মেয়াদ শেষ দুই বছর আগে, নেতৃবৃন্দ তাকিয়ে আছে শেখ হাসিনার দিকে

তিন বছর পরপর সম্মেলন করে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের কথা থাকলেও আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকটি সহযোগী সংগঠনের ত্রি-বার্ষিক সম্মেলনের মেয়াদ পেরিয়েছে দুই বছর আগেই। এছাড়া ২০১৯ সালে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সম্মেলনের আগে বেশ কয়েকটি সহযোগী সংগঠনের সম্মেলন হয়েছিলো। এগুলোর মেয়াদও চলতি বছরের নভেম্বরে শেষ হবে। ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌কমিটির মেয়াদোত্তীর্ণের বয়স দুই বছর পার হলেও এখনো আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা তাকিয়ে আছেন শেখ হাসিনার দিকে।


মেয়াদোত্তীর্ণ সহযোগী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ বলছেন, সম্মেলন আয়োজনের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি রয়েছে। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার নির্দেশনা পেলে সম্মেলন আয়োজন করা হবে।


আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী- আওয়ামী মহিলা লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ, তাঁতী লীগ, যুব মহিলা লীগ ও মৎস্যজীবী লীগ আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন। এছাড়া ছাত্রলীগ ও জাতীয় শ্রমিক লীগ দলটির ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন। এর মধ্যে অন্তত চারটি সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে দুই বছর আগে।


সূত্রে জানা যায়, ২০২০ সালের মার্চে যুব মহিলা লীগ, মহিলা আওয়ামী লীগ ও তাঁতী লীগের কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে। ২০২০ সালের জুলাইয়ে শেষ হয়েছে ছাত্রলীগের মেয়াদ। এসব সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের বেশিরভাগ জেলা-উপজেলা কমিটিও দীর্ঘদিন ধরে মেয়াদোত্তীর্ণ। এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে আহ্বায়ক কমিটি দিয়েই চলছে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ।


আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ ও বঙ্গবন্ধু আইনজীবী পরিষদ এক হয়ে আওয়ামী পন্থী আইনজীবীদের জন্য ‘বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ’ নামে নতুন সংগঠন গঠন করা হয়েছিলো ২০১৭ সালের ২১ মে। অ্যাডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন ও ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপসকে নিয়ে আহ্বায়ক কমিটি করা হয়। যদিও এখনো এর পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়নি। এর বাইরে ২০১৯ সালের নভেম্বর মাসে যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, কৃষক লীগ, মৎস্যজীবী লীগ ও শ্রমিক লীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এসব সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটি মেয়াদ চলতি বছরের নভেম্বরে শেষ হবে।


নিয়মানুযায়ী আওয়ামী লীগের সম্মেলনের আগে সহযোগী সংগঠনের সম্মেলন সম্পন্ন করা হয়। বিগত জাতীয় সম্মেলনের আগেও মেয়াদোত্তীর্ণ সহযোগী সংগঠনগুলোকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেয়া হয়। আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হবে। ২০২৩ সালের শেষের দিকে কিংবা ২০২৪ সালের শুরুর দিকে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এ লক্ষ্যে দলের প্রাথমিক সদস্য সংগ্রহ ও সদস্যপদ নবায়নের জন্য গত ২ এপ্রিল থেকে দলের সাংগঠনিক ইউনিটগুলোর মধ্যে সদস্য সংগ্রহ ফরম বিতরণ কার্যক্রমও শুরু হয়েছে।


বই বিতরণ কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ডিসেম্বরে দলের জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হবে বলে আভাস দেন। এসময় তিনি আওয়ামী লীগের মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়া সহযোগী সংগঠনকে অনতিবিলম্বে সম্মেলনের তারিখ নির্ধারণ করে সম্মেলন অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নেয়ার নির্দেশ দেন।


মহিলা আওয়ামী লীগ: সর্বশেষ ২০১৭ সালের ৪ মার্চ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিলো। সম্মেলনে সাফিয়া খাতুন সভাপতি এবং মাহমুদা বেগমকে সাধারণ সম্পাদক করে কমিটি ঘোষণা করা হয়। তিন বছর মেয়াদি এই কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২০ সালের ৪ মার্চ। জানা গেছে, মহিলা আওয়ামী লীগের জেলা-উপজেলার বেশিরভাগ কমিটিই মেয়াদোত্তীর্ণ।


সম্মেলনের ব্যাপারে জানতে চাইলে সাংগঠনিক সাধারণ সম্পাদক মাহমুদা বেগম ক্রিক বিবার্তাকে বলেন, আমরা সম্মেলনের জন্য সবসময় প্রস্তুত আছি। ইতোমধ্যে আমরা কাজও শুরু করেছি। আমাদেরকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। জানানো হলে আমরা সম্মেলন করবো।


যুব মহিলা লীগ: ২০১৭ সালের ১১ মার্চ যুব মহিলা লীগের সর্বশেষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে নাজমা আক্তার সভাপতি ও অপু উকিল সাধারণ সম্পাদক হিসাবে পুনর্নির্বাচিত হন। ২০২০ সালের ১১ মার্চ এ কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে। জানা যায়, সারাদেশে সংগঠনের জেলা-উপজেলার বেশিরভাগ কমিটিরই মেয়াদ নেই।


জানতে চাইলে যুব মহিলা লীগের সভাপতি নাজমা আক্তার বিবার্তাকে বলেন, আমরা সারাদেশে সংগঠনকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে কাজ করছি। সম্মেলনের জন্য আমাদের প্রস্তুতি আছে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মহোদয়কে বলা আছে প্রধানমন্ত্রীর সাথে আলাপ করে তারিখ দেয়ার জন্য। তিনি তারিখ দিলে আমরা সম্মেলন করবো।


ছাত্রলীগ: আওয়ামী লীগের ভাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগের সর্বশেষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে ২০১৮ সালের ১১ ও ১২ মে। এর দুই মাস পর ২০১৮ সালের ৩১ জুলাই কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ গঠিত হয়। ২৯তম সম্মেলনে ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক হন গোলাম রাব্বানী। যদিও বছর পেরোতেই শোভন-রাব্বানীকে ২০১৯ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর অপসারণ করা হয়। দুই বছর মেয়াদি ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২০ সালের ৩১ জুলাই। শোভন-রাব্বানীকে অপসারণের পর গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, এক নম্বর সহ-সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয়কে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও এক নম্বর যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্যকে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেয়া হয়। কয়েক মাস ভারপ্রাপ্ত হিসাবে দায়িত্ব পালন করলেও ২০২০ সালের ৪ জানুয়ারি তাদের ভারমুক্ত করে পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব দেয়া হয়।


সম্মেলনের বিষয়ে জানতে ছাত্রলীগের সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় ও সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্যের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি। তবে গত ১৮ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ছাত্রলীগের সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় ও সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সাক্ষাৎ শেষে আল নাহিয়ান খান জয় বলেন, আমাদের কমিটির কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য বলেছেন। একই সঙ্গে সারাদেশের যেসব কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ সেখানে কমিটি দিতে বলেছেন। কেন্দ্রীয় সম্মেলনের বিষয়ে কোনো নির্দেশনা দেননি বলেও জানান তিনি।


তাঁতী লীগ: ২০১৭ সালের ১৯ মার্চ তাঁতী লীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সে সম্মেলনে ইঞ্জিনিয়ার শওকত আলীকে সভাপতি এবং খগেন্দ্র চন্দ্র দেবনাথকে সাধারণ সম্পাদক করে কমিটি ঘোষণা করা হয়। আওয়ামী লীগের এই সহযোগী সংগঠনের মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২০ সালের ১৯ মার্চ।


তাঁতী লীগের জাতীয় সম্মেলন কবে নাগাদ করা হতে পারে? জানতে চাইলে দলটির সাধারণ সম্পাদক খগেন্দ্র চন্দ্র দেবনাথ বিবার্তাকে বলেন, করোনার মধ্যে আমাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম কিছুটা ব্যাহত হয়েছে। করোনা পরিস্থিতির উন্নতির পর আমরা আবারো সাংগঠনিক কার্যক্রম কাজ শুরু করেছি। আমরা আমাদের কাজ করছি। সম্মেলনের বিষয়ে দল (আওয়ামী লীগ) থেকে এখনো কোনো নির্দেশনা পাইনি। দল যখন বলবে তখনই সম্মেলন আয়োজন করা হবে। আমরা সম্মেলনের জন্য প্রস্তুত আছি।