ঢাকাসহ চার জেলায় পশুর হাট না বসানোর পরামর্শ

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসে বিপর্যস্ত গোটা দেশ। করোনা সংক্রমণের এমন পরিস্থিতিতেই আসন্ন ঈদুল আজহা (কোরবানির ঈদ) উদযাপন করবে দেশবাসী। করোনার এমন সময়ে এ ঈদে কীভাবে পশুর হাট বসবে, তা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করছে সরকার। তবে করোনার ব্যাপক বিস্তার রোধে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও চট্টগ্রামে পশুর হাট না বসানোর পরামর্শ দিয়েছে কোভিড-১৯ প্রতিরোধ বিষয়ে গঠিত জাতীয় কমিটি। এছাড়া করোনার বিস্তার রোধে ঈদের ছুটিতে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও চট্টগ্রাম থেকে অন্যান্য স্থানে যাতায়াত না করার জন্যও পরামর্শ দিয়েছে তারা।

নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার (১০ জুলাই) কোভিড-১৯ জাতীয় পরামর্শক কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ এবং সদস্য সচিব অধ্যাপক ডা. মীরজা‌দি সে‌ব্রিনা ফ্লোরা স্বাস্থ্য মহাপরিচালকের কাছে তাদের এ সুপারিশ পেশ করেন।

তবে পশুর হাট না বসিয়ে কীভাবে পশু কেনাবেচা করা যায় এ বিষয়ে কমিটির পরামর্শ হলো- ডিজিটাল পদ্ধতিতে কোরবানির পশু কেনাবেচার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তবে দেশের অন্যান্য স্থানে সংক্রমণ প্রতিরোধ নীতিমালা অনুযায়ী কোরবানির পশুর হাট বসানো যেতে পারে।

কোরবানির পশুর হাট স্থাপন ও পশু জবাইয়ের ক্ষেত্রেও কয়েকটি সুপারিশ করেন তারা। সেগুলো হলো-

শহরের অভ্যন্তরে কোরবানির পশুর হাট না বসানো; খোলা ময়দানে পশুর হাট বসাতে হবে, যেখানে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা এবং সংক্রমণ প্রতিরোধে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা গ্রহণ সম্ভব; পঞ্চাশোর্ধ্ব ব্যক্তি এবং অসুস্থ ব্যক্তির পশুর হাটে যাওয়া থেকে বিরত থাকা; পশুর হাটে প্রবেশ ও বাইরে পৃথক রাস্তা রাখা; পশুর হাটে আগমনকারী সকল ব্যক্তি মাস্ক পরিধান বাধ্যতামূলক; কোরবানির পশু বাড়িতে জবাই না করে সিটি করপোরেশন নির্ধারিত স্থানে করা; অনলাইনে অর্ডারের মাধ্যমে বাড়ির বাইরে কোরবানি দেয়া সম্ভব হলে তা করার জন্য উৎসাহিত করা।

এ ছাড়া পরামর্শক কমিটি যেসব সুপারিশ করেছে তা নিম্নরূপ-

কোভিড-১৯ পরীক্ষার সংখ্যা ও মান উন্নয়নের জন্য পরীক্ষাগারের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা বেশি প্রয়োজন। এক্সট্রাকশন মেশিনের সহযোগিতায় পরীক্ষাগারে পরীক্ষার সংখ্যা বৃদ্ধি করা সম্ভব। বিভিন্ন পর্যায় থেকে দক্ষ জনশক্তিকে পরীক্ষাগারে নিয়োগ দেয়ার জন্য সুপারিশ করা হয়। পরবর্তীতে কোনো স্থানে করোনা পরীক্ষার ক্ষেত্রে কোনো সমস্যার সৃষ্টি থাকে সেসব স্থানকে ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে শনাক্ত করে সমস্যা সমাধানের ব্যবস্থা করার পরামর্শ দেয়া হয়। করোনা পরীক্ষার জন্য নমুনা দেয়া থেকে পরীক্ষার ফলাফল পর্যন্ত সময় কমানো প্রয়োজন। করোনা পরীক্ষার তথ্য দেরিতে পৌঁছালে আইসোলেশন ও নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয় না। এ ক্ষেত্রে পরীক্ষার ফলাফল দ্রুত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পাঠানোর ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়।

এন্টিজেন বেইজড করোনা পরীক্ষার অনুমতির জন্য ওষুধ প্রশাসনকে পরামর্শ দেয়া হয়, যাতে করে দ্রুত করোনা পরীক্ষার সুযোগ প্রান্তিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়। অ্যান্টিবডি শনাক্তকরণ পরীক্ষার ক্ষেত্রে জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সিদ্ধান্ত বহাল থাকার পরামর্শ দেয়া হয় (সে‌রোসা‌র্ভিলেন্সের ক্ষেত্রে আইজিজি ও আইজিএম আলাদা করা যায় এমন অ্যান্টিবডি কিটের প্রয়োজন, সাম্প্রতিক সংক্রমণ ও আগে সংক্রমণ পৃথক করা না গেলে ছেড়ো সার্ভিলেন্স অসম্পূর্ণ থেকে যাবে)। ছেড়ো সার্ভিলেন্স কার্যক্রম প্রাতিষ্ঠানিকভাবে করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে, বেসরকারিভাবে কার্যক্রম না করার মতামত দেয়া হয়েছে।

এ ছাড়া আর‌টি পি‌সিআর টেস্টিং কিট এক প্রতিষ্ঠান থেকে সরবরা‌হের প‌রিব‌র্তে কতিপয় প্রতিষ্ঠান থেকে সরবরাহের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন, যাতে করে টেস্টিং কিট সংকট সৃষ্টি না হয়। একই ধরনের টেস্ট কিটের পরিবর্তে অধিকতর উন্নত ও সুলভ মূল্যে টেস্টিং কিট জোগাড় করার ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন।

বিভিন্ন হাসপাতালে করোনা আক্রান্ত ও আক্রান্ত নন এমন প্রসূতি মায়েদের চিকিৎসার জন্য আলাদা ইউনিট গঠন বিষয়ে আলোচনা হয় এবং দ্রুত এই ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পরামর্শ দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া করোনা আক্রান্ত প্রসূতি মায়েদের সেবার জন্য পিপিই সরবরাহ নিশ্চিত করার পরামর্শ দেয়া হয়।

প্রবীণরা করোনা আক্রান্ত হচ্ছেন বেশি এবং বিভিন্ন কারণে তারা করোনা পরীক্ষার নমুনা সংগ্রহ স্থানে যেতে সক্ষম হচ্ছেন না, যার ফলে প্রবীণদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। এমতাঅবস্থায় তাদের সহজভাবে অথবা বিশেষভাবে করোনা পরীক্ষা সম্ভব হলে বাড়ি থেকে নমুনা সংগ্রহের ব্যবস্থা করার জন্য আহ্বান জানানো হয়।

জাতীয় পরামর্শক কমিটির সদস্যসহ অনেকেই ‘হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলা’ মেশিন বিভিন্ন হাসপাতালে প্রদান করেছেন। ব্যক্তি উদ্যোগে ৫০টি ‘হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলা’ বিভিন্ন হাসপাতালে ইতোমধ্যে দেয়া হয়েছে এবং আরও ১০০টি স্থাপন করা হবে। জাতীয় পরামর্শক কমিটি তাদের সকলকে সাধুবাদ জানান। সরকারিভাবে মেশিন ক্রয় প্রক্রিয়াধীন। এমতাবস্থায় জাতীয় কারিগরি জাতীয় ও পরামর্শক কমিটির ক্রয় প্রক্রিয়া সঠিক মান নিয়ন্ত্রণ ও সঠিক মূল্য নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছে।

করোনা আক্রান্ত রোগীদের হয়রানি কমিয়ে হাসপাতালে ভর্তি ও চিকিৎসা সেবা প্রাপ্তি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে খালি শয্যার তথ্য স্বাস্থ্য দফতরের ওয়েবসাইটে প্রতিদিন ও নির্দিষ্ট হাসপাতালের সামনে ডিসপ্লে করার পরামর্শ দেয়া হয়। এ ছাড়া আন্তঃহাসপাতাল নেটওয়ার্কিংয়ে একটি হাসপাতাল অপর হাসপাতালের খালি শয্যার তথ্য পাওয়ার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন, যাতে করে রোগীদের সঠিক হাসপাতালে পাঠাতে পারে।

বাংলাদেশে করোনা ভ্যাকসিন প্রস্তুতের বিষয়টিকে জাতীয় কারিগরি পরামর্শ কমিটি স্বাগত জানিয়েছে। তবে করোনা ভ্যাকসিন প্রস্তুতির ক্ষেত্রে কমিটির প্রস্তুত অথবা আবিষ্কার অবশ্যই সরকারি ওষুধ প্রশাসনের অনুমোদনক্রমে এবং ভ্যাকসিন প্রস্তুতিতে আন্তর্জাতিক নীতিমালা অনুসরণ করার পরামর্শ দেন।

কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে জাতীয় পরামর্শক কমিটি করোনা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেছে। করোনা সংক্রমণ এখনও নিয়ন্ত্রণে আসেনি। এ অবস্থায় ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় অবাধ জীবনযাত্রায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে কমিটি। জাতীয় পরামর্শক কমিটি ঢাকা ও তার আশপাশের এলাকায় কঠোর নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের পরামর্শ দিয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বাস্থ্য অধিদফতরের শীর্ষ কর্মকর্তারা জাতীয় পরামর্শক কমিটির সুপারিশ হাতে পেলেও এ ব্যাপারে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানান।

এদিকে, করোনাকালে আসন্ন ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে কোরবানির পশু পরিবহনের পরিকল্পনা নিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। তাছাড়া গবাদিপশু বিপণন ও পরিবহনের সমস্যা সমাধানে প্রাণিসম্পদ অধিদফতরে স্থাপন হচ্ছে হটলাইন। মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র কর্মকর্তারা সার্বক্ষণিক হটলাইনে সম্পৃক্ত থাকবেন।

উল্লেখ্য, দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস। এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ৩৭ জন মারা গেছেন। এ নিয়ে ভাইরাসটিতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল দুই হাজার ২৭৫ জনে। একই সময়ে আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন আরও দুই হাজার ৯৪৯ জন। ফলে মোট শনাক্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়াল এক লাখ ৭৮ হাজার ৪৪৩ জনে।