বিজয় দিবসের প্রকাশের ভাষা কি নতুন হওয়া দরকার নয়?

স্বাধীনতার পর পরই সকলে যখন বিজয় দিবসে স্মৃতিচারণে ব্যস্ত ছিলেন, পাকিস্তানিরা আমাদের কী ক্ষতি করে গেছে এগুলোর ব্যাখ্যা করতেন সেগুলো শুনতে খুবই ভালো লাগতো। বুঝতে ভালো লাগতো একটি মুক্তিযুদ্ধ বা একটি রাষ্ট্রবিপ্লব কত বড়, এই সৃষ্টির পেছনে কতটা দুঃখ থাকে, ত্যাগ থাকে আবার কি নিষ্ঠুর বর্বরতা থাকে। ওই সময়ে বঙ্গবন্ধুর ভাষণগুলো শুনতাম, সেগুলোও তখন এমনটি মনে হতো। মনে হতো বঙ্গবন্ধু তাঁর ভরাট গলায় আবেগের সঙ্গে জাতির উদ্দেশ্যে , এ জাতির ত্যাগের মহিমা বর্ণনা করছেন আর পাকিস্তানিদের বর্বরতার কথা বলছেন। পঁচাত্তরের পরে ওই দুঃখের দিনে যখন অনেক খানি হতাশায় ডুবেছিলাম ওই সময়ে হতাশা কাটানোর জন্যে, মনে সাহস পাবার জন্যে বঙ্গবন্ধুর ভাষণগুলো বার বার পড়তাম। তখন আবিস্কার করি, অন্যদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর ভাষণগুলোর পার্থক্য ছিল। শুরু থেকে বঙ্গবন্ধু একটু একটু করে অনেক কথা বিজয় দিবসে বলতে শুরু করেছিলেন। শুধু বিজয় দিবসে নয় বিভিন্ন দিবসে তিনি বলতেন। তার এই কথার সুর পরবর্তীতে তাজউদ্দিন আহমদের ভাষণ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় পড়তে পড়তে পেয়েছি। কিছুটা পেয়েছি সৈয়দ নজরুল ইসলামের ভাষণে।

বাস্তবে এখন মনে হয় বিজয় দিবসে আমাদের প্রকাশের, আকঙক্ষার ভাষাগুলো কী হবে সেটার পাপড়ি অল্প অল্প করে খুলতে শুরু করেছিলেন বঙ্গবন্ধু, জাতীয় নেতারা, যুব নেতা শেখ ফজলুল হক মনি প্রমুখ। এগুলো গত দশ বছরে প্রকৃত গবেষকদের হাতে গবেষণা হলে ঠিক হতো। তাহলে বিজয় দিবসের পঞ্চাশের আগে জাতির বিজয় দিবসের প্রকাশের ভাষা বদলে যেত। কারণ, বীরত্বের যে যুদ্ধ, সংগ্রামের যে ধারাবাহিকতা, সাহসিকতা সবই ছিল সেই সময়ের জন্যে প্রয়োজন। এখন সময় নতুন। কাজ নতুন। অথচ বিজয় দিবস একটি ধারাবাহিকতা। পরাধীন দেশের ভেতর বসে যুদ্ধ করে একটি দিন অর্জন করতে হয় বিজয় দিবস হিসেবে। কিন্তু স্বাধীন দেশে বিজয় দিবস প্রতি মুহূর্তে। তাই এর প্রকাশের জন্যে প্রতিমুহূর্তে নতুন নতুন ভাষা খুঁজতে হবে। যেমন ধরা যাক বিজয় অর্জনের জন্য আমাদের গ্রামের মায়েরা, বোনেরা দা, কাস্তে হাতে নিয়ে শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল। এখন কোটি কোটি মা বোনের হাত নানান যুদ্ধ করছে প্রতি মুহূর্তে, বিজয় ছিনিয়ে আনছে তাদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে। আবার পিছিয়েও পড়ছে। যুক্তিপূর্ণ চিন্তার মগজকে বিশ্বাসের অলসতা দিয়ে ঢেকে দিচ্ছে তারা। এর বিরুদ্ধে বিজয় দিবসে আমাদের শোভনীয় প্রকাশের ভাষা খুঁজতে হবে যাতে কারো চিন্তায়, মনে কোন আঘাত না লাগে অথচ সে নিজের মত করে উপলব্ধি করতে পারবে তার সমস্ত শরীর, সমস্ত কাজকে পরিচালনার জন্যে যে চিন্তার জগত -সেটা কত বৃহৎ, সেটাকে এক্সপ্লোর করলে সে কত বড় হতে পারে, দেশকে কত কিছু দিতে পারে।

যেমন বিজয় দিবসের আগে এ দেশের ছাত্ররা তাদের দেশের জন্যে, মানুষের জন্যে, সমাজের জন্যে প্রকাশের অনেক ভাষা সৃষ্টি করেছিল। তখন ডাকসু ভিপি মানে একজন ‘স্রষ্টা’ হতেন। তিনি কিছু না হলেও একটা সময় পরিবর্তনকারী স্লোগান তৈরি করেছেন। কেউ কিন্তু তের কোটি টাকার ব্যবসার তদবির করেনি। হ্যা, ব্যবসার তদবির ডাকসু থেকে নুরু এই নতুন করা শুরু করেনি। শুরু হয়েছে ১৯৭৫ এর ১৫ অগাস্টের প্রতিবিপ্লবের পর থেকে। তাই বিজয় দিবসে ডাকসুকেও নতুন প্রকাশের ভাষা খুঁজতে হবে। তাদেরকে নতুন মানুষ, নতুন সমাজ, নতুন অর্থনীতি বিনির্মাণের জন্যে ভাষা খুঁজতে হবে। কেউ বলতে পারেন, প্রতি বিজয় দিবসে কি নতুন মানুষ, নতুন সমাজ, নতুন অর্থনীতি ও সংস্কৃতি খুঁজতে হবে? হ্যা, খুঁজতে হবে। কারণ, কোন কিছুতে অল্প হলেও নতুনত্ব যদি না থাকে তা তো একটি মৃত বিষয়। আর মৃত বিষয় নিয়ে কবরস্থান গড়ে তোলা যায়, শ্মশানের আগুন জ্বালানো যায়- কোন পথে বিজয়ের পথ যাত্রী হওয়া যায় না। বিজয়ের পথযাত্রী হতে হলে তাকে প্রতি মুহূর্তে নতুন হতে হবে।

আজ জলবায়ু পরিবর্তনের আঘাতে আমরা ক্ষত বিক্ষত। জলবায়ু পরির্বতনের ফলে নদীগুলোর চরিত্র বদলে গেছে। বেড়েছে নদী ভাঙ্গন। যার ফলে শহরের বস্তিতে বাড়ছে মানুষের পরিমান। আবার এও সত্য এখান থেকে দশ বছর আগে বস্তি থেকে স্কুলে যায় এমন মেয়ের সংখ্যা কম পাওয়া যেত। দশ বছরের অনেক আগে বস্তি থেকে কম বয়সের মেয়েরাও বাসা বাড়িতে কাজ করতে আসতো। এর পরে দশ বছর আগে দেখা গেল প্রায় সবাই গার্মেন্টেসে কাজ করতে যাচ্ছে। সমাজে আরেকটি নতুন শ্রেণি হলো পোশাক কর্মী। ধীরে ধীরে তাদের একটি মর্যাদার আসন হলো সমাজে। অর্থাৎ তারা একটার পর একটা বিজয়ের সিঁড়ি অর্জন করে চলেছে। এদিকে গত দশ বছরে বস্তি আরো পাল্টে গেছে। এখন আর বারো তের বছরের মেয়েরা গার্মেন্টেসে কাজ করতে যায় না বস্তি থেকে। বরং তারা কোন না কোন স্কুলের ড্রেস পরে পড়াশুনা করতে যায়। এদের এই বিজয়কে কীভাবে অঙ্কিত করতে হবে তার জন্যেও ভাষা প্রয়োজন, উপস্থাপনা প্রয়োজন। যাতে ধীরে ধীরে এমন পরিবর্তন আরো অনেক ক্ষেত্রে আসে।

যেমন যখন বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে ওই সময়ের বাস্তবতা এমন ছিল শুধু মানসিকভাবে পিছিয়ে থাকা সন্তানরা নয়, সামান্য শারীরিকভাবে পিছিয়ে থাকা সন্তানদেরও মৃত্যুকে মেনে নেয়া না হয় তিলে তিলে শেষ হয়ে যাওয়া, ভিক্ষা বৃত্তি গ্রহণ করা- এইসব ছাড়া অন্য কোন পথ ছিল না। দেশ যখন ৪৯তম বিজয় দিবস পালন করছে এ সময়ে বাংলাদেশেরই এক মেয়ে, ( তার পরিচয় এখন আর শুধু প্রধানমন্ত্রীর কন্যার ভেতর সীমাবদ্ধ রাখা ঠিক নয়) সায়মা ওয়াজেদ পুতুল মানসিক ভিন্ন গঠনের সন্তানদের জন্যে তাঁর সারাটা দিন রাত ব্যয় করছেন। শুধু তাই নয় শেখ সায়মা ওয়াজেদ পুতুল ( তাঁর নামের আগে শেখ লিখছি এ কারণে, বর্তমানে পরিচয়ের জন্যে মায়ের নাম ও বাবার নাম দুটোই লিখতে হয়। তাই স্বাভাবিকই ছেলে বা মেয়ে ইচ্ছে করলে বাবার বদলে মায়ের স্যার নেম বা পদবী গ্রহণ করতে পারে।) সারা বিশ্বের এই ভিন্ন মানসিক গঠনের বাচ্চাদের নিয়ে কাজ করেছেন। বাঙালির সন্তানদের মধ্যে এই বিশ্ব জয়ের আকাঙ্ক্ষা জেগেছে -এটাই এখন বাঙালির চলমান বিজয়ের পথ যাত্রা।

বাঙালির এই ৪৯তম বিজয় দিবসের ভাষা আরো কী কী হতে পারে, কোন কোন সেক্টরে তা নিয়ে এখন প্রফেসররা, গবেষকরা নেমে পড়বেন। আমাদের মত সাধারণ সাংবাদিকদের কাজ এটা নয়। আমাদের শুধু ঘেউ ঘেউ করা কুকুরের মত ডেকে জানিয়ে দিতে হয়; আর কিছু নয়। তবে বিশ্ব বুকে বাঙালির বিজয় লিখতে গেলে এই ৪৯তম বিজয় দিবসে দুটি বিষয় ভাবা দরকার। যার প্রথম হলো শুধু শারিরিক পরিশ্রম করার জন্যে বাঙালির ঘরের ছেলেরা আর কতকাল বিদেশে যাবে? তারা কি উন্নত কাজ করার জন্য যাবে না। সেই মানুষ যতক্ষণ না তৈরি হচ্ছে ততক্ষণ কিন্তু বিজয় দিবস পালনের সার্থকতা থাকছে না। আর এই মানুষে তৈরি করতে হলে পরিকল্পিত মানব উৎপাদন ও মানব সম্পদ উৎপাদনের বিষয়টি ভাবতে হবে। আমরা গত প্রায় বিশ বছর ধরে ধীরে ধীরে পরিকল্পিত মানব উৎপাদন থেকে দূরে চলে যাচ্ছি। এর ভয়াবহতা যেকোন বিজয়ের পথে যাত্রাকে থামিয়ে দিতে পারে। গত ৪৯ বছরে প্রায় তিন গুণ হতে চলেছে মানুষ। আর ৪৭ সাল থেকে হয়েছে ৬ গুণের বেশি। এ ধারা চলতে থাকলে ভবিষতে বিজয় দিবস ভিন্নরূপ নেবে, চেতনা থেকে বিজয়ের সেই প্রতিপত্ত্বি কমে যাবে। আর মানবসম্পদ তৈরির বিষয়টি ! মানুষকে যতক্ষণ না সম্পদে পরিনত করা না যায় ততক্ষণ প্রকৃত বিজয় দিবস ও তা প্রকাশের ভাষা তৈরি হয় না।

স্বদেশ রায়, সাংবাদিক