অপার সম্ভাবনার শুঁটকি খাত, চাই শুধু সরকারের নজর

সুন্দরবনের উপকূলের দুবলার চরে চলছে শুঁটকি তৈরির ভরা মৌসুম। শীতে আবহাওয়া শুষ্ক থাকায় শুঁটকি উৎপাদন যেমন বেশি হয়, তেমনি দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রফতানিও চলে পুরোদমে। এবার দেশের চাহিদা মিটিয়ে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার শুঁটকি মাছ রফতানির আশা করছেন ব্যবসায়ীরা।

দেশের সর্ববৃহৎ এই শুঁটকি মহালের সঙ্গে কমপক্ষে ১০-১২ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা জড়িত। শুঁটকি শিল্পের সঙ্গে ব্যবসায়ীসহ প্রায় ১০ হাজার শ্রমিক জড়িত রয়েছেন। এছাড়াও রয়েছেন ৫০ হাজার জেলে।এভাবে সারাদেশে শুঁটকি তৈরি ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সঙ্গে লাখো নারী-পুরুষের কর্মসংস্থান জড়িত।তাই উপকূলীয় অঞ্চলের ছোট-বড় সব শুঁটকি মহালগুলোতে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন জেলে, শ্রমিক ও ব্যবসায়ীরা। আর সরকারি সহযোগিতা পেলে এ শিল্পকে আরও এগিয়ে নেওয়া সম্ভব বলে আশা তাদের।

সুন্দরবনের লালদিয়া, আশারচর, সোনাকাটা, জয়ালভাঙ্গা চরের, শুঁটকি পল্লীতে অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত ৬ মাস ধরে চলে শুঁটকি পক্রিয়াজাতকরনের কাজ। শুঁটকিকে কেন্দ্র করে উপকূলীয় হাজার হাজার জেলে ও মৎস্যজীবীদের আনাগোনায় মুখরিত থাকে এসব চরগুলো।



সরেজমিনে দেখা যায়, গভীর সাগর থেকে জেলেরা মাছ নিয়ে দেশের বৃহত্তম মৎস অবতরন কেন্দ্র পাথরঘাটা (বিএফডিসি) ঘাটে ভিড়ছেন। ব্যবসায়ীরা সেই মাছ কিনে পল্লীতে নিয়ে যাচ্ছেন। এরপর ধুয়েমুছে কাটা-বাছার পর শুঁটকির জন্য বাঁশের তৈরি মাচায় রোদে শুকাচ্ছেন। আবার কেউ বস্তায় ভরছেন শুঁটকি মাছ।

প্রচলিত পদ্ধতিতে শুকানো এই শুঁটকি নিয়ে নানা প্রশ্ন থাকলেও চাহিদা রয়েছে ব্যাপক। এখানের উৎপাদিত শুঁটকি দেশের বিভিন্ন স্থানে যাচ্ছে। এ সময় প্রায় ২৫ প্রজাতির মাছের শুঁটকি দেখা যায়। এর মধ্যে রূপচাঁদা, ছুরি, লইট্যা, কোরাল, সুরমা, পোপা উল্লেখযোগ্য। মধ্য-উপকূল এবং পশ্চিম-উপকূলের বাসিন্দাদের মধ্যে শুঁটকি খাওয়ার প্রবণতা কিছুটা কম থাকলেও পূর্ব-উপকূলের মানুষজনের কাছে শুঁটকি অত্যন্ত প্রিয়।

মাছ শুকিয়ে শুঁটকি বানানোর প্রথা অনেক পুরোনো হলেও বাণিজ্যিকভাবে এর উৎপাদন হয় মূলত দেশের উপকূলীয় এলাকাতেই। প্রতিদিন প্রায় ৮ থেকে ১০টি ট্রাক অর্থাৎ ৮০ থেকে ৯০ টন শুঁটকি মাছ ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্রির জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

খুচরা বাজারে প্রতি কেজি লইট্যা ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা, ফাইস্যা ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা, ছুরি ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা, ছোট চিংড়ি ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা, ছোট পোয়া ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা, রইস্যা ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা, রূপচাঁদা ১৫০০ থেকে ১৮০০ টাকা, লাক্ষা ১৪০০ থেকে ১৮০০ টাকা,  মাইট্যা ৫০০ থেকে ৭০০, বড় চিংড়ি (চাগাইচা) ১৩০০ থেকে ১৫০০ টাকা। এছাড়াও বিভিন্ন প্রজাতির মাছ বিভিন্ন দামে বিক্রি হয়ে থাকে।



বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে শুঁটকি তৈরি হয় ১০ থেকে ১২ হাজার টন। এর অধিকাংশ প্রাকৃতিক উপায়ে অর্থাৎ রৌদ্রে শুঁকিয়ে শুঁটকি তৈরি করা হয়। শুঁটকি তৈরিতে ১৬টি কারখানা ইতোমধ্যে গড়ে উঠেছে যেখানে রোদের পরিবর্তে বিদ্যুতের তাপে মাছ শুকানো হয়।

এছাড়াও  শুঁটকি মহালের মাছের গুড়ি সারাদেশে পোল্ট্রি ফার্ম ও ফিস ফিডের জন্য সরবরাহ হয়ে থাকে। ঢাকার বড় বড় ফিস ফিডের ফার্মসহ দিনাজপুর, নরসিংদী, চট্টগ্রামেও চাহিদা মেটায়। প্রতি মৌসুমে নাজিরারটেক শুঁটকি মহাল থেকে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ বিদেশে রফতানিসহ ক্রয়-বিক্রয় হয়ে থাকে। উপকূলে শুঁটকি উৎপাদন শুরু হয়েছে। এবার দেশের চাহিদা মিটিয়ে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার শুঁটকি মাছ রফতানির আশা করছেন ব্যবসায়ীরা।

সূত্র বলেছে, বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর প্রায় ৬২৩ মেট্রিক টন শুঁটকি বিদেশে রপ্তানি করা হয় (২০১৭-১৮ অর্থবছরে হিসাব)। দেশে ৮-১০ প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ বাণিজ্যিকভাবে শুঁটকি করা হয়। সমুদ্র উপকূলের নিকটবর্তী দ্বীপের পলি মাটিতে কৃষি আবাদ বহু মানুষের ভাগ্য বদলে দিয়েছে। সয়াবিনের মতো অর্থকরী ফসল উৎপাদনেও বিপ্লব ঘটেছে উপকূলে। সমুদ্র সৈকতের খনিজ বালু এই জনপদের আরেক সম্ভাবনা।

পর্যটন খাতেও উপকূল জুড়ে রয়েছে অফুরন্ত সম্ভাবনা। উপকূলজুড়ে শুঁটকি উৎপাদনের বিরাট সম্ভাবনা থাকলেও পদে পদে রয়েছে বাধা। সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাব আর বাজারজাতকরণে বহুমূখী সমস্যার কথা জানালেন সংশ্লিষ্টরা। তারা মনে করেন, সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই শিল্প থেকে আরও বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি এ শিল্পে জীবিকা নির্বাহ হতে পারে লাখো লাখো মানুষের।

কক্সবাজারের নাজিরারটেক শুঁটকি ব্যবসায়ী বহুমুখী সমবায় সমিতি, কক্সবাজার মৎস্য ব্যবসায়ী ঐক্য পরিষদ নেতাদের অভিমত, নাজিরেরটেক শুঁটকি মহাল থেকে সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় হলেও, বহু লোকের কর্মসংস্থান হলেও এর সম্ভাবনা বিকাশে সরকারের বিশেষ নজর নেই। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে, জেলেদের দাদন মুক্ত করা গেলে এবং শুঁটকি বাজারজাতকরণের সমস্যাসমূহ দূর করতে পারলে উপকূলের শুঁটকি বিরাট সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে।

এ ব্যাপারে দুবলা ফিশারম্যান গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক কামাল আহম্মেদ জানান, প্রতি বছর চট্টগ্রাম, সাতক্ষিরা, খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট,  পিরোজপুর, শরণখোলা, মোংলা, রামপাল, দাকোপ থেকে প্রায় ২০ হাজার জেলে দুর্যোগসহ বিভিন্ন ঝুঁকি নিয়ে শুঁটকি উৎপাদন করেন। এ খাত থেকে সরকার কোটি কোটি টাকা রাজস্ব আয় করলেও জেলেদের নিরাপত্তায় পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র বা চিকিৎসা সেবার ব্যবস্থা নেই। এদিকে সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করেন তিনি।