থেকে চলে গেছেন- এমন প্রশ্নের জবাবে নজরুল ইসলাম খান বলেন, পার্থ আমাদের সঙ্গে শুরু থেকেই ছিলেন। আশা করি মান-অভিমান ভুলে আবার ২০ দলীয় জোটে ফিরে আসবেন। লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরানের আলটিমেটাম প্রসঙ্গে জোটের সমন্বয়ক বলেন, ইরান আজকেও বৈঠকে ছিলেন। তিনি ২০ দলীয় জোট ছাড়ার আলটিমেটামের কথা অস্বীকার করেছেন।

২০ দলীয় জোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মধ্যে মতবিরোধ চলছে- এমন প্রশ্ন করা হলে নজরুল ইসলাম বলেন, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের পূর্বে ২০ দলীয় জোটের মতামত নেয়া হয়েছে। তারা সবাই জাতীয় ঐক্য গঠনের পক্ষে বলেছেন এবং সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। তাই ঐক্যফ্রন্ট গঠনে কোনো বাধা নেই।

মন্তব্য লিখুন :