মাথাব্যথার মাথায় ব্যথা! কীভাবে জেনে নিন

মাথা ব্যথায় তো প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো এক সময়ে ভোগেন অনেকেই। মাথাটা খুলে কাউকে দেখানোও যায় না কেমন করছে ব্যথা, এদিকে ব্যথার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে পাশের জনকেও অসহ্য লাগে কখনো কখনো। এখন, ভাবুন তো মাথা ব্যথারই যদি মাথায় ব্যথা হয়, তাহলে কেমন হবে? কতটা খুশি হবেন আপনি? এদিকে মাথা ব্যথা কিন্তু ভয়ে পালাবে। আগেই খুশি হওয়া যাবে না। মাথা ব্যথাকে এইটুকু যাতনায় ফেলতে আগে তো আপনাকে কিছু করতেই হবে! কিন্তু প্রশ্ন তো এই কী করতে হবে?


জুন মাইগ্রেন ও মাথাব্যথা সচেতনতা মাস। এ উপলক্ষে টাফনিলের সহযোগিতায় আয়োজিত হলো বিশেষ অনুষ্ঠান ‘মাথা নিয়ে মাথাব্যথা’। আয়োজনের প্রথম পর্বের বিষয় ‘মাথা নিয়ে যত ব্যথা’। সুষ্মিতা শ্রুতি চৌধুরীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে অতিথি ছিলেন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স অ্যান্ড হসপিটালের নিউরোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আবু নাঈম এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তারিক মনজুর।অনুষ্ঠানের শুরুতেই ডা. আবু নাঈম মাথাব্যথা কী ও তার ধরন নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘নানা কারণেই আমাদের মাথাব্যথা হয়ে থাকে। এটি দুরকমের, প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি। প্রাইমারি পর্যায়ে মাথার নিজস্ব রোগের কারণে মাথাব্যথা হয়ে থাকে। এখানে দুধরনের মাথাব্যথা বেশি দেখা যায়। টেনশনজনিত ও মাইগ্রেন। প্রায় ৫০ শতাংশ মানুষ টেনশনজনিত মাথাব্যথায় ভুগে থাকেন। ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ মানুষের মাইগ্রেনের ব্যথা হয়। শরীরের অন্যান্য অঙ্গের কোনো সমস্যা হলে সেকেন্ডারি পর্যায়ের মাথাব্যথা হয়। যেমন অনেকের চোখে ব্যথা হলে মাথাব্যথা হয়। আবার নাক, কান, গলা বা দাঁতের ইনফেকশনের জন্যও মাথাব্যথা হতে পারে।’


দৈনন্দিন জীবনে যে কয়েকটি ঘটনা স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত করে, সেগুলোর মধ্যে অন্যতম মাইগ্রেনজনিত মাথাব্যথা। মেয়েদের মধ্যে এ রোগ বেশি দেখা যায়। সাধারণত ২০ থেকে ৩০ বছর বয়সে এ রোগের শুরু হয়। যেকোনো পেশার মানুষেরই মাইগ্রেন হতে পারে। বাংলায় বলে আধকপালি। বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ১১ শতাংশ বয়স্ক মানুষ মাইগ্রেনজনিত মাথাব্যথায় ভোগে। ২৫ থেকে ৫৫ বছর বয়সে এর ব্যাপ্তি বেশি হয়।

তবে সব মাথাব্যথাই মাইগ্রেন নয়। দৃষ্টিস্বল্পতা, মস্তিষ্কের টিউমার, মাথায় রক্তক্ষরণ প্রভৃতি কারণেও মাথাব্যথা হতে পারে। মনে রাখতে হবে, মাইগ্রেন একধরনের প্রাইমারি হেডেক, যা নিয়মিত চিকিৎসার মাধ্যমে নিরাময় সম্ভব। চিকিৎসকের অধীনে এবং নিয়মিত চেকআপের মাধ্যমে এ রোগের চিকিৎসা করা উচিত। মাইগ্রেনের ব্যথা চোখের কোনো সমস্যার জন্য হয় না।


তবে সব মাথাব্যথাই মাইগ্রেন নয়। মাইগ্রেনের কারণে যে মাথাব্যথা তার লক্ষণগুলো হচ্ছে মাথা ব্যথার সাথে বমি ভাব। তবে অতিরিক্ত হাই তোলা, কোনো কাজে মনোযোগ নষ্ট হওয়া, বিরক্তি বোধ করা ইত্যাদি উপসর্গ মাথাব্যথা শুরুর আগেও হতে পারে। মাথার যে-কোনো অংশ থেকে এ ব্যথা শুরু হয়। পরে পুরো মাথায় ছড়িয়ে পড়ে। চোখের পেছনে ব্যথার অনুভূতি তৈরি হতে পারে।



মাথাব্যথার মাথায় ব্যথা কীভাবে সম্ভব?



অনেক সময় দুঃশ্চিন্তা থেকে মাথ্যাব্যাথা হয়। তবে আরো নানা কারণে মাথাব্যাথা হতে পারে। আসুন জেনে নেই কী কারণে মাথাব্যথা হয় এবং কীভাবে পরিত্রাণ:


★ সারা সপ্তাহে প্রতিদিন ১০ ঘন্টা করে কাজ করে সুস্থ বোধ করেন, কিন্তু ছুটির দিনে লম্বা একটা ঘুম দিয়ে উঠে দেখেন মাথাব্যথা করছে। এটার কারণ হলো হঠাৎ মানসিক চাপ কমে গেলে মাথায় এক ধরনের হরমোন কমে যাওয়া। আপনার এমন মাথাব্যথা দেখা দিলে ঘাবড়ে যাবেন না। এমন হলে ছুটির দিনে বেশি ঘুমানোর লোভ সংবরণ করুন। আট ঘন্টার বেশি ঘুমানোর কারণে এ মাথাব্যথা হতে পারে।★ ঘুম কম হলেও মাথা ব্যথা হতে পারে। ঘুম কম হলে মাথাব্যথা বারবার দেখা দিতে পারে। তাই পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমাতে হবে।


★ অনেকের ক্ষেত্রে চা-কফি, কোলা বা কোমল জাতীয় পানীয় খেলে এ ধরনের মাথাব্যথা হতে পারে। কারণ এগুলোতে আছে ক্যাফিন যা মাথাব্যথা সৃষ্টি করতে পারে। যদি এসব পানীয় পান করলে দেখেন যে আপনার মাথা ধরেছে, তাহলে এগুলো কম পরিমাণে পান করুন। অনেকে আবার এরকম পানীয়তে মাথা ব্যথা থেকে পরিত্রাণ পান।


★যতটুকু পানি খাচ্ছেন তার চেয়ে বেশি পরিমাণ পানি শরীর থেকে বের হয়ে গেলে মাথা ব্যথা হতে পারে। আমরা অনেকেই বুঝতে পারি না কখন শরীরের পানি স্বল্পতা দেখা দিচ্ছে। দিনে অন্তত দুই লিটার পানি পান করতে হবে। মাথাব্যথা শুরু হলেও যথেষ্ট পরিমাণে পানি পান করার চেষ্টা করবেন।


★ খাওয়া-দাওয়া অনিয়ম করলে বা এক বেলা খাবার না খেলে মাথাব্যথা করতে পারে। আমরা যা খাই, সে খাবার থেকে শরীর এক প্রকার খাদ্য তৈরি করে, যেটা ব্রেনের খাদ্য। কোন বেলার খাবার বাদ দেওয়া যাবে না। মাথাব্যথা হলেও সময়মতো খাবার খেয়ে নিতে হবে।


★ সারাদিন শুয়ে বসে থাকলেও মাথা ব্যথা করতে পারে। আপনার পরিশ্রম যদি কম হয় মাথাব্যথা দেখা দিতে পারে। সমাধান বুঝতেই পারছেন। নিয়মিত শরীরচর্চা করতে হবে।


★ অতিরিক্ত মানসিক চাপ, এটা খুবই মাথাব্যথার সাধারণ একটা কারণ। কোন কিছু নিয়ে মানসিক চাপে থাকলে মাথাব্যথা হতে পারে। তাই যা নিয়ে মানসিক চাপে আছেন তার সমাধান করে নিতে হবে।



মাথাব্যথায় ওষুধ খাবো কি?



ওষুধ খাওয়ার আগে একটা বিষয় জানতে হবে। আপনার মাথাব্যথাটা অন্যান্য কারণে অন্যকোন কারণে কি না? যেমন মাইগ্রেনের মাথাব্যথা। কিভাবে বুঝবেন? আমরা যে দুঃশ্চিন্তা ধরণের মাথাব্যথার কথা বলেছি এটাতে হালকা থেকে মাঝারি ধরনের ব্যথা হয়। খুব তীব্র ব্যথা হয় না। দিনের স্বভাবিক কাজ চালিয়ে যাওয়া যায়। সাধারণত এ ধরনের মাথাব্যথার সময় বমি ভাব বা বমি হয় না। হাঁটাচলা করলে মাথাব্যথা কমে না। যদি এগুলো দেখা যায় তবে সেই মাথাব্যথা মাইগ্রেশনের কারণে হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।


এছাড়াও এ দু’টি ব্যথা মাথার আলাদা আলাদা জায়গায় দেখা দেয়। দু:শ্চিন্তা ধরণের ব্যথাটা সাধারণত মাথার দুই পাশে হয়। মনে হয় ব্যথাটা মাথায় চাপ দিয়ে ধরে আছে। কারো কারো ক্ষেত্রে টুপির মতো টাইট হয়ে বসে আছে। আবার কারো কারো মাথার উপর ভারী একটা ওজন বসে আছে। সাধারণত ব্যথা মাথার সামনে থেকে পেছনে এবং ঘাড়ে যায়। তবে কিছু ক্ষেত্রে মাথার যেকোন জায়গায় হতে পারে।


পক্ষান্তরে মাইগ্রেনের ব্যথাটা অন্য রকম হয়। ব্যথাটা টনটন করতে থাকে। মনে হয় একটা রক্তনালী সংকুচিত ও প্রসারিত হচ্ছে।


পার্থক্য তো বুঝে গেলাম। এখন বলছি দুঃশ্চিন্তা ধরণের মাথাব্যথা হলে কি ওষুধ কতদিন খাবেন। এ ধরনের মাথাব্যথা কমাতে ১ হাজার মিলিগ্রাম প্যরাসিটামল কার্যকরী । আমাদের দেশে সাধারণত ৫শ’ মিলিগ্রাম প্যরাসিটামল পাওয়া যায়। ৫শ’ মিলিগ্রাম ট্যাবলেট হলে ২ টি খাবেন। প্যারাসিটামল খাওয়ার আগে খাবার খেতে হবে ভালোমতো।


গরমকালে মাথাব্যথা খুব সাধারণ একটি সমস্যা। কিন্তু সমস্যাকে প্রশ্রয় দিলে তো জীবন চলবে না। মাথাব্যথাকে আর প্রশ্রয় নয়, মাথাকে দিন ব্যথাহীন নিরাপদ আশ্রয়।