শিক্ষকদের অভুক্ত রেখে কী মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব ?

দ্বীপ শিখার মতো জ্বলছেন-পুড়ছেন। আলোও ছড়াচ্ছেন। সেই আলোয় আলোকিত হচ্ছে জাতি। নিজেদের জ্বালিয়ে শিক্ষার পারদ ছড়িয়ে দিচ্ছেন অবিরাম। নিরন্তর আলো ছড়ানো এসব মানুষ-ই কিনা বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন সমান তালে। এসব শিক্ষার কারিগরকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে ঘোর অমানিশার দিকে। আক্ষরিক অর্থে সর্বোচ্চ মর্যাদা দেওয়া অনার্স-মাস্টার্স কোর্সের শিক্ষকরা সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন পথের পথযাত্রী।

দেশজুড়ে বহু শিক্ষক আছেন যারা কাগজে কলমে শিক্ষক উপাধী পেলেও তাদের বাস্তবতা ভিন্ন। দিনের পর দিন না খেয়ে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন নিজের প্রাপ্যতা টুকু পাওয়ার প্রত্যাশায়। অথচ তাদের প্রাপ্য মর্যাদার জন্য বছরের পর বছর শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন ঠিকই কিন্তু বিনিময়ে পাচ্ছেন শুধুই বঞ্চনা আর অসম্মান। শত বঞ্চনা আর কষ্ট সহ্য করে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ থেকে ডিগ্রি নিয়ে আশায় বুক বেঁধে ছিলেন কখন আসবে সেই মহেন্দ্রক্ষণ। কিন্তু সরকারি চাকরির বয়স না থাকায় বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতেই বেছে নিয়েছেন দেশের বিভিন্ন কলেজের অনার্স-মাস্টার্স কোর্সের প্রভাষকের চাকরি। অথচ বিধি বাম, সরকারি নীতিমালার কারণে সম্মানি বঞ্চিত হচ্ছেন এ সকল শিক্ষকগণ। নিজের খেয়ে নিজের পড়ে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করছেন হাজারো শিক্ষার্থীদের, শুধু একটু সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার আশায়।

বেঁচে থাকার জন্য কাজ  প্রয়োজন। কাজ না পেলে অর্থ পাওয়া যাবে না এটাই স্বাভাবিক। অথচ কাজ আছে সম্মানি নেই এর চেয়ে বড় কষ্ট আর কি হতে পারে। বিষয়টি নিয়ে কম-বেশি আলোচনা হয়েছে। তবুও মনে হয় দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠী এখনও তা জানেন না। খোদ রাষ্ট্র পরিচালনাকারী নীতিনির্ধারকদের অনেকেই বিষয়টি ভাবেন বলে মনে হয় না। আর এ বিষয়টি হলো জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ৭৮৮টি অনার্স কলেজের প্রায় চার হাজার পাঠদানকারী শিক্ষকদের বোবা কাঁন্না আর চাঁপা কষ্টের কথা। অথচ সরকার বাংলাদেশের প্রতিটি উপজেলায় কমবেশী অনার্স মাস্টার্স কোর্স চালু করেছেন।

১৮ জানুয়ারি এক দৈনিকে  প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়। প্রতিবেদনটিতে আরো জানা যায়, যথাযথ প্রক্রিয়ায় নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকগণ নিয়মিত কলেজে উপস্থিত থেকে পাঠদান করলেও সরকারের তহবিল হতে একটি টাকাও পাচ্ছেন না, কিছু সৃষ্টি করা নিয়মনীতির গ্যাড়াকলে পড়ে। এতে অনার্স-মাস্টার্সের শিক্ষকরা  সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হওয়ার পাশাপাশি আর্থিকভাবেও হচ্ছেন বঞ্চিত।

নিজ নিজ কলেজ হতে নিয়োগকৃত অনার্সের শিক্ষকদের শতভাগ বেতন ভাতা দেয়ার কথা থাকলেও (জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি মোতাবেক) অধিকাংশ কলেজ শিক্ষকদের কিছুই দিচ্ছেন না। হাতে গোনা কিছু প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা নিয়মিত বেতন-ভাতা পাচ্ছেন। কিছু কলেজের শিক্ষকরা মাসিক তিন থেকে চার হাজার টাকা পেলেও বেশীর ভাগ কলেজের শিক্ষকরাতো কোন টাকাই পান না। অথচ একজন পোশাক শ্রমিকও মাসে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা বেতন পেয়ে থাকেন।

অনার্স শিক্ষকদের বঞ্চনার বিষয়টি শুধু অমানবিক নয় অনৈতিকও। শতভাগ বেতন-ভাতা দেওয়ার লিখিত প্রতিশ্রুতি দিয়েও  কলেজগুলো তা দিচ্ছে না। এ ব্যাপারে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নেই কোন তদারকি। চাকরি হারানোর ভয়ে শিক্ষকরা বেতন না পেয়েও মুখ খুলছেন না। প্রকৃত পক্ষে শিক্ষকরা চাকরি রক্ষার্থে ও সামাজিক মর্যাদার কথা ভেবে না পারছেন কইতে না পারছেন সইতে। তাই প্রয়োজনের তাগিদেই অনার্সের শিক্ষকরা গঠন করেছেন একাধিক নন-এমপিও অনার্স শিক্ষক সমিতি। ইতোমধ্যে সংগঠনের ব্যানারে তারা শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরে স্মারকলিপি জমা দিয়েছেন। আবার অনেকেই রিট পিটিশনও করেছেন, করেছেন সাংবাদিক সম্মেলনও। অনেকে আবার সরব রয়েছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও। তবুও মনে হচ্ছে এতে কারোই কিছু যায় আসে না। এর মধ্যে “আমার প্রাণের সংগঠন বাংলাদেশ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি” (বাকবিশিস) প্রথম নন এমপিও অনার্স-মাস্টার্স শিক্ষকদের এমপিওভুক্তির দাবি তুলেন।

অথচ উচ্চশিক্ষা বিস্তারে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ব্যাপক কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। কিন্তু শিক্ষা বিস্তরণ কার্যক্রমের মূল চালিকাশক্তি শিক্ষকদের অভুক্ত ও হতাশায় রেখে কীভাবে মানসম্পন্ন উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব সেটি বোধ গম্য নয়। গত ১০ বছরে শিক্ষাসহ দেশের বিভিন্ন সেক্টরের ব্যপক উন্নয়ন হয়েছে। তবে শিক্ষক সংগঠন ও শিক্ষাবীদদের প্রস্তাব অনুযায়ী শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ বাড়ছে না। কাজেই শিক্ষা খাতে বাজেট বৃদ্ধি করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষায় মান বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এজন্য অনার্স-মাস্টার্স কোর্সে পাঠদানরত নন-এমপিও শিক্ষকদের দ্রুত এমপিওভুক্তির উদ্যোগ নেয়ার কোন বিকল্প নেই। তানা হলে সফল হবে না জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষা প্রসারের উদ্যোগ। ব্যর্থ হবে মধ্যম আয়ে উন্নত দেশ হবার তকমাও।

মো.মাজেম আলী মলিন,

বিভাগীয় প্রধান সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, রোজী মোজাম্মেল মহিলা অনার্স কলেজ ও সভাপতি গুরুদাসপুর মডেল প্রেসক্লাব।