ঘর সামলে সফল উদ্যোক্তা; সিমির জামদানি যাচ্ছে ইউরোপেও

পঞ্চগড় উপজেলার গলেহাকান্তমনি গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধার মেয়ে কাজী শাহনেওয়াজ আফরিন সিমি। এইচএসসি পাস করার পরই বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয় তাকে। স্বামী, দুই সন্তান নিয়ে সুখের সংসার হলেও সিমি ভুগছিলেন আত্মপরিচয় সংকটে। সিমি ভাবেন অনলাইনে ব্যবসা করবেন। কিন্তু কী ব্যবসা করবেন, তা ভেবে উঠতে পারছিলেন না।

শেষে নিজের জমানো টাকা নিয়ে নিজেকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার তাগিদ থেকে ছোট পরিসরে শুরু করেন অনলাইন ব্যবসা। তার সিগনেচার পণ্য জামদানি শাড়ি। সাথে আছে দেশীয় শাড়িও। শুরুর দিকে নিজে বিভিন্ন জায়গা থেকে শাড়ি কিনে তার উপর ডিজাইন করে বিক্রি করা শুরু করেন। মাত্র ৪ বছরের ব্যবধানে তিনি এখন সফল উদ্যোক্তা। অর্জন করেছেন ক্রেতাদের আস্থা। দেশ ছাড়িয়ে তার তৈরি পণ্য যাচ্ছে সুদূর ইউরোপেও।

যদিও প্রথমদিকে বেশ সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় তাকে। চোখের সমস্যার কারণে বন্ধ করতে হয় নিজের ডিজাইন করা পণ্য বিক্রি করা। এছাড়া ব্যবসার পলিসি না বুঝার কারণেও সমস্যায় পড়তে হয় তাকে। তবে কখনোই হতাশ হননি এই নারী। অনলাইন স্টাডি ও কয়েকটি কর্মশালায় যোগদান করে ব্যবসায় নামেন নতুন উদ্যমে। এখন মাসে তার বিক্রি অর্ধ লক্ষ টাকা।




ব্যবসার হালচাল নিয়ে সিমির সাথে কথা হয় ডেইলি জাগরণের। তিনি বলেন, ছোট থেকেই চেয়েছিলাম পড়াশোনা শেষ করে নিজের পায়ে দাঁড়াব। নিজে থেকে কিছু করবো। বাবা মুক্তিযোদ্ধা হওয়ায় চাকরির সুযোগ থাকলেও কোথাও ট্রাই করা হয়নি। নিজে কিছু করার ইচ্ছে থেকেই ২০১৭ সালে ‘জুনাইরাস সিক্রেট’ নামে ফেসবুক পেজ খুলি। তখল ভাবলাম দর্জি থেকে নিজে ডিজাইন দিয়ে ড্রেস বানিয়ে সেগুলোতে নিজে হাতের কাজ করবো। কিন্তু সিজারের পর ছোট বাচ্চাকে নিয়ে সেভাবে পারতাম না আর হঠাৎ করে চোখের সমস্যা দেখায় সেটা পুরোপুরি বাদ দিতে হলো। কিন্তু স্বপ্ন দেখা আমার থেমে থাকেনি।


সিমি বলেন, এবার একটু অন্যভাবে ভাবলাম। অনেকে বাধা দিয়েছে কটু কথাও বলেছে  দুই একজন সাপোর্ট ও করেছে কিন্তু আমি আমার মনে জোর একত্রিত করে আবার আমার সেই পুরনো পেইজটি নিয়ে ২০২০ সালের শুরুতে জামদানি শাড়ি নিয়ে নেমে পড়লাম। প্রথম দিকে একটু ভয় পেতাম সঠিক বিজনেস পলিসি বুঝতাম না কিন্তু সেল হওয়া শুরু করলো। আমার আগ্রহ বেড়ে গেল। আমি অনলাইন বিজনেস নিয়ে স্টাডি  শুরু করলাম, বিভিন্ন ওর্য়াকশপ, সেমিনার এ জয়েন হতাম, এভাবেই ২ মাসের মাথায় যুক্তরাষ্ট্রের এক কাস্টমারের থেকে প্রায় ৫৫০০০ টাকার বেশি একটি অর্ডার পেয়ে গেলাম। উনি দ্বিতীয়বার আমার কাছে আবার অর্ডার করে আমার রিপিট কাস্টমার হয়ে গেলেন। আমি এভাবেই মনের জোর পেলাম আর আমার স্বপ্ন পূরণের দিকে একটু একটু করে এগিয়ে গেলাম। আল্লাহর অশেষ রহমতে এখন আমার মাসে প্রায় অর্ধ লক্ষ টাকার উপরে সেল হয়। আমেরিকা, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশ থেকেও অর্ডার আসে। 


ঘর কান্না সামলে সফল এই নারী উদ্যোক্তা বলেন, অনেকে আমাকে একটা প্রশ্ন করে দুইটা ছোট বাচ্চা নিয়ে কিভাবে আমি দুইটা বিজনেস চালাই আমার কষ্ট হয় না? এই প্রশ্নের সম্মুখীন আমাকে প্রতিনিয়ত হতে হয়। আমি তাদের এই উত্তরই দেই যে না আমার বাচ্চা দুইটা নিয়ে বিজনেস চালাতে কোন সমস্যা হয় না। তবে হাসবেন্ড এর সহযোগিতা ছাড়া এতোদূর আসা সম্ভব হতো না। সে কখনো কোন কাজে আমাকে বাধা দেইনি। সে অর্থনৈতিকভাবে ও মানসিকভাবে আমাকে সাপোর্টদিয়ে গেছে। আমি বিশ্বাস করি কষ্ট আর পরিশ্রম না করলে জীবনে কেউ সফল হতে পারে না। আমার কথা আমাকে পারতেই হবে, একদিন আমার পরিচিতি হবে নিজের একটা ব্র্যান্ড হবে আর এর জন্য তো পরিশ্রম করতেই হবে, তাই না ?


অনলাইনে পণ্যের কোয়ালিটি নিয়ে ক্রেতাদের অনেক অভিযোগ থাকে, প্রায় সময়ই দেখা যায় নিম্নমানের পণ্য ক্রেতাকে ধরিয়ে দেওয়া হয় এমন প্রশ্নের উত্তরে সিমি বলেন, আমি সবসময়ই চেষ্টা করি মানসম্মত প্রোডাক্ট দেয়ার। কোয়ালিটির ব্যাপারে কম্প্রোমাইজ করি না। অনলাইনে অনেক কাস্টমার আছে যারা দাম নিয়ে একটু গিল্টি ফিল করে। এটা বাস্তব সত্য যে ভালো কোয়ালিটির কাপড় নিলে আপনাকে দাম বেশি দিতেই হবে। আপনি যখন কম দামে কোন কাপড় নিবেন তখন সেটা কোয়ালিটি ভালো হবে না। অনলাইনে অনেকে কম দামে খারাপ কোয়ালিটির কাপড় কিনে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। আর এখন কাপড়ের রেপ্লিকার অভাব নেই। অনেকে একি শাড়ি বা কাপড় কেও কম কেও বেশি দামে বেচে যার কোয়ালিটির মধ্যেও অনেক পার্থক্য থাকে। কাস্টমার যেখানে কম দাম দেখে সেখান থেকে কিনে, ফলে ঠকে যায়।



নতুন উদ্যোক্তাদের ব্যাপারে আপনার উপদেশ কী এমন প্রশ্নের জেবাবে সিমি বলেন, সত্যি বলতে আমিও নিজেও তরুণ উদ্যোক্তা। আমি বিশ্বাস করে মনের জোরটাই বড় কথা। কারও কোন কথায় কান না দিয়ে মনের জোরটাকে  একত্রিত করে কাজ করে যেতে হবে, তাহলেই সফলতা আসবে।


সব মিলিয়ে সিমির মনে থাকা স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে পেরেছেন। পাশাপাশি মানসম্মত পণ্য বিক্রি করে ক্রেতার চাহিদা পূরণ করে একটি স্থায়ী অবস্থান তৈরি করছেন। এভাবে সিমির প্রতিষ্ঠিত অনলাইন ব্যবসার স্বপ্ন, উদ্যম আর সাফল্যগাথা দেশের হাজারো তরুণ উদ্যোক্তাকে উৎসাহ এবং সাহস জোগাবে।