‘নূর হোসেন আমাদের ক্ষমা করো’ বলেও কি দায় শোধ করতে পারি!

আশির দশকে বাংলাদেশে হেরোইন ব্যবসা রমরমা হয়। মানহানির মামলার ভয় আছে- তারপরেও সে দায় নিয়েও সত্য কথা বলতে হবে। আশির দশকে আন্ডারওয়ার্ল্ডের হেরোইন ব্যবসার সবটুকুর নিয়ন্ত্রণ ছিল বঙ্গভবনে। কেউ কেউ বলতেন নিয়ন্ত্রণ এরশাদের হাতে, কেউ কেউ বলতেন এটার হিসাব নিকাশ করেন এরশাদপত্নী। রাঙ্গাঁ সাহেব সে সময় থেকেই এরশাদের সঙ্গে আছেন। তাই নিঃসন্দেহে বলা যায়, হেরোইন সম্পর্কে রাঙ্গা সাহেব অনেক বেশি অভিজ্ঞ। তিনি তার জীবনের এই প্রান্তে এসে, বাংলাদেশে কীভাবে এই সামরিক শাসকের মাধ্যমে হেরোইন প্রবেশ করল, কীভাবে সামরিক সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় এর চোরাচালান হত এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের সহায়তায় এই ড্রাগ কীভাবে যুবসমাজের চরিত্র ও মেধা নষ্টের জন্য ব্যবহার হয়েছিল তা সবিস্তারে বলতে পারতেন। এমনকি রাঙ্গাঁ সাহেব এ বিষয়ে একটা বই লিখলেও সেটা দেশের জন্য অনেক ভাল কাজ হত। মানুষ জানতে পারতো সামরিক সরকাররা কীভাবে জাতীয় চরিত্র ও মেধা নষ্ট করে।

বাস্তবতা হল সামরিক শাসকের এই সমস্ত ডাস্টবিনরা কখনোই তাদের চরিত্র বদল করেন না এবং দেশ ও জাতির জন্য ভাল কিছু করেন না। তবে বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য; একটি সামরিক শাসকের দল, এ দেশের অন্যতম প্রধান দল- আরেক সামরিক শাসকের দল, দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলের সহযোগী। দুর্ভাগ্যের এই চাদর থেকে বাংলাদেশ গত তিন দশকেও বের হতে পারল না। খুব শিগগিরই যে বের হতে পারবে তার লক্ষণও রাজনীতিতে দেখা যায় না। এ দায় শুধু রাজনীতিকদের নয়, এ দায় এদেশের সব পেশার মানুষের। এখানে কোন একজনের দোষ দেখার সুযোগ নেই বরং সকলেরই মাথানত করে থাকাই ভাল। কিন্তু প্রশ্ন হল আর কত মাথানত করতে হবে? আমাদের এই উপলদ্ধি অভাবে তরুণ সমাজের বুকে সগৌরবে শোভা পেতে দেখেছি- “আমি রাজাকারের সন্তান” লেখা প্লাকার্ড। এবং তাদের স্বপক্ষে শুধু জনমত নয় বুদ্ধিজীবী মতামতও দেখতে পেয়েছি। আর তরুণ সমাজ থেকে শুরু করে একশ্রেণির বুদ্ধিজীবী অবধি এই অবস্থানে বলেই জিয়াউর রহমান, এরশাদ সকলেরই ডাস্টবিনগুলো এখনো নানান গৃহে অবস্থান করছে। তাই সেই রাষ্ট্রে, সেই সমাজে হেরোইনের পৃষ্ঠপোষক সামরিক শাসকের ডাস্টবিন রাঙ্গাঁ সাহেব, শহীদ নূর হোসেনকে হেরোইনখোর বলার মত ঔদ্ধত্য দেখাবার সুযোগতো পাবেই। আমরা সকলে মিলে এই সব ডাস্টবিনের এ সুযোগ করে দিয়েছি।

এ কারণে রাঙ্গাঁ সাহেবকে নিয়ে খুব বেশি মাথাব্যথা নেই। কারণ রাঙ্গাঁ সাহেবরা আরো অনেকদিন থাকবেন এই রাষ্ট্রে ও সমাজে। হয়তো ততদিন আমরা থাকব না, আমরা যারা নূর হোসেনের মত ছেলেকে অনেক কাছে থেকে দেখেছি। শুধু তার সাধারণ জীবন-যাপন ও রাজনৈতিক কর্মীর জীবনযাপন নয়। তার অসাধারণ আত্মাহুতিও নিজের চোখে দেখেছি। এ কারণে আজ যখন তার মত একজন আইকন শহীদকে নিয়ে এ ধরনের ধৃষ্টতা দেখা যায় তখন মনে করি নতুন প্রজন্মের জন্য নূর হোসেন সম্পর্কিত কিছু তথ্য বা কাছ থেকে দেখা তার মৃত্যু সম্পর্কে কিছু কথা বলে যাওয়া উচিত। কারণ যে দেশে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে প্রশ্ন তোলে, যে দেশে সাদেক হোসেন খোকা মেয়র থাকাকালে এম আর আক্তার মুকুলের মরদেহ কবরস্থ করার পারমিশন আনতে গেলে সিটি কর্পোরেশন থেকে প্রশ্ন তোলা হয়- চরমপত্রখ্যাত এম আর আক্তার মুকুল মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন কিনা- সেখানে নূর হোসেনকে নিয়ে ভবিষ্যতে আরো কী ধরনের নোংরামি হবে তাই বা কে জানে!

নূর হোসেনের সঙ্গে পরিচয় মিছিলে, ব্যক্তিগত পরিবেশে । তখন তরুণ সাংবাদিক। ঢাকার মাঠপর্যায়ের ছাত্রনেতাদের প্রায় সকলকেই চিনতাম। জগন্নাথ কলেজকেন্দ্রিক এমনই এক ছাত্রনেতা ছিল জাকারিয়া চৌধুরীর ভাই এমরান চৌধুরী। তিনি বিভিন্ন সময়ে পত্রিকা অফিসে আসতেন এবং অত্যন্ত বিনয়ী ছিলেন। আমার বাসা লক্ষ্মীবাজার শুনে একদিন একটি টেম্পোতে তিনি আমাকে লক্ষ্মীবাজার নামিয়ে দিতে চাইলেন। টেম্পোটি পত্রিকার অফিসের সামনেই দাঁড়ানো ছিল। লক্ষ্মীবাজার নামার পরে তিনি কোন ভাড়া দিলেন না। বরং টেম্পোচালক ছেলেটি তার কাছে এসে বলল ‘ভাই, আজ যাই’। আমি এমরানকে জিজ্ঞেস করি ‘ও, কে? এমরান আমাকে জানায় ‘ ও, আমাদের যুবলীগের কর্মী, বাসা বনগ্রাম’। আমি বললাম ‘ও কি সবসময় টেম্পো চালায়?’ এমরান হেসে বললেন-‘ দাদা, পার্টির কোন কর্মসূচী থাকলে ও আর সেদিন টেম্পো চালায় না’। এই প্রথম নূর হোসেনের সঙ্গে পরিচয়।

এরপরে ১৫ দলের মিটিংয়ে সামনে মাটিতে বসা প্রথম বা দ্বিতীয় সারিতে প্রায়ই নূর হোসেনকে দেখতাম। অনেকদিন জিজ্ঞেস করেছি- ‘তুমি কেমন আছো?’ সে একটা হাসি দিয়ে উত্তর দিত। সম্ভবত ও একদিন কোন একটা কারণে ওদের বনগ্রামের বাসাটার লোকেশনটা আমাকে বলেছিল। পুরনো ঢাকায় বেড়ে ওঠার কারণে এর অলিগলি সবই চিনতাম। তাই নূর হোসেন মারা যাওয়ার অনেক আগে থেকেই নূর হোসেনের বাড়িটাও চিনতাম। নূর হোসেন মারা যাবার পরে তার বাবার কাছে বহুবার গিয়েছি। সে সময়ে সাংবাদিকদের ভেতর একতা সম্পাদক বর্তমানের প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান এবং আমি প্রায় নিয়মিত তাদের বাসায় যেতাম। খোঁজ খবর নিতাম। আর নেত্রী হিসেবে শেখ হাসিনা তাদের জন্যে যা করেছেন তার তুলনা নেই।

১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বরের আগে নানা কারণে অনেক আওয়ামী লীগ কর্মীর সঙ্গে সঙ্গে নূর হোসেনকেও জানতাম। বিশেষ করে যারা মিটিং এর সামনেরদিকে মাটিতে প্রথম কয়েক সারির কর্মী- সাংবাদিক হিসেবে তাদের সকলেরই মুখ চেনা ছিল। অনেকের নামও জানা ছিল।

১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর দিনটা অনেকখানি মেঘলা ছিল। সকালে প্রেস ক্লাবের সামনে খবর পাই, আজ শেখ হাসিনার গাড়ি বের হতে দেয়া হবে না। তাই তাড়াতাড়ি ৩২ নম্বরের দিকে রওনা হই। শাহবাগ গিয়ে আবার খবর পাই, শেখ হাসিনার গাড়ি আসছে। পুলিশ বাঁধা সরিয়ে নিয়েছে। এরই মধ্যেই শাহবাগে থাকতেই খবর পাই, পল্টনে জীবনবীমার সামনে পুলিশের সঙ্গে ছাত্রজনতার সংঘর্ষ হচ্ছে। শাহবাগ থেকে দৌড়ে যখন তোপখানা মোড়ে পৌঁছাই ততক্ষণে সে সংঘর্ষ থেমে গেছে। কিন্তু একটি জটলা দেখা যাচ্ছে। সেটা দেখে এগিয়ে গিয়েই দেখি ঝাঁকড়া চুলের একটি ছেলে কমিউনিস্ট পার্টির অফিসের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে। তার পিঠে লেখা “গণতন্ত্র মুক্তি পাক”। তখনো বুঝতে পারিনি ছেলেটি নূর হোসেন। কারণ তার মুখ তখনও দেখিনি। এর ভিতর শেখ হাসিনার গাড়ি তোপখানা মোড়ে পৌঁছে গেছে। তোপখানা মোড়ে কয়েকহাজার মানুষ জড়ো হওয়াতে সেখানে একটি হ্যান্ডমাইক নিয়ে তাদের উদ্দেশ্যে তিনি বক্তব্য রাখছেন। শেখ হাসিনার বক্তব্য যখন নোট নিচ্ছি, এ সময়ে সাংবাদিক নাজিমউদ্দীন মানিক ভাই এসে হাত ধরে টেনে একেবারে শেখ হাসিনার চট্ট মেট্রো গ-১০ জিপটির কাছে নিয়ে গেলেন। মানিক ভাইয়ের মত পরিচিত সাংবাদিকের সঙ্গে থাকার ফলে সহজেই ভিড় ঠেলে শেখ হাসিনার গাড়ির কাছে পৌঁছাই। ততক্ষণে শেখ হাসিনার বক্তব্য শেষ হয়ে গেছে। গাড়ির পেছনের দিক সম্ভবত তখনো খোলা ছিল। যতদূর মনে পড়ে- মানিক ভাই পেছনের দিক দিয়ে জিপে উঠে গেলেন। জিপের পেছন দিক বন্ধ করে দিলে- জিপের পেছন দিক ধরে জগন্নাথ কলেজের কয়েকজন ছাত্রনেতা এবং শেখ নজিবুর রহমান নজিবসহ আরো কয়েকজন গাড়ির পেছন ধরে ঝুলে থাকলেন। বুঝতে পারি, আজ শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হতে পারে। তাই নেতাকর্মীরা এভাবে গাড়ি ঘিরে রেখেছেন। শেখ হাসিনার গাড়ি জিপিও পর্যন্ত পৌঁছায় নি, এ সময়ে যেন হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে- উদ্দাম স্লোগান দিতে দিতে একটা ছোট মিছিল গাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। এমনিতেই শেখ হাসিনার গাড়ি ধীর গতিতে চলছিল। আমরা তার সঙ্গে সঙ্গেই হাঁটছি। এর ভেতর মিছিলটি দেখে তিনি গাড়ি থামাতে বললেন এবং ছাত্রলীগের এক নেতাকে বললেন ‘ওই ছেলেটিকে ডাকো’। শেখ হাসিনা আঙুল দিয়ে ইশারা করাতে সেদিকে তাকিয়ে দেখি কোমরে শার্ট বাঁধা, খালি গায়ে ঝাঁকড়া চুলের সেই ছেলেটি- যার পেছনে লেখা “গণতন্ত্র মুক্তি পাক”। ছাত্রলীগ নেতাটি দৌড়ে গিয়ে তাকে ফেরাতেই তার মুখ দেখে চিনতে পারি বনগ্রামের নূর হোসেন। বুকে লেখা “স্বৈরাচার নীপাত যাক”। নিপাত বানানটিতে ‘ন’ তে দীর্ঘ ই কার। পাশের থেকে কয়েকজন বললেন নিপাত বানান ভুল। তাৎক্ষণিকভাবে মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল- মানুষ যেভাবে সামরিক স্বৈরাচারের নিপাত চাচ্ছে, তাতে ‘ন’ তে দীর্ঘ ই কারই ঠিক। এর মধ্যেই ছেলেটি শেখ হাসিনার গাড়ির প্রায় কাছাকাছি চলে এসেছে। শেখ হাসিনা গাড়ির গ্লাস নামিয়ে হাত বের করে বললেন-‘ এই ছেলে, শার্ট গায়ে দাও, ওরা তোমাকে বডিশ্যুট করবে’। ছেলেটি আহ্লাদে ছোট ভাইয়ের মত মাথা নিচু করে এগিয়ে গিয়ে বলে- ‘আপা, মাথায় হাত বুলায়া দেন, আজ জান দিয়ে দিমু’। শেখ হাসিনা তার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন- ‘তুমি শার্ট গায়ে দাও।’ সে কোন কথা না শুনে উল্কার গতিতে আবার মিছিলের সামনে চলে গেল। এর ভিতর শেখ হাসিনার গাড়ি জিরো পয়েন্টের কাছাকাছি এসে যায়। হঠাৎ টিয়ার গ্যাসের ধোঁয়ায় চারদিক অন্ধকার হয়ে যায়। সঙ্গের লোকজন ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। মাথা নিচু করে দৌড়িয়ে জিপিওর ফুটপাতের উল্টাপাশে উঠেই তাকিয়ে দেখি শেখ হাসিনার গাড়ি ক্রেন দিয়ে টেনে তোলা হচ্ছে। আর শেখ হাসিনার চারপাশ ঘিরে রয়েছেন তাঁর নেতাকর্মীরা। হঠাৎ আর্মড পুলিশের একটা বেত এসে আমার পিঠের উপর পড়ে। তাড়াতাড়ি তখন ফুটপাতের পাশে থাকা ঝুপড়ি বাজারের ভিতর ঢুকে যাই। তারপরে ওর ভিতরের গলি দিয়ে- চায়না ড্রাই ক্লিনার্সের পাশ দিয়ে স্টেডিয়ামের উল্টা পাশের রাস্তায় বের হই। খানিকটা সাহস করে আর্মড পুলিশের রাইফেলের নলের সামনে দিয়ে রাস্তা পাড় হয়ে ওপারে যাই। ওপারে ডানদিকে তখন আউটার স্টেডিয়ামের কন্সট্রাকশন চলছিল। ওই স্টেডিয়ামের ভেতর ঢুকে পড়ি তাড়াতাড়ি। তারপরে স্টেডিয়ামের গ্যালারি বেয়ে একদম উপরে চলে আসি। সেখান থেকে রাস্তামুখো দাঁড়িয়ে ডানদিকে তাকাতেই দেখি স্টেডিয়ামের সামনে একটি দেবদারু গাছের সোজাসোজি রাস্তা থেকে পুলিশ রক্তাক্ত একটি দেহ টেনে ভ্যানে উঠাচ্ছে। এর কিছুক্ষণ পরে দেখি স্টেডিয়ামের ভিতর দিয়ে তৎকালীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাজেদা চৌধুরী প্রাইভেট কারের ভেতর কয়েকজন আহতকে নিয়ে আসছেন। উনি আহতদের নিয়ে দ্রুত ঢাকা মেডিকেলে চলে যান। আমি রিকশা নিয়ে কিছুদূর এগিয়ে আবার ফিরে আসি। এসে দেখি, ওই দেবদারু গাছের সোজাসোজি রাস্তায় জমাট বাঁধা রক্তের পাশে বেশ কয়েকজনের জটলা। তার ভেতর থেকে ছোট একটা ছেলের চোখে পানি। তার কাছে জানতে পারি, আর্মড পুলিশের গুলি লাগার পরে নূর হোসেন বেঁচে ছিল কিন্তু পুলিশ তার আহত দেহ টেনে হিঁচড়ে ভ্যানে উঠিয়ে নিয়ে গেছে। সঙ্গে সঙ্গে মনটা কেমন স্তব্ধ হয়ে গেল। যেন শরীরের চারপাশে একটা ঠান্ডা বাতাস বয়ে গেল। মনে পড়লো, একটা হাসি মুখ। মিছিলের মিটিং এর সেই মুখটি। একটি দীর্ঘশ্বাস কোথা থেকে যেন এল আর মনে হল- তাহলে সত্যিই এরশাদের পুলিশ নূর হোসেনকে বডিশ্যুট করেছে। ওই রক্তের দিকে বেশিক্ষণ তাকাতে পারিনি। কিন্তু ওই পথই ছিল আমার প্রতিদিনের যাওয়া-আসার পথ। প্রতিদিন আসা যাওয়ার পথে দেখিছি ওই রক্ত প্রথমে কালো হয়ে গিয়েছিল, তারপর ধীরে ধীরে সেই কালো রক্ত মুছে যেতে থাকে। নিরবে প্রতিদিন শ্রদ্ধা জানিয়েছি ওই রক্তকে। খুঁজতে গিয়েছি জুরাইন কবর স্থানে নূর হোসেনের কবর। অনেক দিন তার বাবাকে দেখেছি এক মুখ সফেদ দাড়ি দিয়ে ওয়ারিতে অটো রিকশার পাশে দাঁড়িয়ে প্যাসেঞ্জার খুঁজছেন। নিরবে সালাম দিয়ে তার পাশে দাঁড়িয়েছি। দু চার কথা বলেই তিনি চোখ দিয়ে পানি ফেলেছেন। সেদিন মনটা ভারাক্রান্ত হয়েছে বেশি। নিরবে এসে দাঁড়িয়েছি সেই দেবদারু গাছের সোজাসুজি রাস্তায়। যেখানে দীর্ঘদিন ছিল জমাট বাঁধা রক্ত। তখন মনে হতো এই রক্ত আমারও বুকে জমাট বেঁধে আছে।

আজ ৩২ বছর পরে নিজের মনের কাছে একটাই প্রশ্ন- রাস্তা থেকে বর্ষায়, ধুলায় এই রক্ত মুছে গেছে কিন্তু আমাদের হৃদয় থেকে ওই রক্ত মুছে গেল কীভাবে? যার সুযোগে রাঙ্গাঁ সাহেবের মত ডাস্টবিনরা- দেশ মায়ের পায়ে সামরিক স্বৈরাচার উৎখাতের জন্যে যে ছেলেটি পবিত্র রক্ত ঢেলে গেলো তাকে হেরোইনখোর বলে এখনো সমাজে ঘোরাফেরা করছে! এর পরে আমাদের আর অবশিষ্ট কী থাকে? ‘নূর হোসেন আমাদেরকে ক্ষমা করো’- এ কথা বলেও কি আমরা নিজেদের দায় শোধ করতে পারি?


লেখক: স্বদেশ রায়