‘টপ লেভেল ম্যানেজমেন্টের উদাসীনতাই হ্যাকিংয়ের কারণ’

সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রথম কাজ হবে ব্যক্তি পর্যায়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজেকে সুরক্ষিত করা। এটা একটা চলমান প্রক্রিয়া। সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা না নিয়ে আইটি ডিভাইস ব্যবহার করতে গেলে নানাভাবে সাইবার আক্রমণের ঝুঁকিতে পড়তে হচ্ছে। অন্যদিকে কোম্পানির টপ লেভেলের ম্যানেজমেন্টকেও এসব বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা নিতে হবে। আইটি বিভাগকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। নতুন টেনোলজির সুরক্ষার সরঞ্জামাদি ক্রয়ের প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ রাখতে হবে। তাহলেই ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত হতে পারে। সুরক্ষিত হতে পারে কোম্পানির সার্ভারগুলো।


বিবার্তা২৪ডটনেটের সাথে একান্ত আলাপে কথাগুলো বলেছেন সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, নেটওয়ার্ক অ্যান্ড সার্ভার স্পেশালিস্ট, প্রশিক্ষক এবং গবেষক শরীফ আহসান।


বর্তমানে তিনি নিউ হরাইজনস সিএলসি অব বাংলাদেশে কান্ট্রি প্রোগ্রাম ম্যানেজার ও প্রিন্সিপাল টেকনিকেল ট্রেইনার এবং অ্যাডিডিআইই সফট লিমিটেডে হেড অব নেটওয়ার্ক অ্যান্ড সিকিউরিটি কনসালটেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।


এর আগে দায়িত্ব পালন করেছেন আইসিসি কমিউনিকেশন লিমিটেডের হেড অব ডিপার্টমেন্ট অ্যান্ড বিজনেস অ্যানালিস্ট (ট্রেনিং), নেটওয়ার্ক অ্যান্ড সল্যুশনস সুপারেন্টেন ইঞ্জিনিয়ার পেসুইফে হেড অব ডিপার্টমেন্ট এবং ক্রিয়েটিভ আইটি ইনস্টিটিউটে হেড অব ডিপার্টমেন্ট হিসেবে। ডিজিটাল বাংলাদেশে সাইবার নিরাপত্তার ‍সুরক্ষায় তিনি দীর্ঘ ২২ বছর ধরে কাজ করছেন।



সম্প্রতি রাজধানীর বাংলামোটরস্থ বিবার্তার কার্যালয়ে সাইবার নিরাপত্তার নিয়ে বিবার্তার সাথে কথা বলেন শরীফ আহসান। আলোচনায় দেশের সাইবার নিরাপত্তার অবস্থা, ব্যাংকিংসহ সব সেক্টরে কেন সাইবার আক্রমণ হচ্ছে, এর প্রতিরক্ষার উপায়সহ সমসাময়িক নানান বিষয়ে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন উজ্জ্বল এ গমেজ।
বিবার্তা: বর্তমানে দেশের সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সব সার্ভার, নেটওয়ার্ক ও পিসিগুলো কতটুকু সাইবার আক্রমণের ঝুঁকিমুক্ত বলে মনে করেন?


শরীফ আহসান: দেখুন, যেকোনো প্রতিষ্ঠানের সার্ভার, নেটওয়ার্ক ও পিসিগুলো কতটুকু সাইবার আক্রমণের ঝুঁকিমুক্ত বা সুরক্ষিত সেটা নির্ভর করছে ওই প্রতিষ্ঠানে চতুর্থ প্রজন্মের যে টেকনোলজি এসেছে, তার কতটুকু সঠিক ও সদ্ব্যবহার হচ্ছে তার উপর। দেশের ৯৯% ব্যবহারকারী কম্পিউটার উইন্ডোজের জন্য ক্র্যাক অপারেটিং সিস্টেম ব্যবহার করে। এই সিস্টেম ব্যবহারের মানে আমার স্বাধীনতা অন্যের হাতে তুলে দেয়া। অন্যদিকে, ভেন্ডর কিন্তু অপারেটিং সিস্টেম লাইসেন্সড ভার্সন করে রেখেছে। আমি যদি মাক্রোসফটের অফিসিয়াল উইন্ডোজ ১০ কিনতে চাই, তার দাম পড়বে কমপক্ষে ১৩ হাজার টাকা। এখন কর্তৃপক্ষ ও আইটি হেড যদি মনে করেন ১৩ হাজার টাকা দিয়ে একটা উইন্ডোজ কিনবো। এ টাকা দিয়ে তো একজন কর্মীর কম্পিউটার কেনা যায়। এই জায়গা থেকে যদি আমরা সার্বিক পরিস্থিতির মূল্যায়ন করি, তাহলে বলবো খুব কম কোম্পানিই আছে যারা সাইবার আক্রমণের ঝুঁকিমুক্ত বা সুরক্ষিত।


বিবার্তা: কেন এমনটা হচ্ছে?


শরীফ আহসান: একটা প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলো ডিপার্টমেন্ট থাকে। সবাই নেটওয়ার্কের সাথে কানেক্টেড। নেটওয়ার্ককে সার্ভিস দেয়ার জন্য ওয়েটারের মতো কাজ করে সার্ভার। যেমন, আমরা একটা রেস্টুরেন্টে গেলে খাবার অর্ডারের আগে ওয়েটারকে বলি যে, এখানে কী ধরনের খাবার পাওয়া যায়। মেনু লিস্টটা দিন। একইভাবে সার্ভারের মধ্যেও বিভিন্ন ধরনের সার্ভিস রয়েছে। সার্ভারটা কোনভাবে ফায়ারওয়ালের (কম্পিউটার নেটওয়ার্কিং) সাথে কানেক্টড কিনা। এই সার্ভারে প্রতিষ্ঠানের সব ডাটা আছে।



এখন আমি যদি আপনাদের প্রতিষ্ঠানে প্রথম গেট দিয়ে ঢুকতে পারি, তাহলে ৮৫% তথ্য নিয়ে নিতে পারি। তাই নেটওয়ার্ককে ব্লক করার জন্য ওয়ার্ল্ডওয়াইড ভেন্ডরের একটাই টেকনোলজি। সেটি হলো ফোর্থ জেনারেশন ফায়ারওয়াল টেকনোলজি। এখন দেখতে হবে ওই প্রতিষ্ঠানে ফায়ারওয়াল ডিভাইসগুলো আছে কি না। যদি থেকে থাকে তাহলে ফায়ারওয়ালের যেসব আপডেট ভার্সনগুলো আসছে সেগুলো ওই নেটওয়ার্কে ইমপ্লিমেন্ট করা হয়েছে কিনা। অথবা ঠিকমতো কনফিগার করা আছে কিনা।



একটা প্রতিষ্ঠানে যদি একটা ফায়ারওয়াল থাকে, আর কোন কারণে যদি সেটি ব্রেক হয়, তাহলে সাথে সাথে সেকেন্ডারি ফায়ারওয়ালের ব্যবস্থা করতে হবে। যাতে দ্বিতীয় ফায়ারওয়াল লক হয়। যেমন, আমরা ছুটিতে বেড়াতে যাওয়ার আগে বাসায় রুমের দরজায় তালা দেই। এরপর বাইরে গেটেও আরেকটা তালা দেই, যাতে একটা ভাঙলে দ্বিতীয়টা ভাঙার সময় শব্দটা পাশের ফ্লাটের মানুষ শুনতে পারে। আমি যে প্রতিষ্ঠানে আছি সেখানেও এই সর্বোচ্চ সিকিউরিটির ডাবল ফায়ারওয়াল ইমপ্লিমেন্ট করতে পারিনি। সমস্যা একটাই, সেটি হলো বাজেট। বাজেট কিন্তু ঠিকই অন্যখাতে যাচ্ছে। এখানে যখন বাজেটের বিষয় আসছে, তখন কর্তৃপক্ষ বলছেন, চলছে তো, কোন সমস্যা তো হচ্ছে না। অন্যদিকে যখন বড় সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে, তখন আর কোন কিছু করার থাকছে না। সার্ভার হ্যাকড হচ্ছে। হ্যাকাররা নিয়ে যাচ্ছে গোপন তথ্য এবং হাজার হাজার কোটি টাকা। আমি বলবো, এটা হচ্ছে শুধু কোম্পানির টপ লেভেল ম্যানেজমেন্টের উদাসীনতা এবং আইটি সম্পর্কে জ্ঞানের অভাবে।



বিবার্তা: এর জন্য দায়ী কারা?


শরীফ আহসান: আমি বলতে চাই এর জন্য দায়ী প্রত্যেকটা প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ, যেমন চেয়াম্যান, এমডি, সিইও। প্রথম বিষয়টা হচ্ছে, বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সাইবার সিকিউরিটি বিষয়ে ভালো জানেন না। না জানার ফল যে কত ভয়াভহ হতে পারে! আবার যারা জানেন, জেনেও বাজেট পাস করেন না। এর জন্য প্রতিষ্ঠানে যেসব আইটি বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দেয়া হয়, তারাও স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন না। একটা প্রতিষ্ঠানের সার্ভার সিকিউর করতে যেসব প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার, টুলস, ডিভাইস, একসেসরিজ কেনা আবশ্যক, সেসব কিনতে মোটা অংকের টাকার প্রয়োজন হয়। সেগুলো কেনার বাজেট দিলে পাস হয় না। ওই যে মালিক পক্ষের ধারণা, আমার প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্ক তো চলছে। একটা ফায়ারওয়াল তো আছে। আরেকটা ফায়ারওয়াল কেনো বসাতে হবে, কোন সমস্যা তো হচ্ছে না। চলুক না। তারা বুঝতে পারেন না যে, প্রতিষ্ঠানকে সিকিউর করতে এই বাজেটটা পাস না করলে হ্যাকিংয়ের শিকার হলে এর থেকে শতগুণ বেশি ক্ষতি হবে।



বিবার্তা: দেশে প্রতিদিন কী পরিমাণে সাইবার আক্রমণ হয়ে থাকে?


শরীফ আহসান: দেখুন, এ বিষয়টি তো আর সেভাবে সুনির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। তবে আমরা গুগলে যে লাইভ অ্যাটাক দেখতে পাই সে অনুসারে বলা যায়, দেশে প্রতিদিন গড়ে ১৫% প্রতিষ্ঠান সাইবার আক্রমণের শিকার হচ্ছে। এর মধ্যে বেশির ভাগ আক্রমণ করা হয়ে থাকে আর্থিক লেন-দেন প্রতিষ্ঠানে। ১৫% কে যদি ১০০ হিসেবে ধরি, তাহলে ৩৬% আক্রমণের টার্গেট থাকে ব্যাংক। হ্যাকাররা ব্যাংকে বেশি টার্গেট করে, কারণ সেখানে বেশি টাকা নেয়ার সুযোগ থাকে। এরপরে আক্রমণের তালিকায় থাকে বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠান।


বিবার্তা: এসব সমস্যার সমাধানের কোনো উপায় আছে কী?


শরীফ আহসান: অবশ্যই আছে। বর্তমানে দেশের সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকগুলো অনলাইনে লেনদেন করছে। আশার কথা হলো, ব্যাংকগুলো তাদের সার্ভারের সাইবার সিকিউরিটির জন্য বিভিন্ন সময়োপযোগী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। প্রয়োজনীয় ডেভেলপ করছে। ফায়ারওয়ালে নতুন যেসব টেকনোলজিগুলো আসছে, যেমন, ফায়ার পাওয়ার, ফরটিনেট, চেকপয়েন্ট, পালালত, সেকেন্ডারি, প্রাইমারি সার্ভার এগুলো ব্যবহার করছে। তবে সব ব্যাংকে না। ব্যাংকগুলোতে এসব আপডেটেড টেকনোলজি ব্যবহারে অভ্যস্ত করাটা সময়ের ব্যাপার। এছাড়াও ব্যাংকগুলোর তিনটা জায়গায় আপডেট করতে হবে- ব্যাংকের অ্যাপস, সার্ভার ও ফায়ারওয়াল টেকনোলজি। এই তিনটা জায়গায় বিশেষ গুরুত্বের সাথে কাজ করতে হবে। টেকনোলজি প্রতিনিয়তই পরিবর্তন হচ্ছে। সে পরিবর্তনের সাথে সাথে সবকিছুই আপডেটেড ও মনিটরিংয়ে রাখতে হবে।



শুধু ব্যাংকের সার্ভার সিকিউর করলেই হবে না। ব্যাংকের সাধারণ গ্রাহকেরও কিছু ভূমিকা রয়েছে। যেমন এটিএম বুথ থেকে গ্রাহক যখন টাকা তোলেন, তখন স্লিপটা ছিড়ে ফেলেন। পাশে কিন্তু কাটিং মেশিন থাকে। মেশিনে কেটে কাগজটা ঝুঁড়িতে ফেলে দিলে গ্রাহকের তথ্য কেউ নিতে পারে না। ছেড়া কাগজে গ্রাহকের ৮০% তথ্য থেকে যায়। আবার কিছু গ্রাহক আছেন পিন নম্বর দেয়ার সময় সচেতন থাকেন না। এমন ভাবে পিন ডায়াল করেন আশপাশের মানুষেরা নম্বর দেখে নিতে পারেন। এটিএম বুথের আশপাশে ওৎপেতে থাকা হ্যাকার বা প্রতারক চক্র কৌশলে এসব গ্রাহকের তথ্য নিয়ে বিভিন্ন সময় তাদের অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে। তখন দোষ দেয়া হয় ব্যাংকের। ব্যাংক তো এটিএম বুথে সিকিউরিটির সর্বোচ্চ ব্যবস্থা রেখেছে। গ্রাহকের অসচেতনতার কারণে কোন অঘটন ঘটলে সে দায় তো ব্যাংকের উপরে চাপিয়ে দেয়া যাবে না। তাই গ্রাহকেও সচেতন হতে হবে।


বিবার্তা: হ্যাকারদের আক্রমণ থেকে প্রতিষ্ঠানকে সুরক্ষিত রাখার উপায় কী?


শরীফ আহসান: হ্যাকারদের আক্রমণ থেকে প্রতিষ্ঠানকে সুরক্ষিত রাখতে একটা সুদক্ষ আইটি টিম তৈরি করতে হবে। টিমটা তৈরিতে কৌশলী হতে হবে। যেমন প্রতিষ্ঠানের নতুন এমপ্লয়িদের সময়োপযোগী প্রশিক্ষণ দিয়ে টিম তৈরি করতে হবে। নতুনরা যেকোনো বিষয় দ্রুত শিখতে পারে। সেক্ষেত্রে পুরাতনদের শিখতে একটু সময় লাগে। তাই কোম্পানির সাইবার সিকিউরিটি ডেভেলপমেন্টে নতুনদের অগ্রাধিকার দেয়াটা জরুরি। এ বিষয়ে কোম্পানির এইচআর বিভাগ দায়িত্ব নিলে ভালো ফল আসতে পারে। কেননা কোম্পানির সব সেক্টরের উন্নয়নের দায়িত্ব এই বিভাগের হাতে থাকে।



দুঃখের বিষয় কোম্পানির অন্যান্য বিভাগের এমপ্লয়িদের দক্ষতা উন্নয়নের পরিকল্পনা ও বাজেট থাকলেও সাইবার সিকিউরিটির টিমের ডেভেলপমেন্টর জন্য কম থাকে। এমনকি আইটি বিভাগের জন্য সময়োপযোগী পরিকল্পনা থাকে না। যদিও কখনো ট্রেনিং রাখা হয় সেটা পাঁচ বা সাত দিনের। এটা তো দীর্ঘমেয়াদী ও চলমান শেখার বিষয়। দুই মাস বা তিন মাসের করলে ট্রেনিংটা ভালো হয়। আবার যাদের একটা বিষয়ে ট্রেনিং করিয়ে দক্ষ করে আনা হয়, তাদের কোম্পানিতে বসিয়ে দেয়া হয় অন্যকোন বিভাগে। তাহলে ওই কর্মী যে বিষয়ে ট্রেনিং করে আসলেন, নিয়মিত চর্চা না করার ফলে তিনি ওই বিষয় ভুলে যান। কোম্পানিগুলোতে মিস ম্যানেজমেন্টের কারণে দক্ষ কর্মীদের দক্ষতার যথাযত ব্যবহার হয় না। এছাড়াও এখানে টপ ম্যানেজমেন্টের কিছু সিদ্ধান্তের বিষয় রয়েছে। কোম্পানিকে সিকিউর করার জন্য ওই বিভাগে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে যা যা প্রয়োজন সেগুলো দিতে হবে। তাহলে বিভাগে দায়িত্ব থাকা ব্যক্তি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন। আর যখন পরিকল্পনা অনুসারে সব কাজ সম্পন্ন হবে, তখন কোম্পানি সুরক্ষিত হবে। ইতোমধ্যে বেশি কিছু কোম্পানি তাদের এমপ্লয়িদের স্কিল ডেভেলপমেন্ট এবং নতুন টেকনোলজি ব্যবহারের মাধ্যমে কোম্পানিকে সুরক্ষিত করেছে।



বিবার্তা: সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কোন দিকে বিশেষ নজর দেয়া জরুরি বলে মনে করেন?


শরীফ আহসান: সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রথম কাজ হবে নিজেকে ডেভেলপ ও আপডেটেড করা। নিজের উদ্যোগে ট্রেনিং নিতে হবে। যেসব ইনস্টিটিউট সাইবার সিকিউরিটি বিষয়ে ট্রেনিং দিচ্ছে, তাদের কাছ থেকে ট্রেনিং নিতে হবে। নিত্যদিনের ব্যবহার্য ডিভাইস, আইটি পণ্য, একসেসরিজ কী করলে নিরাপদ ও সুরক্ষিত রাখা যায় সে বিষয়ে ইন্টারনেট থেকে জেনে নিতে হবে। সাইবার অপরাধের বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা থাকতে হবে। যেকোনো উপায়ে নিজেকে ডেভেলপ করতে হবে। জানার কোন বিকল্প নেই।



এছাড়াও আইটিতে একটা নিয়ম আছে প্রতি এক মাস পরপর কোম্পানির নেটওয়ার্ক টেস্ট করা। এটাকে বলা হয় আইটি অডিট। এটা একটা টেস্টিং প্রটোকল। এর মাধ্যমে ইনফ্রাস্ট্রাকচার নেটওয়ার্ক টেস্ট করা হয়। যেসব প্রতিষ্ঠানে এ পরীক্ষা করানোর মতো আইটি এক্সপার্ট নেই, তাদের অন্য কোম্পানি থেকে হায়ার করে এনে টেস্ট করাতে হয়।



দুঃখজনক হলেও সত্য, এসব বিষয়ে কোম্পানির টপ ম্যানেজমেন্ট লেভেলে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয় না। এখানে ওই কোম্পানির এইচআরও বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারে। এইচআরও অবহেলা করে থাকে। এই জায়গায় পলিসিগত ভাবে কাজ করতে হবে। সেসাথে কোম্পানির পুরাতন টেকনোলজি সিস্টেম থেকে বেরিয়ে এসে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে আপডেটেড টেকনোলজিকে গ্রহণ করতে হবে। নিয়মিত কোম্পানির নেটওয়ার্ক, সার্ভার ও সফটওয়্যার টেস্টিংয়ের কাজটা করতে হবে। নিয়মিত নেটওয়ার্ক, সার্ভারকে মনিটরিংয়ে রাখতে হবে। মনিটরিংটা যদি ঠিক মতো করা না হয়, তাহলে যেকোন সময় অ্যাটাক হবে।



বিবার্তা: বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে যা শিক্ষা দেয়া হচ্ছে এ বিষয়ে আপনার মতামত কী?


শরীফ আহসান: দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে যেসব শিক্ষা দেয়া হচ্ছে এটাকে আরো গুরুত্ব দিয়ে সিলেবাসকে তৈরি করতে হবে। কারিকুলামে সাইবার নিরাপত্তা বিষয়কে আব্শ্যিক করতে হবে। প্রত্যেকটা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা করে সাইবার সিকিউরিটি বুথ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ১৫ থেকে ২০টি ল্যাপটপ রেখে একজন দক্ষ প্রশিক্ষক দিয়ে স্টুডেন্টদেরকে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। আর সাইবার সিকিউরিটি বিষয়ে হাইস্কুল থেকে পড়ানো চালু করতে হবে। কেননা টিনএজ-রা মোবাইল, ল্যাপটপসহ বিভিন্ন গ্যাজেটস ব্যবহার করে অনলাইনে কাজ করতে গিয়ে নানান সমস্যায় পড়ে থাকে। এ বিষয়ে জ্ঞান থাকলে নিজের সমস্যাগুলো নিজে থেকেই সমাধান করতে পারবে। স্কুল থেকেই সাইবার নিরাপত্তার বিষয়ে জ্ঞান থাকলে একজন স্টুডেন্ট কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় নিজেকে এবিষয়ে অরো বেশি দক্ষ করে তুলতে সক্ষম হবে।



বিবার্তা: আমাদের হ্যাকাররা কি বিশ্বমানের?


শরীফ আহসান: ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে বাংলাদেশিদের হত্যা বন্ধে ভারতের ২০ হাজার ওয়েবসাইটের উপর হামলা চালায় ‘বাংলাদেশ ব্ল্যাক হ্যাট হ্যাকার্স’ নামক একটি দল৷ ওই হ্যাকার দলের যুক্তি ছিল, ভারত আমাদের চারশো ওয়েবসাইট হ্যাক করেছে, আমরা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ২০ হাজার ভারতীয় ওয়েবসাইট হ্যাক করেছি৷ এরপর ২০১৪ সালে জানুয়ারিতে টেস্ট ক্রিকেটকে বিভক্ত করার ষড়যন্ত্র করায় যুক্তরাজ্যের আড়াই শতাধিক ওয়েবসাইট হ্যাক করেছে ‘ইউনাইটেড বাংলাদেশি হ্যাকারস’ গ্রুপ। দেখুন, আমাদের হ্যাকাররা যদি বিশ্বমানের না হতো তাহলে এসব অভিযানগুলো কী করতে পারতো? আমাদের দেশে অনেক দক্ষ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন হ্যাকার আছেন।


বিবার্তা: কেমন বাংলাদেশ দেখতে চান?


শরীফ আহসান: একজন বাঙালি হিসেবে, একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমি চাই দেশ পরিপূর্ণভাবে ডিজিটালাইজড হোক। ইতোমধ্যেই দেশের প্রায় সব অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে প্রযুক্তির সাহায্যে কাজ করা শুরু হয়েছে।



আর একজন সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ হিসেবে বাংলাদেশকে একটা সুরক্ষিত ও সাইবার নিরাপদ দেশ হিসেবে দেখতে চাই। যেখানে দেশের প্রতিটি নাগরিক নিরাপদে তাদের অনলাইনের পড়াশোনা, অফিস-আদালতের কাজ, সোশ্যাল মিডিয়া চালানো, ভার্চুয়াল জগতে সব কিছু যেনো নিরাপদে করতে পারেন। সব কিছু যেনো স্বাধীনভাবে করতে পারেন। একজন নাগরিক যেমন স্বাধীনভাবে দেশের সব জায়গাতে ইচ্ছেমতো চলাফেরা করতে পারেন, ঠিক তেমনিভাবে ভার্চুয়াল জগতেও যেনো একইভাবে নিশ্চিন্তে সব সেক্টরে চলাফেরা করতে পারেন। দেশের সাইবার জগৎ হোক, নিরাপদ ও সুরক্ষিত। দেশ হোক বিশ্বের অন্যতম টেকনোলজি সফল দেশ। সে অনুসারে সব কিছু বাস্তবায়িত হবে। এমনটা প্রত্যাশা আমার।



একটা ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়া সরকারের একার চেষ্টা থাকলেই সহজে গড়ে ‍উঠবে না। এর জন্য প্রয়োজন সকলে সম্মিল্লিত উদ্যোগ ও আন্তরিক চেষ্টা। আমি আমার জায়গা থেকে সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছি। আশপাশের মানুষগুলোকে যখন যেভাবে, যতটুকু সম্ভব তাদের সচেতন করার চেষ্টা করছি। দেশের প্রত্যেক সচেতন নাগরিক যদি তার আশপাশের মানুষদেরকে এই ভাবে সচেতন করতে শুরু করেন, আমার বিশ্বাস দেশ একটা চমৎকার সুরক্ষিত ডিজিটাল বাংলাদেশে পরিণত হবে। তখন আমরা পৃথিবীর মানচিত্রে লিখতে পারবো- বাংলাদেশ সাইবার সুরক্ষিত দেশ।


সুত্রঃ bbarta24.net