পুরান ঢাকার অলিগলি যেন কিশোর অপরাধের অভয়ারণ্য

রাজধানীর পুরান ঢাকা পুরো দেশের মধ্যে অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ ও অপরাধ প্রবণ এলাকা। পুরান ঢাকার অলিগলি ও অসংখ্য সংকীর্ণ রাস্তা ছিনতাইকারীদের জন্য অভয়ারণ্য। স্থানীয় ও বহিরাগত কিছু উঠতি বয়সের তরুণ প্রতিনিয়তই চুরি-ছিনতাই, ইভ টিজিং ও মাদকের আসর বসানোর মতো অপরাধ করছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানাচ্ছে, এসব অপরাধের জন্য সংশ্লিষ্ট এলাকার এক বা একাধিক কিশোর গ্যাং জড়িত।


তথ্যমতে, গত এক বছরে লালবাগ, বংশাল, চকবাজার, কোতোয়ালি, সূত্রাপুর, ওয়ারী, ধুপখোলা ও কামরাঙ্গীরচর এলাকায় এসব কিশোর গ্যাংয়ের হাতে অন্তত ১০ কিশোর নিহত হয়েছে। এসব ঘটনায় কয়েকজন কারাগার ও কিশোর সংশোধনাগারে থাকলেও অন্যরা জামিনে ছাড়া পেয়ে দিগুন উদ্যমে অপরাধ করে যাচ্ছে। ২০২১ এর ২৮ মার্চ শব-ই-বরাতের রাতে সূত্রাপুরের ফরাশগঞ্জ ঘাট এলাকায় সিগারেট খাওয়া নিয়ে কিশোরদের মধ্যে বাগবিতণ্ডা হয়। এরই একপর্যায়ে এক কিশোরের ছুরিকাঘাতে প্রাণ হারায় আরিফ হোসেন অনন্ত নামে আরেক কিশোর। হামলায় আহত হয় নিহতের বন্ধু সাজু আহমেদ ও সোহেল।সুত্র জানায়, পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজার, কলতাবাজার, লালকুঠি, শ্যামবাজার, ইসলামপুর, বাবুবাজারসহ সদরঘাটের পার্শ্ববর্তী এলাকায় ফেরদৌস গ্রুপ, সাজু গ্রুপ, সিনিয়র গ্রুপ, জুনিয়র গ্রুপ, টাইগার গ্রুপ, চিতা গ্রুপ, বড় বাপের পোলাসহ অসংখ্য কিশোর গ্যাং গড়ে উঠেছে। প্রতিটি গ্যাংয়ে ২০ থেকে ৫০ জনের বেশি কিশোর সদস্য রয়েছে। এদের কেউ স্কুলের গন্ডি পেরিয়েছে, কেউ বা ভাসমান জনগোষ্ঠীর একজন কিংবা এখনও পড়ছে। এদের মধ্যে কেউ কেউ আবার মাদক মামলার আসামি কিংবা জেল থেকে বের হওয়া। সন্ধ্যা হলেই পুরান ঢাকার ওলি-গলিতে সক্রিয় হয়ে ওঠে এসব গ্যাং।এছাড়াও পুরান ঢাকার বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন বিভিন্ন এলাকায় রাত হলেই দল বেঁধে আড্ডা দেয় উঠতি বয়সের এসব কিশোররা। আড্ডার সময় একা কোনো পথচারী হোক সে নারী বা পুরুষ সামনে পড়লে রেহাই নেই। হারাতে হয় সাথে থাকা অর্থ-সম্পদ সর্বস্ব, নারীরা হারায় সম্মান। হাতিয়ার হিসেবে তারা ব্যবহার করে ছুরি, চায়নিজ চাকু ও ব্লেড। তাদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন এসব এলাকার বাসিন্দারা।


পাতলা খান লেনের বাসিন্দা ফরিদা বেগম (ছদ্মনাম)। মেয়েসহ পরিবার নিয়ে থাকেন একটি নির্মাণাধীন ভবনে। ফরিদা বেগম বিবার্তাকে জানান, রাত হলেই এখানে পরিবেশ পাল্টে যায়। প্রায়ই ১০-১৫ জন কিশোর মাদক সেবনের জন্য এই ভবনে ওঠে। তাদের বয়স ১৫-২৪ বছরের মধ্যে। মাদক গ্রহণসহ প্রায় রাতেই যেসব ফ্ল্যাটে মেয়ে আছে সেসব দরজায় অনবরত তারা শব্দ করতে থাকে। তাদের অত্যাচারে ভবনের মালিক গেটে একাধিকবার তালা দিলেও সেটি ভেঙ্গে ছাদে ওঠে তারা। রাতভর সেখানে মাদক সেবনসহ চিৎকার-চেঁচামেচি করে সকালে বের হয়।বেপরোয়া এসব কিশোরদের বিপক্ষে কথা বললে বিপদ আরো বাড়ে বলে জানান ফরিদা। তিনি বলেন, আমি ছোট চাকরি করি। কিছু বলতে পারি না। কারণ আমার ঘরে একটি মেয়ে রয়েছে। শুনেছি, ওরা স্থানীয় লোকজন এবং প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রছায়ায় থাকে।সম্প্রতি পুরান ঢাকার কলতাবাজার এলাকায় রাত সাড়ে ৯টার দিকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নারী শিক্ষার্থী মেসের প্রয়োজনীয় কাঁচাবাজার নিয়ে বাসায় ফিরছিলেন। এ সময় কবি নজরুল কলেজের পাশে উইনস্টন গলিতে প্রবেশ করলে একটি ছেলে তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী সেই ছাত্রী প্রথমে সূত্রাপুর থানায় সাধারণ ডায়েরি ও পরে মামলা করে। তবে আসামি শনাক্ত হয়নি এখনো।


এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়টির নাট্যকলা বিভাগের আরেক শিক্ষার্থীকে দুই মোটরসাইকেল আরোহী কিশোর শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে। ফলে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন এসব এলাকায় অবস্থান করা কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া নারী শিক্ষার্থীরা।


নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক লক্ষ্মীবাজারের অনার্স পড়ুয়া এক ছাত্রী বিবার্তাকে বলেন, কিছুদিন আগে সন্ধ্যার দিকে লালকুঠিতে আমার এক বন্ধুর সঙ্গে বেড়াতে যাই। হঠাৎ সে সময় আমাদের ঘিরে ধরে ১০-১২ জন উঠতি বয়সী কিশোর। সবার চুল ও পোশাক দেখে বখাটে মনে হয়েছে। পরে কোনো মতে আমরা সেখান থেকে বের হয়ে আসি। এরপরে আর ওদিকে যাবার সাহস করিনি।


বংশালের এক স্থানীয় ব্যাবসায়ী নাম প্রকাশে না করার শর্তে বিবার্তাকে জানান, পুরান ঢাকার অনেক ভবনের ছাদে ছাদে মাদকের আসর বসে নিয়মিত। বাংলাবাজার ও সদরঘাটে কর্মরত কম বয়সী কিশোর-যুবকরা স্থানীয়দের নিয়ে ছাদে মদ, গাঁজা ও জুয়ার আসর বসায়। মাঝে মাঝেই সুযোগ পেলে বাসার মধ্যে ঢুকে পড়ে চুরির মতো অপরাধে জড়ায়। তারা মাদকের টাকার জন্য ছিনতাইও করে। গলির ভেতরে কাউকে একা পেলে দেশীয় অস্ত্র দিয়ে ভয় দেখিয়ে ছিনতাই করে। কেউকিছু বললেও স্থানীয় রাজনৈতিক পদধারী বা নামধারী কোনো না কোনো ‘বড় ভাই’-এর শেল্টার আছে বলে পার পেয়ে যায়।


অপরাধমূলক এসব বিষয়ের বিভিন্ন দিক নিয়ে বিশ্লেষণ করেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. আশেক মাহমুদ। এই সমাজবিজ্ঞানী বিবার্তাকে বলেন, ২০২১ সালের তুলনায় ২০২২ সালে ছিনতাইয়ের ঘটনা বেড়েছে। সামগ্রিক বিবেচনায় এই বেড়ে যাওয়াটাকে অস্বাভাবিক বলার কারণ নেই। কেননা, সমাজবিজ্ঞানের ক্রিয়াবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে বলা হয়, মানুষ কোনো না কোনভাবে সমাজে বেঁচে থাকা বা খাপ খেয়ে চলার তাগিদে বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করে।

রবার্ট ম্যারটন নামক এক সমাজবিজ্ঞানীর কিছু ব্যাখ্যা আছে এখানে। সেটা হচ্ছে, সমাজে যদি বৈধ উপার্জনের ব্যবস্থা না থাকে, তখন অন্যায্য পন্থায় আয়ের পথ খোঁজে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি তাদের আরো বেশি বেপরোয়া করেছে। সে কারণে অশিক্ষিত বেকার তরুণদের মধ্যে ছিনতাইয়ের প্রবণতা বেড়ে যায়।


ড. আশেক মাহমুদ আরো জানান, পুরান ঢাকার অলিগলিতে ছিনতাইয়ের সুযোগ অনেক বেশি। এর প্রথম কারণ, পুরান ঢাকায় অনেক ব্যবসায়ীদের চলাফেরা। আর রাস্তার অলিগলি এত সরু ও অপরিকল্পিত যে, এখানে ছিনতাই করে যে কোনো গলিতে ঢুকে পড়লে ধরা পড়া কঠিন।আরেকটি কারণ, নগর সমাজে প্রায় সবাই অপরিচিত। এখানে কেউ কারো জন্য এগিয়ে আসবে, এই মূল্যবোধ তৈরি করা হয়নি। এদিকে ছিনতাইকারী পিস্তল বা ছুরি দিয়ে যে কাউকে আঘাত করতে পারে-সেই ভয়ে অনেকেই নিশ্চুপ থাকে। অনেক মাদক সেবনকারী মদ কেনার টাকা জোগাড়ের জন্য ছিনতাইয়ের পথ বেছে নেয়। এক্ষেত্রে প্রত্যেক অলিগলিতে সিসি ক্যামেরা বসানোর জন্য সিটি কর্পোরেশনকে দায়িত্ব নিতে হবে। মাদক ব্যবসা বন্ধে কঠিন পদক্ষেপ জরুরি। পুলিশি টহল জোরাদার করার পাশাপাশি তাদের শুধু গ্রেফতার করলেই হবে না, জেল থেকে মুক্তি পাবার পর তাদের কোনো না কোনো কাজ দিতে হবে, যাতে তারা তাদের এসব অপকর্মের পুনরাবৃত্তি না ঘটায়। সামাজিক ও রাজনৈতিক উদ্যোগে এ সমস্যার সমাধান করতে হবে।


সার্বিক বিষয়ে সুত্রাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি তদন্ত) স্নেহাশিস রায় বিবার্তাকে বলেন, আমাদের কাছে কিশোর অপরাধীদের অনেকের নামের তালিকা রয়েছে। সেই তালিকা অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে লাগাতার অভিযান চলছে। এতে অনেককে আটক করা হয়েছে। বড় ধরনের অপরাধে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। যেসব কিশোর যত্রতত্র আড্ডাবাজী করে ও মেয়েদের উত্ত্যক্ত করে তাদের ধরে পরিবারের মাধ্যমে সংশোধনের ব্যবস্থা করছি। যারা বড় ধরনের অপরাধ করছে, তাদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। এছাড়া কারো কোনো অভিযোগ আমাদের জানালে আমরা সেটার তাৎক্ষণিক ব্যাবস্থা নেব।