ক্যান্সার আক্রান্ত শিক্ষার্থীর সুচিকিৎসায় সুপারিশ করেননি ঢাবি ভিসি!

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে যকৃতের ক্যান্সারে আক্রান্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর সুচিকিৎসায় সুপারিশ করতে অপারগতা প্রকাশ করার অভিযোগ উঠেছে। এদিকে এই ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মাঝে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। এমনকি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও বইছে প্রতিবাদের ঝড়।


জানা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের ২৪তম ব্যাচের (২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষ) শিক্ষার্থী মো. কাজী জুয়েল আরও কয়েকজন সহপাঠী সাথে নিয়ে রবিবার (২০ মার্চ) বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সাথে দেখা করেন। সেখানে তিনি তার সুচিকিৎসার জন্য প্রধানমন্ত্রীর ফান্ড থেকে অর্থ সহায়তা পেতে উপাচার্যের সুপারিশ কামনা করেন। কিন্তু উপাচার্য এক্ষেত্রে অপারগতা প্রকাশ করেন।


পরে এ ঘটনায় হতাশা প্রকাশ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে পোস্টও দেন ঢাবির এই শিক্ষার্থী। পোস্টে তিনি লেখেন, ‘অনেক প্রত‍্যাশা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপাচার্য স‍্যারের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম, কিন্তু সম্পূর্ণ হতাশ হয়ে ফিরে আসছি। স‍্যারের একটু সুপারিশ আমার এই জীবন যুদ্ধকে অনেকটা সহজ করে দিতে পারতো। জীবন মরণের মাঝে দাঁড়িয়ে দায়িত্ববান মানুষের এরকম প্রত‍্যাখ‍্যান সহ‍্য করা খুবই কষ্টদায়ক।’


পোস্টের শেষে জুয়েল লেখেন, যদি মানুষের সব দরজা বন্ধ হয়ে যায়, আল্লাহ তোমার একটা দরজাটা খোলা রেখো! আমার বিপদে তুমিই উদ্ধার কইরো আল্লাহ। আমার চেষ্টার কোনো ত্রুটি ছিলো না।


এ বিষয়ে জানতে চাইলে মো. কাজী জুয়েল বিবার্তাকে বলেন, আমার শরীরে যকৃত প্রতিস্থাপন করতে ৪৫ থেকে ৫০ লাখ টাকা প্রয়োজন বলে জানিয়েছে চিকিৎসকরা। কাজেই আমার স্বল্প আয়ের পরিবারের পক্ষে এটা কোনোভাবে সম্ভব নয়। পরে বিভিন্নভাবে কিছু টাকারি ব্যবস্থা হয়েছে। কিন্তু তাতে তো কিছু হবে না। তাই আমি এমপির সুপারিশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর ফান্ড থেকে অর্থ সহায়তা পেতে আবেদন করেছি। কিন্তু আমাকে সেখান থেকে বলা হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য স্যারের সুপারিশ হলে সবচেয়ে ভালো হয়। তাই আমি স্যারের কাছে গিয়েছি।


এ শিক্ষার্থী বলেন, আমি স্যারের কাছে গেলেও তার কথায় হতাশ হয়েছি। স্যার বলেছেন, গণভবন থেকে অর্থ সহায়তা পেতে তিনি সুপারিশ করতে পারবেন না। এসময় তিনি আমাকে নিজ বিভাগে যোগাযোগসহ অন্য জায়গায় যোগাযোগ করতে বলেন।


এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অসুস্থ এই শিক্ষার্থীর সুচিকিৎসায় উপাচার্যের সুপারিশ করতে অপারগতা প্রকাশ করার ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ঘটনাটির তীব্র সমালোচনা চলছে।


এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ছাত্রসংসদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক (জি এস) ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিরাপত্তা মঞ্চের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়াস সিজার তালুকদার ফেসবুকে লিখেছেন, ‘ভিসি বলেছেন, ছাত্রদের জন্য তিনি সুপারিশ করেন না। লিভার ক্যান্সারে আক্রান্ত আমাদের জুয়েল বাঁচতে চায়৷ তার জন্য দরকার ৫০ লাখ টাকা৷ এজন্য পিএম অফিসে আবেদন করবে ফান্ডের জন্য৷ অত্যন্ত দুঃখ ও পরিতাপের বিষয়- ভিসির কাছে একটি সুপারিশ চাইতে গিয়েছিল অসহায় ছেলেটি। কিন্তু দেয়া হলো না!’


ক্ষোভ প্রকাশ করে এ শিক্ষার্থী লেখেন, সুপারিশ দেয়া হলো না কেন? লজ্জা লাগে? আগের ভিসি এমাজ উদ্দিনও ছাত্রদের সুপারিশ করতে লজ্জা পেতেন৷ পরে তার নিজের মেয়ের ক্যান্সারের চিকিৎসার জন্য যখন ভিক্ষা করতে হয়েছে তখন কিন্তু লজ্জা লাগে নাই৷


জুলিয়াস সিজার আরও লেখেন, আপনি (উপাচার্য) কিছু দিন আগে ছাত্রদের উৎসব তহবিলের টাকা দিয়ে আসছেন সরকারের ফান্ডে আর ছাত্রদের কাছ থেকে অন্যায়ভাবে পরিবহন ফি নিয়েছেন। লজ্জা লাগে না?


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিরাপত্তা মঞ্চের এই প্রতিষ্ঠাতা বলেন, আমাদের ভাইকে বাঁচাতে আপনাকে লাগবে না, স্যার! আপনাকে নিয়ে গাভী বৃত্তান্ত দ্বিতীয় খন্ড রচিত হবে একদিন!


এদিকে সিজারের এ পোস্টের মন্তব্যের ঘরে উপাচার্যের এ ভূমিকায় তীব্র ক্ষোভ জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।


মন্তব্যের ঘরে এক শিক্ষার্থী লিখেছেন, একটা মানুষ কতটা অসহায় হয়ে বাঁচার জন‍্য আকুতি করছে আর নির্লজ্জ ভিসি সামান্য সুপারিশ ও করতে পারে না! এরাই নাকি আবার আমাদের পিতৃতুল্য অভিভাবক! এদের পিতৃতুল্য অভিভাবক কথাটা বলে আমাদের সত‍্যিকারের অভিভাবকদের অসম্মান করা হয়।


আরেক শিক্ষার্থী লেখেন, ভিসি হয়তো ভুলে গেছেন শিক্ষার্থীরা আছে বলেই উনার এই ভিসি পদ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্তিত্ব আছে। সেই শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনে যদি তাদের পাশে না পাওয়া যায়। তাহলে এমন ভিসির দরকার কী?


ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে আরেক শিক্ষার্থী লেখেন, এসব নিয়ে কেন জোরালো কথা বলা হয় না? এর আগে ঢাবির জিয়া হলের ডাকসুর নির্বাচিত ভিপির ক্ষেত্রেও এমনটা ঘটেছিলো। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কোনো হেল্প করেনি। সে আমাদের ছেড়ে চলে গেছে। প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন পর্যন্ত এসব নিউজ যায় না কেন? এই প্রশাসনের গাছাড়া ভাব সম্পর্কে তাদের কাছে জানানো উচিৎ।


ফেসবুকে ক্ষোভ প্রকাশ করে পোস্ট দেয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ছাত্র সংসদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক (জি এস) জুলিয়াস সিজার তালুকদার বিবার্তাকে বলেন, আমাদের অসুস্থ এক ভাই তার সুচিকিৎসার জন্য স্যারের কাছে গিয়েছিলেন, কিন্তু স্যার যা বলেছেন, তাতেই সে শুধু নয়, আমরা সবাই হতাশ হয়েছি। এটা কোনো ভাবে মানা যায় না। তবে আমরা আমাদের ঐক্যবদ্ধ চেষ্টায় আমাদের ভাইয়ের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করবো।


অসুস্থ শিক্ষার্থীর সুচিকিৎসায় সুপারিশ না করার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান বিবার্তাকে বলেন, কী তথ্য পেয়ে বানিয়ে বানিয়ে বলতেছো, অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে তুমি এসব করতেছো। ওই শিক্ষার্থীকে আমি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের সাথে যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছি। এমনকি বিভাগের চেয়ারম্যানকে বলে দিয়েছি।


তিনি বলেন, আমার শিক্ষার্থীদের কিভাবে কী টেককেয়ার করতে হয়, কী হেল্প করতে হবে, সেটা আমরা সর্বাত্মক সহায়তা করি।


ঢাবি উপাচার্যের এ বক্তব্যের পর বিবার্তা২৪ডটনেটের পক্ষ থেকে ফের যোগাযোগ করা হয় অসুস্থ শিক্ষার্থী মো. কাজী জুয়েলের সাথে। এ বিষয়ে তিনি বিবার্তাকে বলেন, ভিসি স্যার আমার অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের সাথে যোগাযোগ করতে বলেছেন। বিভাগের চেয়ারম্যানকে তিনি বলেছেন। কিন্তু তার আগে তো আমার বিভাগের চেয়ারম্যান আমাকে ভিসির সাথে দেখা করতে বলেছেন।


এ শিক্ষার্থী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সবাই আমার বিভাগের অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের কথা বলে। কিন্তু অ্যাসোসিয়েশন তাদের সীমাবদ্ধতার কথা বলে। আমার আসল কাজটাই তো হলো না। প্রধানমন্ত্রীর ফান্ড থেকে আমার অর্থ সহায়তা পাওয়ার জন্য সুপারিশ করা হলো না।


উল্লেখ্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের আবাসিক ছাত্র মো. কাজী জুয়েল দীর্ঘদিন ধরেই যকৃতের ক‍্যানসারে ভুগছেন। প্রায় দুই বছর ধরে চেন্নাই ড. রেলা ইনস্টিটিউট অ্যান্ড মেডিকেল সেন্টারে (চিকিৎসক মোহাম্মদ রেলার অধীনে) তিনি চিকিৎসাধীন আছেন। ২০১৯ সালে তার একবার চিকিৎসা করা হলে যকৃতের ৪০ শতাংশ কেটে ফেলতে হয়েছে।
এ চিকিৎসায় ২০ লাখ টাকা খরচ হলেও সুস্থ হননি এ শিক্ষার্থী। পরে তার অবস্থার আরও অবনতি হলে যকৃতে নতুন টিউমার শনাক্ত হয়। এ পরিস্থিতিতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত তার ছোট বোন তাকে অর্ধেক যকৃত দান করতে সম্মত হয়েছেন৷ আর চিকিৎসকরা বলছেন, এই যকৃত প্রতিস্থাপনে প্রায় ৫০ লাখ টাকা প্রয়োজন। কিন্তু জুয়েলের নিম্নবিত্ত পরিবারের পক্ষে এটা বহন করা অসম্ভব।


জুয়েলকে সহযোগিতার করার মাধ্যম


বিকাশ ও নগদ নাম্বার- ০১৫৭১০২৯৯৯০, রকেট- ০১৫৭১০২৯৯৯০৭, ডাচ বাংলা ব্যাংক, একাউন্ট নাম্বার- ১৮২১৫৭০০০২৭৯৬ (সঞ্চয়), সফিপুর, কৃষি শাখা, গাজীপুর, ঢাকা।রাউটিং নাম্বার: ০৯০৩৩১৪৬৮
এছাড়াও তার বাবা মো. গোলাম মোস্তফার ব্যাংক একাউন্ট নাম্বারেও টাকা পাঠাতে পারেন: সোনালী ব্যাংক লিমিটেড, একাউন্ট নাম্বার- ০২১৬২০১০০৬৫০৩ (সঞ্চয়), সফিপুর আনসার একাডেমী কমপ্লেক্স শাখা, গাজীপুর,ঢাকা। রাউটিং নাম্বার- ২০০৩৩১৪৫৮