১১ মাসে বেনাপোল বন্দরে রাজস্ব ঘাটতি ১৩৪৬ কোটি টাকা

২০১৮-১৯ অর্থবছরের ১১ মাসে দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোলে এবার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে এক হাজার ৩৪৬ কোটি টাকা রাজস্ব ঘাটতি হয়েছে। কাস্টমস কর্তৃপক্ষ বলছে, শুল্ক ফাঁকি রোধে এই বন্দরে কড়াকড়ি আরোপ করায় আমদানি কমে গিয়ে রাজস্ব ঘাটতি বেড়েছে। তবে ব্যবসায়ীদের দাবি, বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, শুল্ক ফাঁকি ও কাস্টমসে ঘুষের দাবিতে হয়রানি বেড়ে যাওয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশের ২৩টি স্থলবন্দরের মধ্যে বর্তমানে চালু আছে ১৩টি। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় বেনাপোল বন্দর। রাজস্ব আদায়ে সবসময় এগিয়ে থাকে এ বন্দরের কাস্টমস হাউজ। স্বাধীনতার পর থেকে ভারতের সঙ্গে এ পথেই  বাংলাদেশের বেশিরভাগ বাণিজ্য হয়েছে। প্রতিবছর এ বন্দর দিয়ে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার পণ্য আমদানি হয়ে থাকে, যা থেকে সরকার প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করে। বন্দরের ধারণ ক্ষমতা ৪২ হাজার মেট্রিক টন। সেখানে সব সময় পণ্য মজুত থাকে প্রায় দেড় লাখ মেট্রিক টনের মতো। বর্তমানে বন্দরে ২৮টি পণ্যাগার, আটটি ওপেন ইয়ার্ড, একটি ভারতীয় ট্রাক টার্মিনাল, একটি রফতানি ট্রাক টার্মিনাল ও একটি ট্রান্সশিপমেন্ট ইয়ার্ড রয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

বন্দর সূত্র জানায়, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বেনাপোল বন্দরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ হাজার ১৯৫ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। আদায় হয়েছিল ৪ হাজার ১৬ কোটি ২৪ লাখ টাকা এবং ঘাটতি ছিল ১৭৯ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা পাঁচ হাজার ৪৮৩ কোটি টাকা। গত বছরের জুলাই থেকে এ বছরের ২১ মে পর্যন্ত ১১ মাসে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে রাজস্ব ঘাটতি রয়েছে এক হাজার ৩৪৬ কোটি টাকা।

ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, 'কাস্টমসে আমদানি পণ্য পরীক্ষার নামে ফাইল আটকে অর্থ দাবি করা হয়। টাকা না দিলে ঢাকায় ল্যাবরেটরিতে পণ্য পরীক্ষা করার জন্য পাঠাতে চায় তারা। এসব ঝামেলা এড়াতে  এই বন্দর দিয়ে আমদানি কমিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।  তবে বেনাপোলে পণ্য পরীক্ষার ব্যবস্থা ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজর থাকলে ব্যবসায়ীদের হয়রানি পোহাতে হতো না। '

ব্যবসায়ী শাহজাহান কবির বলেন, 'এক শ্রেণির ব্যবসায়ী কাস্টমস কর্মকর্তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। এটাও রাজস্ব ঘাটতির অন্যতম কারণ। এছাড়া, বৈধ আমদানি চালান কাস্টমস কর্তৃক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরও সুনির্দিষ্ট কোনও অভিযোগ ছাড়াই কখনও কখনও বিজিবি সদস্যরা তা আটকে রাখেন। সেখানেও ২-৩ দিন পণ্য আটকে থাকে। আমদানি-রফতানি বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিজিবি ও কাস্টমসের মধ্যে সমন্বয় থাকা দরকার।'

বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মহসিন মিলন বলেন, 'যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ হওয়াতে এ বন্দর দিয়ে সবাই ব্যবসা করতে চান। কিন্তু এখানকার অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে সুষ্ঠু বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সপ্তাহে সাত দিন ২৪ ঘণ্টা বাণিজ্য সেবা চালু থাকলেও ব্যবসায়ীরা তার সুফল পাচ্ছেন না। আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের প্রসার ঘটাতে হলে বৈধ সুবিধা দেওয়া ও অবকাঠামো উন্নয়নের বিকল্প নেই।'

আমদানি-রফতানিকারক সমিতির সহ-সভাপতি আমিনুল হক বলেন, 'বন্দরে অবকাঠামোগত সমস্যা রয়েছে। মাঝে মাঝে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে, েএতে ক্ষতিগ্রস্ত  হন ব্যবসায়ীরা। সাধারণ পণ্যাগারে কেমিক্যাল পণ্য খালাস করা হয়। বহিরাগতরা অবাধে বন্দরে প্রবেশ করে। ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল, বন্দরের নিরাপত্তায় সিসি ক্যামেরা স্থাপনের। কিন্তু আজ পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন হয়নি। এসব করণে এ বন্দর দিয়ে ব্যবসায়ীরা আমদানি করতে ভয় পান।'

বেনাপোল কাস্টমস হাউজের জয়েন্ট কমিশনার শহীদুল ইসলাম জানান, পণ্য চালান ও খালাসে কাস্টমসে আগের চেয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বেড়েছে । শুল্ক ফাঁকি বন্ধে কড়াকড়ি আরোপ করায় কিছু ব্যবসায়ী আমদানি কমিয়েছেন। বিশেষ করে রাজস্ব বেশি আসে এমন পণ্য কম আমদানি হচ্ছে। এতে রাজস্ব ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। শুল্ক ফাঁকির সঙ্গেও কেউ কেউ জড়িত থাকেন। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।' ব্যবসায়ীদের বৈধ সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে কাস্টমস আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছেন বলেও জানান তিনি।

বেনাপোল বন্দর পরিচালক প্রদোষ কান্তি দাস বলেন, 'আমি যোগদানের পর থেকে বন্দরে সব ধরনের শৃঙ্খলা ফেরাতে কাজ করে যাচ্ছি। জায়গা সংকটের কারণে বর্তমানে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। তবে নতুন জায়গা অধিগ্রহণ ও উন্নয়ন কাজ শুরু করা হয়েছে।'