শেষ শ্রদ্ধায় সিক্ত শাহীন রেজা নূর

শহীদ সাংবাদিক সিরাজউদ্দীন হোসেনের ছেলে সাংবাদিক শাহীন রেজা নূরের কফিনে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়েছেন সরকারের মন্ত্রী, রাজনৈতিক নেতা, লেখক, কবি-সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক অঙ্গনের প্রতিনিধিসহ সাধারণ মানুষ।

বুধবার সকাল সাড়ে ১০টায় শাহীন রেজা নূরের মরদেহ নিয়ে আসা হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে। সেখানে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত তার কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়।

কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শাহীন রেজা নূরের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, আমরা একজন নক্ষত্র হারালাম। একজন তরুণের এভাবে চলে আমাদের খুব ব্যথিত করে।

আওয়ামী লীগের পক্ষে শাহীন রেজার নূরের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আসেন দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের জন্য, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য তারা প্রচণ্ড রকমের আবেগ নিয়ে কাজ করতেন। স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তি যেন মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে, সেজন্য তিনি কলম ধরেছেন, কাজ করেছেন।

একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির বলেন, শাহীন মৃত্যুর কদিন আগে লিখেছিল, জামাতের রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে বাধা কোথায়? শাহীন যে প্রশ্ন রেখেছে, সেই প্রশ্নের জবাব আজকে সরকারকে দিতে হবে। এই প্রশ্ন আমাদেরও।

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুস বলেন, শাহীন রেজা নূর তার পিতা শহীদ সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনের আদর্শে উজ্জীবিত ছিলেন। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের যে স্বপ্নের বাংলাদেশ, ত্রিশ লক্ষ শহীদের স্বপ্নের বাংলাদেশ, একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গড়বার স্বপ্ন তিনিও দেখেছেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী অপশক্তিকে প্রতিরোধ, জামায়াত ইসলামকে নিষিদ্ধ করার দাবিসহ প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তিনি সাহসের সাথে লড়াই করেছেন। তিনি স্পষ্টভাষী ছিলেন।



শাহীন রেজা নূরের স্ত্রী খুরশিদ জাহান শাহীন বলেন, তিন বছর ধরে কানাডায় থাকলেও তার মন সবসময় দেশে পড়ে থাকত। প্রতি মুহূর্তে তিনি দেশে এসে দেশের জন্য কিছু করতে চাইতেন। কিন্তু এভাবে তাকে দেশ আসতে হবে আমি ভাবতে পারিনি। তিনি ছিলেন রত্নভাণ্ডার, সকল বিষয়ে তার পদচারণা ছিল।

শাহীনের মরদেহ দেহ দেশে এনে শ্রদ্ধা জানানোর ব্যবস্থা করার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জনান খুরশিদ জাহান।

তার বড় ছেলে সৌরভ রেজা বলেন, আব্বু দেশের মানুষকে অনেক ভালোবাসতেন, সবকিছুতেই তা প্রকাশ করতেন কোনো না কোনোভাবে। তার লেখনিতে তার পরিচয় পাওয়া যায়। বাবা হিসেবে তিনি কী রকম ছিলেন, সেটা বলতে গেলে বলা যায়, তিনি ছিলেন আমার চোখে শ্রেষ্ঠ বাবা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি একে আজাদ, গণসংগীত শিল্পী ফকির আলমগীর, রবীন্দ্র সংগীতশিল্পী ড. মকবুল হোসেন, কবি শাহানা আক্তার মহুয়া, ঊদীচীর সহ-সাধারণ সম্পাদক সংগীতা ইমাম, প্রজন্ম’৭১ এর পক্ষে আসিফ মুনির তন্ময়, গৌরব একাত্তরের সাধারণ সম্পাদক এফএম শাহীন, আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান (আমুস) কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি সাজ্জাদ হোসেন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শাহীন রেজা নূরের  প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আসেন।

এছাড়া জাসদ, বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট, কেন্দ্রীয় খেলাঘর, বাংলাদেশ আবৃতি শিল্পী সংসদ, র‌্যামন পাবলিশার্স, কণ্ঠশীলনসহ বিভিন্ন সামিাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয় প্রয়াত এই সাংবাদিকের কফিনে।

ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে গত ১৩ ফেব্রুয়ারি কানাডার ভ্যাংকুভারের একটি হাসপাতালে মারা যান শাহীন। বুধবার ভোরে তার মরদেহ দেশে এসে পৌঁছায়।

বিমানবন্দর থেকে প্রথমেই কফিন নিয়ে যাওয়া হয় মোহাম্মদপুরের আসাদ এভিনিউয়ে তার পৈতৃক বাড়িতে। সেখানে জানাজা শেষে মরদেহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নেওয়া হয়।

শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে দুপুর পৌনে ১টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে আরেক দফা জানাজা হয় তার। মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে বলে তার ছেলে সৌরভ রেজা জানান।

শাহীন রেজা নূরের বাবা সিরাজুদ্দীন হোসেন ছিলেন দৈনিক ইত্তেফাকের বার্তা ও কার্যনির্বাহী সম্পাদক। তার আট সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয় শাহীন রেজা নূরের জন্ম ১৯৫৫ সালে মাগুরা জেলার শালিখা থানার শরশুনা গ্রামে।

যুদ্ধাপরাধীর বিচার দাবির আন্দোলনে থেকে শহীদ সন্তানদের নিয়ে গড়ে ওঠা সংগঠন ‘প্রজন্ম একাত্তর’র সভাপতি ছিলেন শাহীন। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু হলে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মো. মুজাহিদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেওয়ার পর হামলার মুখেও পড়তে হয়েছিল তাকে।