কুষ্টিয়ায় দীর্ঘ হচ্ছে লাশের মিছিল

কুষ্টিয়ায় দীর্ঘ হচ্ছে লাশের মিছিল। লকডাউনের চতুর্থ দিনেও করোনায় শনাক্ত ও মৃত্যু উদ্বেগজনকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। হাসপাতাল ওয়ার্ডের বাতাস ভারি হয়ে উঠছে করোনায় মৃত ব্যক্তিদের স্বজনদের কান্নায়।

জেলায় বুধবার সকাল ৮টা থেকে বৃহস্পতিবার( ২৪ জুন) সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় করোনায় আক্রান্ত হয়ে ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজের পিসিআর ল্যাব ও বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অ্যান্টিজেন পরীক্ষাসহ ৪৫২ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ১৩৯ জনের করোনা পজিটিভ শনাক্ত হয়েছে।

শনাক্তের হার ৩০ দশমিক ৭৫ শতাংশ। বৃহস্পতিবার সকালে জেলা সিভিল সার্জনের কার্যালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্র জানায়, এ পর্যন্ত জেলায় করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা ৬ হাজার ৮০২ এবং মৃত্যু ১৭৩। গত ৭ দিনে জেলায় ২ হাজার ৬৭১ জনের নমুনা পরীক্ষায় ৮৯৫ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে এবং শনাক্তের হার ৩৩ দশমিক ৫১ শতাংশ। এ সময়ে করোনায় মারা গেছেন ৩৭ জন।

গত ২৪ ঘণ্টায় করোনা থেকে সুস্থ হয়েছেন ৪১ জন। এ সময়ে জেলায় নতুন করে ৩৭ রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২৫ জন এবং বিভিন্ন উপজেলায় ভর্তি হয়েছেন ১২ জন। বর্তমানে জেনারেল হাসপাতালে ১২৩ জনসহ বিভিন্ন হাসপাতালে করোনায় আক্রান্ত হয়ে আইসোলেশনে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ১৫৪।

জেলায় কঠোর লকডাউনের চতুর্থ দিন ছিল বৃহস্পতিবার। লকডাউন কার্যকর করার জন্য জেলা শহরের বিভিন্ন স্থানে চেকপোস্ট বসিয়েছে পুলিশ। এ ছাড়া ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান পরিচালনা করছেন। এর মধ্যেও কোনোভাবেই কমানো যাচ্ছে না করোনায় সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখী হার ও মৃত্যু। বুধবার স্বাস্থ্যবিধি ভাঙার জন্য জেলাজুড়ে অভিযান চালিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত ১ লাখ ৩৬ হাজার ৭৫০ টাকা জরিমানা আদায় করেছেন।

অপরদিকে বৃহস্পতিবার বেলা পৌনে বারোটার দিকে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে গেলে দেখা যায়, এক নারীর বিলাপে হাসপাতাল ওয়ার্ডের বাতাস ভারি হয়ে উঠেছে। তাকে জড়িয়ে ধরে সান্তনা বাক্যে কান্না থামানোর ব্যর্থ চেষ্টা করছেন তারই এক নারী স্বজন। কান্নায় ভেঙে পড়া ওই নারীর নাম নাসিমা খাতুন। বাড়ি কুষ্টিয়া পৌরসভার মিনা পাড়া মহল্লায়। স্বামী মিলন হোসেন কিছুক্ষণ আগে হাসপাতালের বেডে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। করোনা মাত্র ৪৫ বছর বয়সেই কেড়ে নিয়েছে মিলনের প্রাণ। অকালে স্বামীকে হারিয়ে চারদিকে অন্ধকার নেমে এসেছে নাসিমার তাই সদ্য স্বামী হারা ওই নারীর বুকফাটা আর্তনাদ এর কাছে সব সান্তনা বাক্য যেন তুচ্ছ।

নাসিমা খাতুন এর সাথে থাকা নারী জানান, গত ২১ জুন মিলন হোসেনের শরীরে করানো শনাক্ত হয়। পরদিন ২২ জুন তাকে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে করোনা ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। তার দু’দনের মাথায় সেখানে  বৃহস্পতিবার (২৪ জুন) বেলা এগারটার পর তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। এমন হৃদয় ভাঙ দৃশ্যের অবতারণা এখন কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডে প্রতিদিন ঘটছে। কোন দিন ৯ জন, কোন দিন জন আবার কোন দিন ৫ জন -এভাবেই মৃত্যুর মিছিলে যোগ হচ্ছে নতুন নতুন মুখ।
২৫০ শয্যার হাসপাতালে প্রথম দিকে করোনা ওয়ার্ডে শয্যা সংখ্যা ছিল ৪১টি। জেলায় করোনা সংক্রমণ বাড়তে থাকার সাথে সাথে সেই শয্যা সংখ্যা উন্নীত হয়েছে ১০০টিতে। কিন্তু তাতেও কাজ হচ্ছে না। শয্যা ছাড়িয়ে এখন আক্রান্ত মানুষের ঠাঁই হয়েছে বারান্দায়,করিডোরে পেতে রাখা সারি সারি শয্যায়। এ ওয়ার্ডে বর্তমানে ভর্তি আছে ১৭০ জন মানুষ। বাধ্য হয়ে বৃহস্পতিবার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ শয্যা সংখ্যা ২০০তে উন্নীত করেছেন। কিন্তু তাতে কি শেষ রক্ষা হবে? তেমনটি মনে পড়ছে না কেউ। কারণ, এখন প্রতিদিন জেলায় ১০০জনের বেশি নতুন রোগী শনাক্ত হচ্ছে। তাই হাসপাতালের সবগুলো শয্যার যদি করোনা রোগীদের জন্য ছেড়ে দেয়া হয় তাতেও কুল পাওয়া যাবে না। যা ভাবিয়ে তুলেছে জেলার স্বাস্থ্য বিভাগের কর্তাদের।

হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক (আর এম ও) ডাক্তার তাপস কুমার সরকার বলেন, তাদের অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কিন্তু তারা সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করে যাচ্ছেন রোগীদের সেবা দিতে। তাদের লোকবল সঙ্কট রয়েছে। রয়েছে অক্সিজেন সংকটও।

তিনি আরো বলেন, জেলার সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা যথেষ্ট অভাব রয়েছে। জেলা জুড়ে লকডাউন চললেও মানুষ স্বাস্থ্যবিধি মানছেন না। কারণে-অকারণে ঘরের বাইরে বের হচ্ছেন। এখানে-ওখানে জটলা করছেন। আড্ডা দিচ্ছেন। এ কারণে রোগী শনাক্তের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই যাচ্ছে।