‘সাম্যের গান গাই-আমার চোখে পুরুষ-রমণী কোনো ভেদাভেদ নাই’

‘সাম্যের গান গাই-আমার চোখে পুরুষ-রমণী কোনো ভেদাভেদ নাই’, কবি নজরুলের এই অমর বাণী এই সমাজের তৃণমূলে এখনো পৌঁছাতে পারেনি। শিক্ষিত মেয়েরা যেমন বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদে মেধা ও শ্রম  দিয়ে সাহসিকতার সাথে কাজ করছেন। ঠিক সে ভাবেই গ্রামের নারীরাও সর্ব শক্তি দিয়ে পুরুষের সাথে কাঁধে কাঁধ, হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করছেন রাত দিন।

বাসা-বাড়িতে, মাঠে- ঘাটে  ও কৃষি জমিসহ সর্বত্র। পার্থক্যটা শুধু এখানেই, শহরের নারীরা কিছুটা আত্মমর্যাদা ও সম্মান পেলেও গ্রাম বাংলার নারীরা আজও অবহেলিত বিভিন্নভাবে। শহরে কিছু কিছু ক্ষেত্রে নারীরা তার প্রাপ্য মর্যাদা বুঝে নিলেও পারছেন না গ্রামীণ নারীরা। তারা বাসা-বাড়িতে কঠোর পরিশ্রম করেন সে কাজের কোন স্বীকৃতি তো মেলেই না, পান না কোন মজুরিও। উল্টো শুনতে হয় নানা অসম্মানজনক কথা।

গ্রামীণ নারী শ্রমিকদের ইতিহাস এক অবিচ্ছেদ্য আলোকবিহীন রাতের গল্প। কৃষিতে এবং বাসাবাড়িতে নারীর ভূমিকা এবং অবদান বর্ণনাতীত। অথচ গ্রামীণ নারীরা ন্যায্য মজুরি এবং সম্মান কোনটিই পান না...! সংশ্লিষ্ট  সমস্যা দুটির সাথে তার উপযুক্ত সমাধানের অভীষ্ট লক্ষ্য নিয়ে এগুতে পারলে আমরা সব কিছু নিয়ে আরো বিশাল অর্জনের দিকে এগিয়ে যেতে পারব। পারব আলোকিত সীমান্তে পৌঁছাতে। যদিও কর্মক্ষেত্রে অনেক সময় নারী শ্রমিকরা শারিরীক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন, পুরুষ শ্রমিক ও মালিকদের কাছে। তবুও আাশার বাণী হলো সেদিন আর বেশী দূরে নেই, সেই কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছতে সক্ষম হবেন গ্রামীণ নারীরা। কারণ গ্রামের নারীরা এখন প্রায় ৬০% শিক্ষিত হয়েছে। যদিও নিজের অধিকার সম্পর্কে শতভাগ অবগত নন এবং সোস্যাল পেজুডিস থেকে মুক্ত হতে পারেনি পুরোপুরি। তবুও আগের চেয়ে গ্রামীণ নারী শ্রমিকদের মধ্যে বহুগুণে সচেতনতা বেড়েছে। তাই সময় এসেছে বৈষম্যহীন নারী সমাজ প্রতিষ্ঠার

চলনবিল এলাকার গ্রামীণ নারী শ্রমিক মিনা, সেফালী, দীপা ওরাঁও, শ্যামলী রানীদের করুণ আর্তনাদের কথা জানা গেল তাদের সাথে কথা বলে। তারা তো শুধু শ্রমই বিক্রি করেন, নায্য মজুরি পান না কখনোই। পুরুষের সাথে সমান তালে কাজ করেও নানা ধরনের বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন তারা।  এভাবে অধিকার বঞ্চিত হয়ে কাজ করে গেলেও তাদের কষ্ট দেখার কেউ নাই। তাদের দাবি অনেক কাজই পুরুষ শ্রমিকের চেয়ে বেশী করে থাকেন। অথচ মজুরির ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হন এখনো।

গুরুদাসপুর উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা নিলুফা ইয়াসমিন এর ভাষ্যমতে, নারীরা কৃষির অগ্রদূত, যে নারীরা আমাদের কৃষি সমাজ এবং সংসারকে মহিমান্বিত করেছেন। জীবনের সবটুকু বিনিয়োগ করেছেন স্বামী সংসারে অথচ তাদের কষ্টগাঁথা ইতিহাস কেবলী আর্তনাদ আর অমানবিকতায় ভরা।

এক গবেষণায় দেখো গেছে, এ দেশে এখনো ৮৫ শতাংশ নারীরা উপার্জনে স্বাধীনতা পান না। মাত্র ১৫ শতাংশ নারীরা নিজের ইচ্ছায় উপার্জনের স্বাধীনতা পান। আর যারা আয় করেন তাদের প্রায় ৫০ শতাংশই নিজের আয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেই। তবে গ্রামের তুলনায় শহুরে নারীদের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা কিছুটা বেশি। দেশে ৮৫ শতাংশ নারীরা কোনো না কোনো ভাবে কহুমাত্রিক নির্যাতনের শিকার হন। তবে অল্পসংখ্যক স্বামীই বা সমাজ নারীকে উপার্জনের স্বাধীনতা দেন। সেসব স্বামীর ৯৩.১৯ শতাংশ-ই স্ত্রীর উপার্জন করার বিষয়টিকে ভালো চোখে দেখেন না। আমাদের নারীরা বাড়তি সেবা দেওয়ার জন্য ব্যস্ত থাকেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা, দিনের পর দিন, মাস পেরিয়ে বছর এমন কি আজীবন আমরণ। অথচ আমরা কি করছি, তাদের প্রাপ্য মর্যাদা টুকুও দিতে র্ব্যাথ হয়েছি। আমাদের  মানসিকতা  বদলাতে হবে; পুষ্টিতে তুষ্টিতে যুক্তিতে নারীর পাওনা অধিকারকে সমানভাবে প্রাপ্যতা অনুযায়ী সুনিশ্চিত করতে হবে; নারীকেই শিক্ষা প্রশিক্ষণ দিয়ে আরো দক্ষ করে তুলতে হবে। নারী বলে কোনো রকম বৈষম্য অবহেলা করা চলবে না। নারীর আইনগত অধিকার, বিনিয়োগী অধিকার, অবদানের স্বীকৃতি যথাযথভাবে দিতে হবে।

আমরা সবাই যদি সচেতন হই তাহলে অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারব এতে কোনো সন্দেহ নেই। প্রয়োজন শুধু আইন নীতিমালা প্রণয়ণ ও বাস্তবায়ন করা। আমাদের জাতীয় কবির সাথে একমত হয়ে বলি সেদিন সুদূর নয়-যেদিন ধরণী পুরুষের সাথে গাহিবে নারীরাও বিজয়ের গান।

মো.মাজেম আলী মলিন

বিভাগীয় প্রধান (স.বি) বিভাগ, রোজী মোজাম্মেল মহিলা অনার্স কলেজ, সভাপতি গুরুদাসপুর মডেল প্রেসক্লাব, নাটোর।