জাপাতে অস্থিরতা সৃষ্টির আশঙ্কা

জাতীয় পার্টিতে (জাপা) অস্থিরতা সৃষ্টির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। দলটির প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুর পর জাপার চেয়ারম্যান হয়েছেন তার ছোট ভাই জিএম কাদের। কিন্তু তাকে যে প্রক্রিয়ায় চেয়ারম্যান করা হয়েছে, তাতে ক্ষুব্ধ রওশন এরশাদ ও তার অনুসারীরা। অনুসারীদের অভিযোগ, কাউকে না জানিয়ে দলের কোনো পর্যায়ে আলোচনা ছাড়াই এরশাদের স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছে জিএম কাদেরকে। বিষয়টি ভালোভাবে নেননি রওশন এরশাদ।

জাপার দু'পক্ষের জ্যেষ্ঠ নেতারা এ তথ্য জানিয়েছেন। তবে কেউ এ বিষয়ে গণমাধ্যমে নাম প্রকাশ করে মন্তব্য করতে রাজি হননি। তারা বলেছেন, এখন পর্যন্ত বিরোধ প্রকাশ্যে না এলেও ঝড়ের পূর্বাভাস দেখা যাচ্ছে জাপায়। 

গতকাল শুক্রবার বিকেলে গুঞ্জন ছড়ায়, রওশন এরশাদ ও তার অনুসারী জ্যেষ্ঠ নেতারা চেয়ারম্যান পদে জিএম কাদেরের প্রতি অনাস্থা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন। তবে শেষ পর্যন্ত এর সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে বিরোধীদলীয় উপনেতা রওশন এরশাদের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র  নিশ্চিত করেছে, গতকাল একটি অনানুষ্ঠানিক বৈঠক হয়েছে রওশন এরশাদের গুলশানের বাসভবনে। তার অনুসারীরা জিএম কাদেরের প্রতি অনাস্থা জানিয়ে বিবৃতি দিতে পরামর্শ দেন। তবে রওশন এরশাদ এতে কান দেননি। তিনি আপাতত এমন কিছু করতে চান না বলে জানিয়ে দিয়েছেন। 

সংসদে বিরোধীদলীয় উপনেতার ঘনিষ্ঠ সূত্রটি জানিয়েছে, এখনও এরশাদের মৃত্যুর এক সপ্তাহ হয়নি। স্বামীর মৃত্যুতে শোকাহত রওশন এরশাদ আপাতত রাজনীতি

নিয়ে ভাবছেন না; বরং জিএম কাদেরের বিরোধী নেতারা তার কাছে গিয়ে পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ জানিয়ে যাচ্ছেন।

এই সূত্রটি জানিয়েছে, ৭৬ বছর বয়সী রওশন এরশাদ নিজেও অসুস্থ। তিনি তার ছেলে সাদ এরশাদকে রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত করে যেতে চান। এরশাদের মৃত্যুতে শূন্য রংপুর-৩ আসনের উপনির্বাচনে সাদকে প্রার্থী করতে চান রওশন। সাদ দলের মনোনয়ন চেয়ে না পেলে, তবে তিনি পদক্ষেপ নেবেন। জিএম কাদেরের অনুসারী হিসেবে পরিচিত একজন প্রেসিডিয়াম সদস্য জানিয়েছেন। 

প্রেসিডিয়াম সদস্য ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার এবং ফখরুল ইসলাম রওশন এরশাদের পক্ষে রয়েছেন। দলের বাকি জ্যেষ্ঠ নেতাদের সবাই জিএম কাদেরের পক্ষে। তবে দলীয় এমপিদের বড় অংশ রওশন এরশাদের পক্ষে। জিএম কাদেরের বিরোধীরা রওশন এরশাদের কানভারি করছেন। দেবর-ভাবির মধ্যে সংঘাত সৃষ্টির চেষ্টা করছেন।

গত বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলনে দলের চেয়ারম্যান হিসেবে জিএম কাদেরের নাম ঘোষণা করেন জাপার মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গাঁ। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত দু'জন প্রেসিডিয়াম সদস্য বলেছেন, এমন ঘোষণা আসবে তা তারা আগে থেকে জানতেন না। 

গত ৪ মে মধ্যরাতে বাসায় সাংবাদিকদের ডেকে নিয়ে তাদের সামনে জিএম কাদেরকে জাপার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করেছিলেন এরশাদ। ঘোষণা দিয়েছিলেন, তার অবর্তমানে জিএম কাদেরই হবেন জাপার চেয়ারম্যান। দলীয় গঠনতন্ত্রের ২০-এর ১/ক ধারা অনুযায়ী এ ঘোষণা লিখিত ও মৌখিক দুইভাবেই দিয়ে গেছেন এরশাদ। জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য রেজাউল ইসলাম ভূঁইয়া বলেছেন, এ ঘোষণাবলেই জিএম কাদের চেয়ারম্যান হয়েছেন। এতে গঠনতন্ত্র লঙ্ঘন হয়নি। 

তবে জিএম কাদেরের অনুসারী হিসেবে পরিচিত নেতারাই বলেছেন, দলের প্রেসিডিয়াম কিংবা কেন্দ্রীয় কমিটির সভা ডেকে তাদের অনুমতি নিয়ে চেয়ারম্যান পদে জিএম কাদেরকে বসানো উচিত ছিল। এতে বিরোধ সৃষ্টির আশঙ্কা এড়ানো যেত। রওশন এরশাদকে সম্মান দেওয়া হতো। তিনি সন্তুষ্ট থাকলে তার অনুসারীরা কানভারি করার সুযোগ পেতেন না।

জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য এস এম ফয়সাল চিশতি রওশন এরশাদ এবং জিএম কাদের দু'জনেরই ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। তিনি বলেছেন, কোনো বিরোধ নেই। তবে সূত্রের খবর, তিনি দেবর-ভাবির মধ্যে দূরত্ব কমাতে দূতিয়ালি করছেন। 

এরশাদ জীবদ্দশাতে জাপার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে গেছেন। তিনি নির্দেশ দিয়ে গেছেন, তার মৃত্যুর পর দলের চেয়ারম্যান হবেন জিএম কাদের। বিরোধীদলীয় নেতা হবেন রওশন এরশাদ। দেবর-ভাবির যৌথ নেতৃত্বে চলবে দল। কিন্তু জিএম কাদের দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হওয়ার পর রওশন এরশাদ ও তার অনুসারীরা দলের কার্যক্রম থেকে দূরে রয়েছেন। আজ জাপার কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠক হবে। সেখানেও তাদের উপস্থিতির সম্ভাবনা ক্ষীণ। 

রওশন এরশাদের অনুসারী এক নেতা বলেছেন, জিএম কাদের বিরোধীদলীয় নেতার পদটি রওশন এরশাদের জন্য ছেড়ে দিলে, বিরোধ মিটে যাবে। রওশন এরশাদকে বিরোধীদলীয় উপনেতা নির্বাচনের দায়িত্বও ছেড়ে দিতে হবে; কিন্তু জিএম কাদের নিজেই বিরোধীদলীয় নেতা হতে চাইলে বিরোধ আরও বাড়বে। সরকার যার পক্ষে থাকবে, শেষ পর্যন্ত তার হাতেই যাবে জাপার নিয়ন্ত্রণ।