শহীদ জননী জাহানারা ইমামের ৯১তম জন্মদিন আজ

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে ছেলে হারানোর শোক অথবা মরণ ব্যাধি ক্যানসার শহীদ জননী জাহানারা ইমামের দেশপ্রেমের কাছে হার মেনেছে। নিজের মেধাবী সন্তান শহীদ রুমিকে যুদ্ধে পাঠিয়েছিলে তিনি। এমন কি নিজেও যুদ্ধ করেছেন কলম হাতে। ১৯৮৬ সালে তিনি রচনা করেন একাত্তরের স্মৃতি-বিস্মৃতি বিজড়িত গ্রন্থ ‘একাত্তরের দিনগুলি’।

সেই শহীদ জননী ও বিশিষ্ট সাহিত্যিক জাহানারা ইমামের ৯১তম জন্মদিন আজ। ১৯২৯ সালের ৩ মে অবিভক্ত বাংলার পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার সুন্দরপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছেন জাহানারা ইমাম। গত শতকের নব্বইয়ের দশকে মুক্তিযোদ্ধার গর্বিত মা ও এই মহীয়সী নারীর নেতৃত্বেই গড়ে ওঠে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আন্দোলন।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে একইসঙ্গে স্বামী ও সন্তানকে হারিয়েছিলেন তিনি। এই শহীদ জননী জাহানারার পরিবার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেছিল মুক্তিযুদ্ধে। তখন তার ১৯ বছর বয়সী বড় সন্তান শাফী ইমাম রুমি যুক্তরাষ্ট্রে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সুযোগ ত্যাগ করে মৃত্যুভয়কে উপেক্ষা করে দেশের ডাকে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে।

১৯৪৫ সালে কলকাতার লেডি ব্রাবোর্ন কলেজ থেকে বিএ পাস করেন তিনি। পরবর্তীতে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাইভেট পরীক্ষার্থী হিসেবে বাংলায় এমএ পাস করেন। এ সময় শিক্ষকতার মাধ্যমে শুরু হয় তার কর্মজীবন। ১৯৫২ থেকে ১৯৬০ পর্যন্ত তিনি সিদ্ধেশ্বরী গার্লস স্কুলের প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্ব পালন করেন। এর পর তিনি ফুল ব্রাইট স্কলার হিসেবে আমেরিকা থেকে উচ্চশিক্ষা নিয়ে ১৯৬৬ সালে ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তীতে ১৯৬৮ সালে তা ছেড়ে দিয়ে দেশের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে নিজেকে জড়িত করেন।

এদিকে ১৯৭১ সালে শুরু হয় মহান মুক্তিযুদ্ধ। যেখানে তিনি তার ছেলে রুমী ও স্বামীকে হারান। যে কারণে মুক্তিযুদ্ধের সেই নয় মাস তার ভীষণ উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও ত্রাসের মধ্য দিয়ে কাটে। এ সময় তার মনের মধ্যে ছিল তীব্র দেশপ্রেম ও স্বাধীনতার স্বপ্ন। তিনি এই দুঃসময়ে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নানাভাবে সাহায্য করেছেন মুক্তিযোদ্ধাদের।

স্বাধীনতার পর জাহানারা ইমাম নিজের লেখালেখি ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে ভীষণ ব্যস্ত সময় পার করেন। মুক্তিযুদ্ধে বীর সন্তান রুমীর আত্মত্যাগ ও নিজের অবদানের কারণে দেশব্যাপী সকলের কাছে আখ্যায়িত হন শহীদ জননী হিসেবে। পরবর্তীতে ১৯৯৪ সালের ২৬ জুন দুরারোগ্য ব্যাধি ক্যান্সারের কাছে পরাজয় বরণ করতে হয় তাকে। তখন যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান স্টেটের ডেট্রয়েট শহরের একটি হাসপাতালে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন বাংলার এই মহীয়সী নারী।

দেশের স্বনামধন্য একজন সু-সাহিত্যিক হিসেবে ব্যাপক পরিচিত ছিলেন এই জাহানারা ইমাম। তার রচনা করা ‘একাত্তরের দিনগুলি‘ মুক্তিযুদ্ধের একটি অন্যতম দলিল। তার রচিত অন্য সব গ্রন্থগুলো হলো ‘জীবন মৃত্যু, অন্য জীবন, বীরশ্রেষ্ঠ, চিরায়ত সাহিত্য, নাটকের অবসান, বুকের ভিতরে আগুন, দুই মেরু, নিঃসঙ্গ পাইন, নয় এ মধুর খেলা, ক্যান্সারের সঙ্গে বসবাস এবং প্রবাসের দিনলিপি উল্লেখ যোগ্য।