জেলেদের চাল নিয়ে ইউপি চেয়ারম্যানদের চালবাজি

পহেলা বৈশাখ সামনে রেখে ইলিশ নিয়ে যখন মাতামাতি তখন উপকূলীয় এলাকার প্রান্তিক জেলেদের দিন কাটছে দু'বেলার খাবার জোটানোর দুশ্চিন্তায়। অভিযোগ মিলেছে, তাদের জন্য ধার্য প্রণোদনার চাল চুরি করে বিক্রি করছেন কতিপয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। এ অবস্থায় ন্যায্য পাওনা বুঝে পাওয়ার দাবিতে বিক্ষোভ করছেন তারা। 

প্রতি বছরের মতো এবারও জেলেদের অভিযোগ, চাল বিতরণে নানা ছলচাতুরী করছেন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানরা। তাদের ভাষ্য, একদিকে পরিমাণে কম দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে জেলে নয় এমন পরিবারকে চাল দেওয়া হচ্ছে। এ অনিয়মের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করছেন তারা। কয়েকজন ইউপি চেয়ারম্যানের বাড়ি থেকে প্রণোদনার চাল জব্দ করেছে পুলিশ। এতে করে আরও বেশি ক্ষোভ সঞ্চার হয়েছে জেলেদের মধ্যে।

বরিশাল মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা (ইলিশ) বিমল চন্দ্র দাস বলেন, প্রতি বছর ১ নভেম্বর থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত জাটকা অর্থাৎ, ১০ ইঞ্চির কম সাইজের ইলিশ নিধনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। এ ছাড়া ইলিশ অভয়াশ্রম হিসেবে চিহ্নিত উপকূলীয় এলাকার ৪৩২ বর্গকিলোমিটার নদীতে ১ মার্চ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত টানা দুই মাস সব ধরনের মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা থাকে। এ সময়কে কেন্দ্র করে প্রণোদনা হিসেবে প্রতি মাসে ৪০ কেজি করে ৪ মাসে ১৬০ কেজি চাল দেওয়া হয় জেলেদের। মৎস্য মন্ত্রণালয়ের সুপারিশে ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয় ভিজিএফ প্রকল্পের আওতায় ইউপি চেয়ারম্যানের মাধ্যমে এ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে। 

বিমল দাস বলেন, চাল বিতরণের পুরো ক্ষমতা ইউপি চেয়ারম্যানদের হাতে। মৎস্য বিভাগ কার্যক্রমটি শুধু পর্যবেক্ষণ করে। প্রতি বছরই চেয়ারম্যানদের নানা অনিয়মের খবর তারা শোনেন, এবারও শুনছেন। মৎস্য বিভাগের আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষমতা না থাকায় তারা এর কোনো সুরাহা করতে পারছেন না। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত বুধবার মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার জয়নগর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মনির হাওলাদারের বাড়ি থেকে প্রণোদনার ৯৫ বস্তা চাল জব্দ করে পুলিশ। জেলেদের অভিযোগ, তাদের জন্য বরাদ্দকৃত চাল কালোবাজারে বিক্রির উদ্দেশ্যে তা মজুদ করা হয়েছিল। চেয়ারম্যানের বিচারের দাবিতে গত বুধ ও বৃহস্পতিবার স্থানীয় জেলেরা বিক্ষোভ করেছেন। তবে মনির হাওলাদার জানান, ইউনিয়ন পরিষদের নির্দিষ্ট গোডাউন না থাকায় বিতরণের জন্য আনা চাল তিনি বাড়িতে রেখেছিলেন। তার প্রতিপক্ষ গ্রুপ একে ভিন্ন খাতে নিতে জেলেদের উস্কে দিচ্ছে।

বৃহস্পতিবার সকালে পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার দাসপাড়া ইউনিয়নের মুসলিমপাড়া গ্রাম থেকে জব্দ করা হয় প্রণোদনার আট বস্তা চাল। ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি আতিকুর রহমান মোহন জানান, প্রকৃত জেলেদের বাদ দিয়ে চেয়ারম্যান একেএম জাহাঙ্গীর হোসেন তার অনুসারী সচ্ছল ব্যক্তিদের মধ্যে চাল বিতরণের সময় ওই চাল জব্দ করা হয়। যদিও চেয়ারম্যানের দাবি, তাকে হেয়প্রতিপন্ন করতে ছাত্রলীগ নেতা আতিকুর নাটক সাজিয়েছেন। একই অভিযোগ তুলে বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জের চর এককরিয়া ইউনিয়নের জেলেরা ৯ এপ্রিল উপজেলা মৎস্য অফিসের সামনে বিক্ষোভ করেন। 

ক্ষুদ্র মৎস্যজীবী জেলে সমিতির কেন্দ্রীয় সভাপতি আনোয়ার হোসেন সিকদার বলেন, প্রান্তিক জেলেরা তাকে জানিয়েছেন ১৫ থেকে ২০ কেজির বেশি চাল দিচ্ছেন না ইউপি চেয়ারম্যানরা। আমরা জানামতে, ভোলার রামদাসপুর ইউনিয়নের জেলেরা সর্বোচ্চ ২৫ কেজি করে চাল পেয়েছেন। তিনি জানান, চেয়ারম্যানরা চাল চুরিতে এবার নতুন কৌশল নিয়েছেন। যেসব কার্ডধারী জেলে প্রণোদনার জন্য তালিকাভুক্ত হননি, তাদেরও চাল দেওয়া হবে- এ কথা বলে তালিকাভুক্ত জেলেদের ১৫-২০ কেজি করে চাল দেওয়া হচ্ছে। এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে আগামী ১৬ এপ্রিল উপকূলীয় জেলার সব জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হবে।

বরিশাল বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বরিশাল বিভাগের ছয় জেলায় তালিকাভুক্ত জেলে আছেন ৩ লাখ ৫১ হাজার ৩০ জন। তার মধ্যে প্রণোদনার জন্য তালিকাভুক্ত হয়েছেন ১ লাখ ২৯ হাজার ৬৭৮ জন।