মুক্তির ছোঁয়ায় অবহেলিতরাও স্বপ্ন দেখছে!

“স্বপ্ন” মানুষকে বেঁচে থাকার প্রেরণা জোগায়। স্বপ্ন কম-বেশি সকলেই দেখে। কিন্তু এমন কিছু মানুষ আছে যাদের জীবনে স্বপ্নেরদ্বার যেন অধরাই থেকে যায়। সেই সব অবহেলিত মানুষদের স্বপ্নের দুয়ার উন্মোচন করতেই কল্লোল ফাউন্ডেশন আয়োজন করেছে বিভিন্ন কার্যক্রমের।

২০১২ সালের মাঘ মাস, প্রচন্ড শীতে জরোসরো অবস্থায় বসে আছে একদল মানুষ। এই অবহেলিত মানুষ গুলোর পড়নে ছেড়াঁ-মলিন কাপড়। চোখে মুখে বয়সের ছাপ। মনে হতাশা আর অপ্রাপ্তির ছায়া। বসে বসে হুক্কা টানছে আর জীবনের হিসাব মেলানোর চেষ্টা করছেন।

এ সময় একজন মমতাময়ী এক নারী এসে পাশে বসেন এবং তাদের জানা অজানা কষ্টগুলো গভীর মনোযোগ দিয়ে শোনেন। সেই নিদারুন কষ্টেগুলো তাকে নাড়া দেয়। এর পর থেকেই শুরু হয় নতুন করে বেঁচে থাকার লড়াই। সাধ্যের মধ্যেই তিনি চেষ্টা করেন সকল ধরনের সহযোগিতার। তিনি আর কেউ নন তিনি হলেন সকলের প্রিয় মুক্তি, পুরো নাম অ্যাডভোকেট কোহেলি কুদ্দুস মুক্তি।

মুক্তি মহিলা যুব নেতৃত্বের পাশা পাশি গড়ে তুলেছেন কল্লোল ফাউন্ডেশন নামের একটি অরাজনৈতিক স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান। সেই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই তিনি পৌঁছে দিচ্ছেন সেবা সাধারণ মানুষের দোরগোরায়।

জানা যায়, কল্লোল ফাউন্ডেশনের ‘স্বপ্নদার’ নামের একটি স্কুলের যাত্রা শুরু হয় ২০১৫ সালে ওই এলাকার অবহেলিত মানুষের অন্ধকার দূর করতে। মূলত চলনবিলের পিছিয়ে পড়া ক্ষুদ্র নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠির বয়স্ক ও শিশুদের দোরগোড়ায় শিক্ষা পৌঁছে দিতেই স্বেচ্ছাসেবী এই সংগঠনের ব্যাতিক্রমি উদ্যোগ। এখানে শিশুদের পাশাপাশি বয়ষ্কদেরও শিক্ষা দেওয়া হয়। প্রায় শতাধিক ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠির লোকেরা লেখাপড়া করছেন এই বিদ্যালয়ে।

মূলত দেশ, সমাজ তথা বেকার যুব সমাজের কর্মসংস্থানের কথা মাথায় রেখেই ঘরোয়া পরিবেশে যাত্রা শুরু করে এই প্রতিষ্ঠানটি। ২০১২ সালে দুই থানা ব্যাপী শুরু হয় এর কার্যক্রম। প্রতিষ্ঠানের মূল নেতা কোহেলি কুদ্দুস মুক্তি। তিনি বাংলাদেশ যুব মহিলা লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ সভাপতি। রাজনীতির পাশা পাশি মানব সেবাই ছিল তার অদম্য ইচ্ছা আর সেই ইচ্ছা থেকেই তিনি সমাজের কিছু সচেতন শিক্ষিত মানুষকে নিয়ে শুরু করেন কল্লোল ফাউন্ডেশন। যার মাধ্যমে সমাজের বেকার যুবক-যুবতিসহ সমাজের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া দুর্বল মানুষদের পাশে থেকে কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন তিনি।

এছাড়া বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কার্যক্রম ও করে থাকে এই প্রতিষ্ঠানটি। এটি বর্তমানে বেকার যুবক-যুবতীদের আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করছে। দুঃস্থ রোগীদের সাহায্যে সহযোগীতা প্রদান, ডিজিটাল বাংলাদেশে গড়ার লক্ষ্যে গুরুদাসপুর-বড়াইগ্রামের ৭ শতাধিক স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক জিপিএ-৫ প্রাপ্তদেরকে প্রতি বছর ক্রেষ্ট ও সার্টিফিকেট প্রদান করে থাকে।

এছাড়া তথ্য প্রযুক্তি নির্ভর জ্ঞান দান ও কম্পিউটার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে থাকেন। ক্ষুদ্র নৃ-তাত্বিক জনগোষ্ঠিদের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা প্রদানসহ বিভিন্ন প্রকার বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের আয়োজন করে থাকে। হস্ত শিল্পের প্রশিক্ষণ,  মাদকদ্রব্যের ভয়াবহতা সম্পর্কে জনসাধারণকে সচেতন, দুঃস্থদের মাঝে শীত বস্ত্র বিতরণ, বৃক্ষ রোপন,ঈদ পূজাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে উপহার সামগ্রী বিতরণ এবং প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিন উপলক্ষে এতিমদের মাঝে খাবার বিতরণসহ নানাবিধ কার্যক্রম পরিচালনা করে।

এই কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ পেয়েছেন ইয়াং বাংলা কর্তৃক আয়োজিত ‘জয় বাংলা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড-২০১৭’।

সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা কোহেলি কুদ্দুস মুক্তি বলেন, মূলত সমাজের পিছিয়ে পড়া অসহায় মানুষগুলোর জন্যই আমার এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা। তার পরও এত বড় একটা স্বীকৃতি ভবিষ্যতে তাদের কাজের অনুপ্রেরণা যোগাবে।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধেও সময়  নির্মম ভাবে শহীদ হওয়া ১৭ মাসের একজন শিশু কল্লোল। তার নাম অনুসারে এই ফাউন্ডেশনের নামকরণ করা হয় “কল্লোল ফাউন্ডেশন”। কল্লোল  নাটোর-৪ আসনের পাঁচবারের নির্বাচিত সাংসদ এবং নাটোর জেলা আ.লীগের সভাপতি অধ্যাপক আব্দুল কুদ্দুসের জ্যেষ্ঠ পুত্র ছিলেন।

১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় শত্রুপক্ষের  নির্মমতায় শিকার হয়ে শাহাদৎ বরণ করেন কল্লোল। মূলত তার স্মৃতি এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধরে রাখতেই ৯ এপ্রিল ২০১২ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত করা হয়। রাজশাহী বিভাগের নাটোর জেলার গুরুদাসপুর ও বড়াইগ্রাম উপজেলায় এর কার্যক্রম চলছে। এর মোট সদস্য সংখ্যা ৬১ জন। সদস্যদের চাঁদা এবং দাতা ও প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের চাঁদার মাধ্যমেই চলে এই প্রতিষ্ঠানের সকল কার্যক্রম।