ঝিনাইদহের ফুলে রঙিন সারাদেশের বাজার

আজ বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। সারাদেশে বসন্ত বরণও হচ্ছে একই সাথে। আজকের দিনে তরুণ-তরুণীসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষ তার প্রিয়জনকে ফুল দিয়ে ভালোবাসা প্রকাশ করবেন। ফুলেল পরিবেশে হবে বসন্ত বরণের নানা অনুষ্ঠান। যে কারণে দিনটি ফুল ছাড়া একেবারে চলেই না। এক দিনে দুটি ফুল নির্ভর উৎসব হওয়ায় কয়েকদিন আগেই ফুলে ফুলে ভরে গেছে দেশের সব ফুলের পাইকারী বাজার। যেখানে রয়েছে সারাদেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গাঁদাফুল উৎপাদনকারী অঞ্চল খ্যাত ঝিনাইদহ কালীগঞ্জের ফুলচাষীদের উৎপাদিত ফুলও।

আজকের দিনে একসাথে পালিত হচ্ছে বিশ্ব ভালোবাসা দিবস ও বসন্তবরণ। তাই ফুল বিক্রির ক্ষেত্রে খানিকটা বাড়তি মাত্রা যোগ হয়েছে। ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনার সাথে মানুষ আজ ভালোবাসা দিয়েই বরণ করছে ঋতুরাজ বসন্তকে। আবার কয়েক দিন পরেই জাতীয়ভাবে পালিত হবে আরেক অনুষ্ঠান আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। সে দিনও সারাদেশে থাকবে ফুলের ছড়াছড়ি। প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি মাসেই পালিত হয় ফুল নির্ভর তিনটি বড় উৎসব। ফলে এ মাসের বাজার ধরতে ফুলচাষিদের ব্যস্ততা থাকে বহুগুণ বেশি।

ফুলচাষিরা জানান, আজকের বসন্তবরণ ও ভালোবাসা দিবসে সারাদেশের ফুলের চাহিদা মেটাতে গত বেশ কয়েকদিন কাটিয়েছেন মহা ব্যস্ততায় মাঝে। এ অঞ্চলের কৃষকেরা কয়েকদিন আগেই তাদের উৎপাদিত ফুল বড় বড় গাড়ি ভরে ফুল পাঠিয়েছেন ঢাকার শাহবাগ, আগারগাঁও, চট্রগ্রামের চেরাগী পাহাড় বাজার, ফেনি, দিনাজপুর, রংপুর, কুমিল্লা, নওগাসহ দেশের বড় বড় শহরের পাইকারী ফুলের বাজারে। আজকের দিনে এ ফুল কিনবেন ফুলের জন্য মুখিয়ে থাকা সারাদেশের তরুণ- তরুণীসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষ। গত ২ দিনে যারা ফুল বিক্রি করেছেন গোলাপের দাম পেয়েছেন অন্য যে কোন বছরের তুলনায় অনেক বেশি।



কালীগঞ্জ উপজেলা কৃষি অফিসসূত্রে জানাগেছে, ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার মাটি ফুল উৎপাদনে সহায়ক। বর্তমানে এ এলাকায় দেশী বিদেশী জাতের ভিন্ন ভিন্ন রঙের লিলিয়াম, গ্লাডিওলাস, জারবেরা, রজনীগন্ধ্যা, গোলাপ, চন্দ্র মল্লিকা, ভুট্রাফুল, গাঁদাসহ  বর্তমানে এ উপজেলায় প্রায় ৯৫ হেক্টর জমিতে ফুল চাষ করা হয়েছে। যা সারাদেশের ফুলের চাহিদা মেটাতে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে। লাভজনক তাই দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে ফুলচাষ।

গত বুধবার সকালে উপজেলার বিভিন্ন মাঠে গিয়ে দেখা যায় কৃষকেরা বাণিজ্যিভাবে চাষ করেছেন দেশী বিদেশী জাতের বিভিন্ন রঙ ও সৌরভের ফুল। ফুলচাষিরা তাদের ক্ষেতে উৎপাদিত ফুল বাজারজাত করতে সকলেই ব্যস্ত। গ্রামের অস্বচ্ছল পরিবারের মেয়েরা ফুল কন্যা হিসেবে মজুরীর ভিত্তিতে ক্ষেত থেকে ফুল তুলছেন, বাজারজাতকরণে সহজ বহনযোগ্য করতে মালা বা ঝোপা তৈরী করছেন তারা। বেলা গড়ানোর সাথে সাথে কালীগঞ্জ শহরের মেইন বাসস্ট্যান্ডে আসলে দেখা যায় উপজেলার শত শত ফুলচাষী ইঞ্জিনচালিত বিভিন্ন পরিবহন বোঝাই ফুল নিয়ে দুরপাল্লার গাড়ির অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছেন। আবার কিছু কিছু দুরপাল্লার যাত্রীবাহী বাসের ছাদে ফুলের বড় বড় ঢোপ সাজানো হচ্ছে। কৃষকদের উৎপাদিত নানা রঙের ফুলে ফুলে ভরে গেছে মেইন বাস টার্মিনাল।

সারাদেশের আড়তগুলোতে ফুল পাঠাতে আসা একাধিক ফুলচাষি জানান, সারা বছরই তারা ফুল বিক্রি করে থাকেন। তবে প্রতিবছর বাংলা ও ইংরেজি নববর্ষের দিন, স্বাধীনতা দিবস, বসন্তবরণ, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, বিশ্ব ভালবাসা দিবসসহ ধর্মীয় বিভিন্ন দিনগুলোতে ফুলের অতিরিক্ত চাহিদা থাকে। বিশেষ করে এ মাসের জন্য তাদের উৎপাদিত ফুল বাজারজাতকরণে বাড়তি প্রস্ততি নিতে হয়।

উপজেলার ফুলচাষি ও পাইকারী ব্যবসায়ী গিয়াস উদ্দীন জানান, ফুল একটি সৌখিন ও লাভজনক চাষ। দেশের ফুলের চাহিদার মেটাতে সারাদেশের মধ্যে দক্ষিণাঞ্চালের জেলা যশোর ও পার্শ্ববর্তী ঝিনাইদহ জেলা প্রায় ২ যুগ ধরে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে। প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন জাতীয় উৎসবে এ এলাকায় উৎপাদিত ফুল ব্যবহৃত হয়ে থাকে। আজকের বিশ্ব ভালোবাসা দিবস ও বসন্ত বরণ পালন করছে সারাদেশ। এ দিনটি ফুল ছাড়া একেবারে চলেই না। ফলে ফুলের চাহিদা সাথে দামও বেশি পাবেন এলাকার ফুলচাষীরা এমন আশায় বুক বেধে আছেন।



উপজেলার বড়ঘিঘাটি গ্রামের ফুল কন্যা আয়েশা বেগম জানান, তিনি অস্বচ্ছল পরিবারের একজন সদস্য। সারাবছর ফুলচাষীদের ক্ষেত থেকে ফুল তুলে মালা ও ঝোঁপা তৈরীর কাজ করে প্রতিদিন আড়াই’শ থেকে ৩’শ টাকা আয় করেন। যা দিয়ে পরিবারের ভরন পোষন ও ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার খরচ যোগান।

উপজেলার সবচেয়ে বড় ফুলচাষি ত্রিলোচনপুর গ্রামের টিপু সুলতান জানান, ২০১৭ সালে ৫৫ লাখ টাকা খরচ করে ৫ বিঘা জমিতে বিদেশী জারবেরা ফুলের চাষ করেছিলেন। ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৮০ লাখ টাকার ফুল বিক্রি করেছিলেন। এ বছরও তার প্রায় ১৫ বিঘা জমিতে বিদেশী জাতের ভিন্ন ভিন্ন রঙের লিলিয়াম, গ্লাডিওলাস, জারবেরা, রজনীগন্ধ্যা, গোলাপ, চন্দ্র মল্লিকা, ভুট্রা ফুলের চাষ করেছেন।

এলাকার পুরাতন এই ফুলচাষি আরও জানান, তিনি সারা বছরই ফুল বিক্রি করেন তবে আজকের বসন্তবরন, ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে যে ফুল বাজারে পাঠিয়েছেন কমপক্ষে ১০ লাখ টাকা আসবে বলে আশা করছেন। আর কয়েক দিন পরের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে আরও আসবে কমপক্ষে ১০ লাখ টাকা।



ফুলচাষি ও ব্যবসায়ীদের একটি সংগঠন বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটির কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি আব্দুর রহিম জানান, দেশের দক্ষিণাঞ্চালের ফুলেই সারাদেশের বাজার দখল করে আছে। ফুল উৎপাদনের দিক দিয়ে সারাদেশের মধ্যে ঢাকার সাভার ও যশোরের গদখালির পরেই ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের অবস্থান। তবে গাঁদা ফুল উৎপাদনে সারাদেশের মধ্যে প্রথম স্থানে রয়েছে কালীগঞ্জ। আজকের বসন্তবরণ ও বিশ্ব ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে গত ৩//৪ দিন আগে থেকেই সারাদেশের ফুলের পাইকারী বাজার গুলোতে ফুল বিক্রি শুরু হয়ে গেছে। গত বুধবার রাতে প্রতি ঝোপা গাঁদা বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকায়, রজনীগন্ধ্যার ষ্টিক প্রতি একশ বিক্রি হচ্ছে ৫ থেকে ৬শ টাকায়, তবে প্রতি একশ গোলাপ বিক্রি হচ্ছে ১৮’শ থেকে ২ হাজার টাকায়। প্রায় ৩ যুগের ব্যবসার অভিজ্ঞতায় গোলাপের দাম তার জানা মতে এ বছরই সর্বোচ্চ দামের রেকর্ড বলে দাবি করেন এই ব্যবসায়ী।