জড়িত থাকার কথা মিন্নি আদালতে বলেনি : বাবা

বরগুনায় রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন স্ত্রী রিফাত শরীফ মিন্নি। তার বাবা মোজাম্মেল হক কিশোর বলেছেন, মিন্নি হত্যায় জড়িত থাকার কথা আদালতকে বলেনি। তবে রিফাত শরীফকে মারধর করা হবে সেটি সে জানত- সে কথাই বলেছে। কারাগারে গিয়ে মিন্নির সঙ্গে দেখা করার পর শনিবার এ তথ্য জানান তিনি। কিশোর বলেন, রিমান্ডে নির্যাতন করেই মিন্নিকে আদালতে স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য করেছে পুলিশ।

মিন্নির প্রতি সহানুভূতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মামলার বাদী রিফাতের বাবা আবদুল আলীম দুলাল শরীফ। তিনি বলেন, হত্যাকারীদের পক্ষে এগুলো মানুষের মায়াকান্না। মিন্নি বলেন, আমি মিন্নি ও তার বাবার বিরুদ্ধে প্রতারণা ও মানহানির মামলা করব।

এ হত্যার তদন্তে হস্তক্ষেপ বা পুলিশ-আইনজীবী কাউকে কোনো চাপ দিচ্ছেন না বলে শনিবার জানিয়েছেন বরগুনা-১ আসনের এমপি ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু। তিনি বলেন, সংসদ নির্বাচনের সময় কিছু লোক আমাকে দুর্নীতিবাজ বানাতে চেয়েছেন। কিন্তু তারা সফল হয়নি। প্রধানমন্ত্রী তথ্য যাচাই করে কোনো সত্যতা পাননি। আমাকে মনোনয়ন দিয়েছেন। সেসব লোক তো এখনও আছেন। তারা তো বসে নেই। তারাই আমাকে ও আমার ছেলে সুনাম দেবনাথের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করে বেড়াচ্ছে।

এদিন দুই নম্বর আসামি রিফাত ফরাজী ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। তদন্ত কর্মকর্তা মো. হুমায়ুন কবির শনিবার বিকাল ৩টায় বরগুনা সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. সিরাজুল ইসলাম গাজীর আদালতে রিফাত ফরাজীকে হাজির করেন। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন তিনি। পরে বিচারক তাকে কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ দিয়েছেন।

জবানবন্দিতে রিফাত ফরাজী কী বলেছে- জানতে চাইলে হুমায়ুন কবির বলেন, কপি না পাওয়া পর্যন্ত কিছু বলতে পারব না। তাকে নির্যাতন করে স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়েছে কিনা? জবাবে তিনি বলেন, তাকে কোনো নির্যাতন করা বা ভয়ভীতি দেখানো হয়নি। আপনারাও তো ভিডিও ফুটেজে দেখেছেন। রিফাত শরীফ হত্যার সঙ্গে সরাসরি জড়িত দেখা গেছে তাকে। এ নিয়ে ১৪ জন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিলেন।

মিন্নির বাবার বক্তব্য : মোজাম্মেল হক কিশোর বিকালে বলেন, ‘আমি, আমার স্ত্রী ও মেয়ে জেলখানায় আমার মেয়ের (মিন্নি) সঙ্গে বেলা ১১টায় দেখা করেছি।’ মিন্নি আপনাকে কি বলেছে? কিশোর বলেন, ‘অনেক কথা বলেছে।’ আপনি শুক্রবার বলেছিলেন আপনার মেয়েকে নির্যাতন করে পুলিশ আদালতে স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য করেছে। এমন কোনো কথা আজ (শনিবার) মিন্নি আপনাকে বলেছে কি? জবাবে কিশোর বলেন, ‘আপনারা তো সবাই বোঝেন। রিমান্ড মানেই নির্যাতন।’

আপনার মেয়ে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে কি রিফাত হত্যার সঙ্গে জড়িত ছিল এমন কথা স্বীকার করেছে? কিশোর বলেন, ‘না, তা করেনি। তবে নয়ন বন্ডরা রিফাত শরীফকে ২৬ জুন মারধর করবে সেটা মিন্নি জানত, সে কথা বলেছে।’

আপনি শুক্রবার অভিযোগ করেছিলেন, সুনাম দেবনাথকে বাঁচাতে মিন্নিকে বলি দেয়া হচ্ছে। এসব হচ্ছে শম্ভু বাবুর (ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু) খেল। এমপি ও ছেলের বিরুদ্ধে এখনও কি আপনার অভিযোগ আছে? জবাবে তিনি বলেন, ‘না আগের মতো নেই। এমপি যদি আমার মেয়ের পক্ষে হস্তক্ষেপ করতেন। তাহলে আমার মেয়ে মিন্নি আসামি হতো না।’ এমপির বিরুদ্ধে অভিযোগ দিতে আপনাকে কেউ বুদ্ধি দিয়েছে কিনা? মিন্নির বাবা বলেন, ‘আমি রাগে-অভিমানে তার বিরুদ্ধে কথা বলেছি।’

ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুর বক্তব্য : বরগুনা-১ আসনের এ সংসদ সদস্য শনিবার দুপুরে তার বরগুনার ল’ চেম্বারে সঙ্গে কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘রিফাত হত্যার বিচার আমি চাই। রিফাত হত্যার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের ব্যাপারে পুলিশ তদন্ত করছে। কে জড়িত, কে জড়িত নয়- সবকিছু তদন্তে বেরিয়ে আসবে।’

মিন্নির বাবার অভিযোগ প্রসঙ্গে শম্ভু বলেন, ‘দেখুন, মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হক কিশোর না বুঝে আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার করছে। আমি তো কিশোরের বা তার মেয়ের শত্রু নই। মিন্নি আমার মেয়ের মতো। আমি বা আমার ছেলে কেন কিশোরের মেয়েকে মামলায় জড়াব। কথাগুলো সত্য নয়।

কেন আপনাদের বিরুদ্ধে মিন্নির বাবা এমন অভিযোগ এনেছেন? এমপি বলেন, ‘সেটা কি করে বলব। তবে আমি বরগুনা-১ আসনে ৫ বার সংসদ সদস্য, বরগুনা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি, একবার মন্ত্রী ছিলাম। আমার জনপ্রিয়তা দেখে কেউ ঈর্ষান্বিত হয়ে কিশোরকে দিয়ে মিথ্যা বানোয়াট অভিযোগ দেয়াতে পারে।’

আপনি মামলায় হস্তক্ষেপ করছেন- এমন অভিযোগও আপনার বিরুদ্ধে রয়েছে। জবাবে এমপি বলেন, সংসদ সদস্য ছাড়াও আমি একজন আইনজীবী। আপনারা পুলিশের কাছে জানুন, আমি কোনোদিন কোনো সময় তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে কোনো কথাবার্তা বলেছি কিনা।

মিন্নির বাবা বলেছেন, আপনার ছেলের কারণে তার মেয়ের পক্ষে কোনো আইনজীবী পাচ্ছেন না। এমপি বলেন, ‘এগুলো ঠিক নয়। আমি শুক্রবার বরগুনা এসেছি। অনেক আইনজীবীর সঙ্গে আলাপ করেছি। তারা সবাই বলেছেন, আমাদের মিন্নি আইনজীবী নিয়োগ করলে তারা মামলা পরিচালনা করবেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘মিন্নির বাবা কিশোর ভালো মানুষ। তাদের পরিবারও সম্মানিত। আমি তাদের সবাইকে চিনি। হয়তো কিশোরকে কেউ ভুল বুঝিয়েছে।’

রিফাত শরীফের বাবার বক্তব্য : দুলাল শরীফ শনিবার দুপুরে বলেন, আমার একমাত্র ছেলেকে নয়ন বন্ডরা দিনদুপুরে কুপিয়ে হত্যা করেছে। এ হত্যাকাণ্ডে যারা জড়িত তাদের পক্ষে এখন মানুষের মায়াকান্না দেখছি। অথচ আমার পক্ষে কেউ নেই। আমি আগেও বলেছি, আমার ছেলে হত্যার সঙ্গে মিন্নি জড়িত ছিল। সেই তথ্যপ্রমাণ আমার কাছে আছে।

দুলাল শরীফ আরও বলেন, মিন্নির বাবা আমার সঙ্গে প্রতারণা করেছে। মিন্নি ১৫ অক্টোবর ২০১৮ নয়ন বন্ডকে বিয়ে করেছে। সেই বিয়ে বলবৎ থাকা অবস্থায় বিয়ে গোপন করে মিন্নির বাবা মিন্নিকে আমার ছেলের সঙ্গে বিয়ে দেয়। যা সম্পূর্ণ অবৈধ বিয়ে। তিনি বলেন, আমি মিন্নির বাবার বিরুদ্ধে প্রতারণা ও মানহানির মামলা করব। আমি বাকি আসামিদের গ্রেফতারের দাবি জানাই।

মিন্নির পক্ষে ঢাকার আইনজীবী : বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) কর্মকর্তা, সুপ্রিমকোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জেডআই খান পান্না শনিবার বলেন, ব্লাস্ট, আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক), নিজেরা করি ও এএলআরডির পক্ষ থেকে বরগুনায় আইনজীবী পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। ৪০-৪৫ জন মিন্নিকে আইনগত সহায়তা দেবেন। এরই মধ্যে আমাদের আইনজীবীরা কাজ শুরু করে দিয়েছেন। মামলার তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করছেন। একটি অংশ আজ (শনিবার) রাতেই বরগুনার উদ্দেশে রওনা হবে। পান্না আরও বলেন, এছাড়া অন্যান্য সংস্থার আইনজীবীরাও যাবেন বলে শুনেছি। মিন্নির পক্ষে আইনি লড়াইয়ের ঘোষণা দিয়েছেন ফেনীর সোনাগাজী থানার সাবেক ওসি মোয়াজ্জেমের আইনজীবী ফারুক আহম্মেদও।