রাজাকারের তালিকা কাণ্ড!

সম্প্রতি 'রাজাকারের তালিকা' নিয়ে এক অদ্ভুত কাণ্ড দেখলো জাতি। এই তালিকা প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং আগামী বছরের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের মধ্যে আবার প্রকাশের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। এই তিন মাস কি যথেষ্ট এই কাজ যথাযথভাবে শেষ করার জন্য? দেশের মুক্তিযুদ্ধ গবেষক, বিভিন্ন এলাকার দায়িত্বশীল, আস্থাভাজন মানুষের যুক্ততা ছাড়া - সহায়ক যাবতীয় দলিল-দস্তাবেজ ছাড়া তাড়াহুড়ো করে এই কাজ আবার শেষ করতে যাওয়া সঠিক হবে না বলে আমি মনে করি।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ তো কোন রঙ্গীন চলচ্চিত্র নয়-সব ছিল সাদা-কালোতে। কারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিল এবং কারা ছিল না তা একাত্তরের কর্মকাণ্ডতেই নির্ণীত হয়ে রয়েছে। জাতির দায়িত্ব, নব প্রজন্মের দায়িত্ব তা সঠিকভাবে জানা। এর মাধ্যমে জাতি কাদের সম্মান জানাবে এবং কাদের সম্মান জানাবে না - তা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে নির্ধারিত হবে। এই নির্ধারণের কষ্টি পাথর হলো আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবোধ।

আমার প্রশ্নঃ যারা সাম্প্রতিক এই তালিকা করার কাজের সাথে জড়িত ছিলেন তারা কি জাতির জন্য দুটি অমুল্য বই - 'একাত্তরের ঘাতক দালালেরা কে কোথায়?' (প্রকাশিত - ১৯৮৭; প্রকাশকঃ মুক্তিযুদ্ধ চেতনা বিকাশ কেন্দ্র) আর 'একাত্তরের দালালেরা' (প্রকাশিত - ১৯৯১; প্রকাশকঃ মুক্তিযোদ্ধা সংহতি পরিষদ) সংগ্রহ করেছেন, এবং তাদের কাজে এই বই থেকে প্রয়োজনীয় তথ্যাবলী কাজে লাগিয়েছেন? সাম্প্রতিক তালিকা বলে যে তারা এই বই দুটিকে মোটেও আমলে নেননি। কিন্তু আদতে এই বই দুটিকে রাষ্ট্রের আমলে নিতে হবে।

মনে পড়ছে ১৯৮৭ সালে সংসদে সে সময়ের বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা দালালদের তালিকা প্রণয়ন করার জোর দাবী জানিয়ে বক্তব্য প্রদানের এক পর্যায়ে বলেছিলেন, ’আজ যেমন মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে তেমনিভাবে কারা টিক্কা, রাও ফরমান আলীর সহযোগী ছিল, কারা রাজাকার আলবদর ছিল, ’৭২ সালের সংবাদপত্র দেখলে কারা স্বাধীনতার পর দালাল আইনে জেলে ছিল, কারা ক্ষমা প্রার্থনা করেছিল, এসব কিছু, ’৭২ সালের কাগজে পাওয়া যাবে এদের তালিকা প্রস্তুত করে কেন সরকার প্রকাশের উদ্যোগ নেন না। (দৈনিক বাংলার বাণী-৩ মার্চ ’৮৭)।

প্রকৃতপক্ষে, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক বিভাগ এবং বিশেষ বিভাগ (স্পেশাল ব্রাঞ্চ) ১৯৭২ সালের জানুয়ারী মাসে বাংলাদেশ দালাল (বিশেষ ট্রাইব্যুনাল) আইন ১৯৭২ (রাষ্ট্রপতির আদেশ নং-৮) জারী হবার পর থেকে ১৯৭৩ সালের নভেম্বর মাসে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার পূর্ব পর্যন্ত স্বাধীনতাবিরোধীদের তালিকা প্রকাশ করে। এটি ছিল প্রকৃত প্রস্তাবে দালাল আইনে অভিযুক্তদের নির্দিষ্ট তারিখে নির্দিষ্ট আদালতে হাজির হবার সরকারী নোটিশ। সরকারের এ কথা বিশ্বাস করার কারণ রয়েছে যে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বাংলাদেশ দালাল আইনের অধীনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন এবং তিনি বিচার এড়ানোর জন্য আত্মগোপন করেছেন কিংবা বিদেশে অবস্থান করছেন--নোটিশে এ কথা উল্লেখ করে আদালতে হাজিরা দেবার নির্দেশ দেওয়া ছাড়াও এই নোটিশের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির স্বনামে কিংবা বেনামে মালিকানাধীন যাবতীয় সম্পত্তিও বাজেয়াপ্ত করা হয়। বাংলাদেশ গেজেটে এই নোটিশ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল। উল্লেখ্য, নোটিশ প্রাপ্তদের অধিকাংশকে কারারুদ্ধ করা হয়েছিল। অবশিষ্টরা আত্মগোপন করেছিল কিংবা দেশত্যাগ করেছিল।

আমরা যেন স্মরণে রাখি, বিশেষ করে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে সর্বাত্মকভাবে বিকৃত করার চেষ্টা চলেছে। এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছিল যে আমাদের শিশুদের জানতে দেয়া হয়নি আমাদের জাতির পিতা কে। তারা জেনেছে একাত্তরে আমরা 'হানাদার’ বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছি। কিন্তু এই ’হানাদার’ কারা, তা তাদের জানতে দেয়া হয়নি। তাদের কেউ কেউ জেনেছে ’হানাদার বাহিনী’ হল ভারতীয় বাহিনী। রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস কারা ছিল তা তারা জানতে পারেনি। এভাবেই আমাদের কয়েক প্রজন্ম অসত্য, অর্ধসত্য ইতিহাস জেনে বড় হয়েছে। বাঙালীর হৃদয় উতসারিত  'জয়বাংলা' শ্লোগানকে  স্থানচ্যুত করে বিজাতীয় ভাষার নিরাশ্রয় শব্দের কঙ্কাল জুড়ে দিয়ে শেখানো হয়েছিল 'জয় বাংলা' দলীয় শ্লোগান। এভাবে আমাদের জাতীয় ইতিহাসের পরতে পরতে ইতিহাস বিকৃতির বিষ প্রয়োগ করা হয়েছিল। দেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রপতির পদ থেকে শুরু করে সব জায়গায়, প্রতিটি সেক্টরে স্বাধীনতা বিরোধীরা বহাল তবিয়তে জায়গা করে নিয়েছিল। আমাদের প্রশাসন যন্ত্রে, শিক্ষাঙ্গনে, মিডিয়াতে তাদের দাপটে প্রতিনিয়ত কোনঠাসা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। এই সকল ক্ষেত্র এখনো তাদের আছড়মুক্ত নয়, বরং নিজেদের আড়ালে রেখে আরও বেশী সক্রিয়ভাবে তারা তাদের কাজ করার জন্য সচেষ্ট রয়েছে। এই তাল-গোল পাকানো সাম্প্রতিক তালিকার দায়ভার মন্ত্রীকে তো নিতেই হবে, কিন্তু তার চেয়েও বড় সত্য - আমাদের চারপাশ শত্রু পরিবেষ্টিত। তাই সাধু সাবধান!


লেখক:

ড. তৌহীদ রেজা নূর, সাবেক সাধারণ সম্পাদক, প্রজন্ম '৭১