ঋনের বোঝা কাঁধে নিয়ে রসুন চাষে চলনবিলের কৃষকরা

বর্ষার পানি নেমে যাচ্ছে। কাঁদাজলে চলছে আমন ধান কাটা। ক্ষেতের ধান কাটা শেষে জমি পরিস্কার করে ঋণের বোঝা কাঁধে নিয়েই কাদা মাটিতে সাদা সোনা খ্যাত মসলা জাতীয় ফসল রসুন লাগাতে শুরু করেছে চলনবিলের কৃষকরা।


কৃষক পরিবারের সদস্যরাও এই রসুন লাগানোর কাজে সক্রিয়। কারণ ক্ষেতের মাটি শুকিয়ে গেলে চাষের উপযোগিতা হারাবে। এছাড়া রোপণকৃত রসুন এক সপ্তাহের মধ্যেই চারা বের হয়। এজন্য বাড়ছে কৃষক পরিবারগুলোতে ব্যস্ততা।


এদিকে কৃষকেরা বলছেন, চলতি বছরে কৃষি উপকরণের দাম বিগত বছরগুলোর তুলনায় বেড়েছে কয়েকগুণ। ফলে চলতি মৌসুমে রসুন চাষে প্রতি বিঘায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা ব্যায় হচ্ছে।


গুরুদাসপুরসহ চলনবিলের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, রসুন চাষকে ঘিরে কর্মমুখর হয়ে উঠেছে কৃষক পরিবারগুলো। কৃষাণী, কিংবা তাদের নিয়োগ করা মহিলারা রসুন থেকে কোয়া ছাড়ানোর কাজে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। বাদ যাচ্ছে না বাড়ির কিশোর-কিশোরীরাও। অধিকাংশ পরিবার গ্রামের মহিলাদের রসুন ভাঙার কাজে নিয়োগ করেছেন। প্রতিমণ রসুন ভাঙ্গার মুজুরি দেয়া হচ্ছে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা। একমণ রসুন ভাঙ্গতে সময় লাগে দুই দিন। পাশাপাশি চলছে জমি প্রস্তুতসহ রসুন রোপণের কর্মযজ্ঞ।
কৃষকদের সাথে কথা বলে জানাগেছে, কৃষি উপকরণ বীজ, সার-কীট নাশক, সেচ, নিড়ানী, শ্রমিকের মূল্য বৃদ্ধির কারণে গত বছরের তুলনায় এবছর রসুন চাষে প্রতি বিঘায় ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা বেশি খরচ হচ্ছে। তবে রসুনের যথাযথ মূল্য না পেলেও সাথী ফসল তরমুজ ও বাঙ্গী চাষ করে কিছুটা লাভ হওয়ায় এখনো এই আবাদ ধরে রেখেছেন তারা।


গুরুদাসপুর উপজেলার ধারাবারিষা গ্রামের কৃষক আবুল হোসেন (৫০) জানান, এবছর ৫ বিঘা জমিতে রসুন চাষ করেছেন তিনি। বিঘা প্রতি বীজ, সার-কীটনাশক ও সেচ বাবদ খরচ হয়েছে ২৪ হাজার টাকা। রসুন রোপণ ও নিড়ানীসহ শ্রমিক খরচ হয়েছে ১২ হাজার টাকা। এতে তার বিঘা প্রতি ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। তবে তিনি রসুনের সাথী ফসল হিসেবে ৫ বিঘা জমিতেই বাঙ্গি আবাদ করেছেন। অনুকূল আবহাওয়া পেলে সেখান থেকে প্রতি বিঘায় উৎপাদন খরচ বাদে ২৫থেকে ৩০ হাজার টাকা লাভ করা যাবে।


একই এলাকার পাটপাড়া গ্রামের কৃষক সুকুমার সরকার জানান, তিনি চলতি বছর ৬ বিঘা জমি বর্গা নিয়ে রসুন আবাদ করেছেন। রসুন চষে খরচ বাড়ায় গত বছরের তুলনায় চলতি বছর প্রতি বিঘায় ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা বেশি খরচ হয়েছে। উপায়ান্ত না পেয়ে সমিতি (এনজিও) থেকে লক্ষাধিক টাকা সুদে নিয়ে রসুনের আবাদ করেছেন। অনুকূল আবহাওয়া না পেলে অথবা ফসলের ন্যায্য মুল্য না পেলে ঋণের বোঝা সুদের টাকা দিতে পথে বসতে হবে তাকে।


চলনবিলের রসুন চাষি আফজাল হোসেন ও জামাল উদ্দিনসহ বেশ কয়েকজন জানান, প্রায় ২২ বছর ধরে চলনবিল অঞ্চলে রসুন আবাদ শুরু হলেও আশানুরুপ দাম না পাওয়ায় এবছর হাতের অবস্থা ভালো না। একারণে ঋণ কর্জ করে জমি লিজ নিয়ে রসুন রোপণ করছেন তারা। এবছরও দাম না পেলে পথে বসতে হবে তাদের।


গুরুদাসপুর উপজেলা কৃষি অধিদপ্তর সূত্রে জানাগেছে, ২০০০সালে গুরুদাসপুর উপজেলার সিধুলি গ্রামের কৃষক বিমল পরীক্ষামূলকভাবে এই প্রথায় রসুন চাষ শুরু করেন। এতে ফলন ও দাম ভালো পান। পরের বছর তিনি বাণিজ্যিকভাবে ৮বিঘা জমিতে বিনা হালে রসুনের আবাদ করে অধিক লাভবান হন। তার পথ ধরেই বিনা হালে রসুনচাষ পদ্ধতি ছড়িয়ে পড়ে চলনবিলের গুরুদাসপুর, সিংড়া, বড়াইগ্রাম, তাড়াশ, চাটমোহরসহ আরো অনেক উপজেলায়। বর্তমানে এই পদ্ধতিতে রসুন চাষ বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।


চাষ পদ্ধতি


আমন কাটার এক দুই দিনের মধ্যে ধানের খড় (লারা) তুলে জমি প্রস্তুত করতে হয়। এরপর প্রয়োজনীয় সার-কীটনাশক দিয়ে কাঁদার ওপরে রসুনের একটি করে কোয়া রোপন করতে হয়। রোপণকৃত রসুনের ক্ষেত ধানের খড় বা কচুরী পানা দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়। ঢেকে দেয়ার এক সপ্তাহের মধ্যই রসুনের চারা গজায়। তবে রসুনে সাথী ফসল হিসাবে বাঙ্গি চাষের জন্য রসুনের জমিতেই দুই হাত অন্তর অন্তর আলাদা জায়গা রাখা হচ্ছে। রসুন উঠে যাওয়ার পর বাঙ্গির চারা ছড়িয়ে পড়ে।


গুরুদাসপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হারুনর রশীদ জানান, প্রতিবিঘা জমিতে ২৫-৩০ মন হারে রসুন উৎপাদন হয়। খরচ বাদ দিয়েও অনেক লাভবান হন কৃষকরা। কারণ একই জমিতে তরমুজ ও বাঙ্গি আবাদ করা হয়। এজন্য বিনা হালে রসুনের আবাদ করে চলনবিলের কৃষকরা।


নাটোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আব্দুল ওয়াদুদ বলেন, চলনবিলে এবছর ২২ হাজার ৩শ হেক্টর জমিতে রসুন রোপণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। গত বছরের তুলনায় চলতি বছর চলনবিলে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম রসুন চাষ করা হচ্ছে। তাছাড়া বাংলাদেশের মধ্যে সর্ববৃহৎ রসুন চাষ হয় চলনবিলের গুরুদাসপুর, বড়াইগ্রাম, তাড়াশ, চাটমোহর ও সিংড়া বিলের কিছু অংশে। প্রয়োজনীয় কৃষি পরামর্শ এবং সার পৌঁছে দেয়া হচ্ছে কৃষকদের মাঝে। এছাড়া ক্ষুদ্র বর্গা চাষিরা প্রতি বিঘা জমি ১০ থেকে ১২ হাজার টাকায় বর্গা (লিজ) নিয়ে অধিক খরচে রসুন আবাদ করছেন।