মুজিববর্ষে আমাদের শপথ

রাস্তার পাশে গলির মুখে এক বৃদ্ধ ফকির শীতে কাঁপছে আর কাঁদতে কাঁদতে ভিক্ষা চাইছে। বৃদ্ধের শীর্ণ খালি গায়ের হাড়গুলো স্পষ্ট গোনা যায়। দূর থেকে লোকজন কেউ দাঁড়িয়ে দেখছে, কেউবা দু’এক পয়সা দিয়ে চলে যাচ্ছে। খোকাও বন্ধুদের নিয়ে একবার দাঁড়ায়, এক মুর্হূতের মধ্যে নিজের চাদরটা বৃদ্ধের গায়ে জড়িয়ে দেয়। তারপর দ্রুতপায়ে বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করে, একবারের জন্যও পিছনে ফেরে না। বৃদ্ধ ফকির অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে আর ভাঙ্গা অস্পষ্ট উচ্চারণে বলে যায়, ‘বড় হও বাবা, আল্লাহ তোমারে বাঁচায় রাখুক। তুমি অনেক বড় হও, রাজা হও।'  

বাঙালির হৃদয় জয় করে রাজা তিনি ঠিকই হয়েছেন এবং এখনো তাঁর আর্দশ এখনো বাঙালির হৃদয়রাজ্যে রাজত্ব করছে। সেই খোকা আর কেউ নয়, বাঙালির ইতিহাসের হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ সন্তান, বাঙালি জাগরণের মহান জাদুকর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেই জনদরদী খোকা মানুষের মুক্তির জন্য আজীবন লড়াই সংগ্রাম করে গেছেন। (১৭ মার্চ ১৯২০ - ১৫ আগস্ট ১৯৭৫) ৫৪ বছর বয়সের জীবনে বঙ্গবন্ধু ৪ হাজার ৬৮২ দিন কারাগারে ছিলেন, যা তার মোট জীবনের সিকিভাগ। ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রাম দিয়ে শুরু। পরবর্তীতে বাঙালির ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকাও অসীম এবং গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে এক অনন্য অবিস্মরণীয় দিন। এই দিনে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সর্বাত্মক সাধারণ ধর্মঘট পালিত হয়। এটাই ছিল ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে তথা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর এ দেশে প্রথম সফল হরতাল। এই হরতালে শেখ মুজিব নেতৃত্ব প্রদান করেন এবং পুলিশি নির্যাতনের শিকার হয়ে গ্রেফতার হন। বাঙালি জাগরণের এই মহাজাদুকর বাংলাদেশের স্বাধীনতা আনা পর্যন্ত সারাজীবনের এক-চতুর্থাংশ সময় কারাগারেই কাটতে হয়েছিল জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। বাঙালির মুক্তির জন্য এত বড় আত্মত্যাগ আর কেউ করেনি।
বড় মেয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আফসোস করে প্রায়ই বলেন, 'কারাগারে থাকার কারণে তার ছোট ভাই-বোনরা বাবার সংস্পর্শ খুব কমই পেয়েছিল।'   

ভাই শেখ কামালের একটি ঘটনা বড় বোন শেখ হাসিনা লিখেছেনও। তার ভাষায়, “শেখ কামাল আব্বাকে কখনো দেখে নাই, চেনেও না। আমি যখন বারবার আব্বার কাছে ছুটে যাচ্ছি, আব্বা আব্বা বলে ডাকছি ও শুধু অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখছে…ও হঠাৎ আমায় জিজ্ঞেস করল, হাসু আপা, তোমার আব্বাকে আমি একটু আব্বা বলে ডাকি।”
 
যে মহান নেতা পরিবার পরিজনকে বঞ্চিত করে সারা জীবন বাঙালির অধিকার আদায়ের মিছিলে নেতৃত্ব দিয়েছেন, বাঙালির সকল আন্দোলোন সংগ্রাম- জাগরণের বাতিঘর হয়ে লড়াই করেছেন, টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া ছুটে চলেছেন, অকুতোভয়ে হাজার বছরের পরাধীনতার জাল ছিন্ন করতে মহান মুক্তিযুদ্ধের জন্য বাঙালিদের তৈরি করেছেন- তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি ছিলেন তার কর্মীদের প্রাণের মুজিব ভাই। সেই ৭ মার্চ ১৯৭১ এর ভাষণ আজ বিশ্ব ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ দলিলে পরিণত হয়েছে। যে ভাষণে ৭ কোটি বাঙালির মুক্তির কথা উঠে এসেছে মহাকাব্যিক ব্যঞ্জনায়।

রেসকোর্সের উত্তাল জনসমুদ্রে তিনি ঘোষণা করলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম…, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ তার আপসহীন সাহসী নেতৃত্বে বাঙালি পেছে স্বাধীনতা। তারই উদাত্ত আহ্বানে মহান মুক্তিযুদ্ধে ত্রিশ লাখ বীর বাঙালি জীবন বিলিয়ে দিতে দ্বিধা করেনি। বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে ৯ মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী হয়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় ছিনিয়ে আনে বাঙালি জাতি। এই বিজয়ের মধ্যদিয়ে বিশ্ব মানচিত্রে জন্ম নেয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। তারই নেতৃত্বে বিজয়ী জাতি সেই মহানায়ক সর্বকালের সেরা বাঙালির জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন করতে যাচ্ছে মহাসমারোহে। নানা আয়োজনের মাধ্যমে পুরো বাঙালি তাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীর ক্ষণগণনা শুরু করেছে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রত্যাবর্তনের স্থান তেজগাঁওয়ের পুরাতন বিমানবন্দরে জন্মশতবার্ষিকীর ক্ষণগণনা শুরু হয়েছে। করাচির কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি লন্ডন থেকে দিল্লি হয়ে দেশে ফেরেন বঙ্গবন্ধু।  
 
সেদিন বিকেলে উড়োজাহাজ থেকে বঙ্গবন্ধু নামার পর পূর্ণতা পেয়েছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা। ঐতিহাসিক সেই স্থানে এবং একই সময়ে শুক্রবার চালু হয় ক্ষণগণনা। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই ক্ষণগণনা অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুকে আলোক রশ্মির মাধ্যমে যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে সেটি বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অনেককে হতাশ ও ব্যথিত করেছে।

কিছুদিন আগে খবরে দেখলাম আমেরিকায় বঙ্গবন্ধুর শতবর্ষ উদযাপন উপলক্ষে বইমেলার আহ্বায়ক করা হয়েছে এক রাজাকার সন্তানকে, যিনি খুনি মোস্তাককে নিয়ে 'রাজার দর্শন' নামে একখানা বই লিখেছেন। এই বিষয় নিয়ে গণজাগরণ মঞ্চের অন্যতম সংগঠক আল আমিন বাবুর তাৎক্ষণিক প্রতিবাদের ভিডিওটি সোসাল মিডিয়াতে ছড়িয়ে পড়ে  আমাদের শঙ্কা হয় এমন বিতর্কিত ভিন্ন আদর্শের লোকজনদের নিয়ে মুজিববর্ষ উদযাপন করলে জাতির পিতাকে আরো বিকৃতিভাবে উপস্থাপন করা হয় কিনা। আমরা দেখি দেশের বিভিন্ন স্থানে জাতির পিতার ভাস্কর্যও সঠিকভাবে নিয়মকানুন মেনে করা হচ্ছে না। এদিকে বিশেষভাবে নজর দেয়া প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে, সম্মান জানাতে গিয়ে ভুলভাল উপস্থাপনের ফলে কেউ হাসি ঠাট্টা করলে বঙ্গবন্ধুর আদর্শিক সন্তানদের বুকে রক্তক্ষরণ হয়। এ কমিটির মূল লক্ষ্য হবে, জাতির পিতার জীবন সংগ্রাম ও দর্শনকে আগামী প্রজন্মসহ সারা বিশ্বের কাছে সঠিকভাবে তুলে ধরা। বঙ্গবন্ধুর নামে বিপিএল এর উদ্বোধনি অনুষ্ঠানের মত আমাদের সংস্কৃতির ঐতিহ্য উপেক্ষা করে ভিনদেশি নর্তকীর নাচে গানে ঝংকৃত কোন আয়োজন আমরা দেখতে চাইনা।  

আমরা জানি, বঙ্গবন্ধুর গোটা জীবন কেটেছে আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। তিনি ছিলেন সাধারণ মানুষের নেতা, খেটে খাওয়া মানুষের মুজিব ভাই – শেখের বেটা। একজন ছাত্রনেতা, সফল রাজনীতিবিদ ও রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তিনি ছিলেন অতুলনীয়। মানুষের আস্থা অর্জন করার মতো মহৎ গুণের অধিকারী ছিলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি সব সময় একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতেন, যেখানে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান একত্রে বসবাস করবে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে। তার মানবমুক্তির দর্শনে বিমুগ্ধ ও বিমোহিত হয়েছেন বিশ্বনেতারা। তিনি ছিলেন বিশ্বমানবতার প্রতীক। নিজ দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে সারাবিশ্বের শোষিত মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিলেন বঙ্গবন্ধু। তাই জন্মশত বার্ষিকীর মহেন্দ্রক্ষনে আসুন জাতির পিতার আদর্শ, চিন্তা ও মানুষের জন্য আজীবনের লড়াই সংগ্রামের ইতিহাস  ছড়িয়ে দেই সবখানে। ছড়িয়ে দেই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে জাতির পিতার মানবমুক্তির দর্শন।  

যে দর্শন পাকিস্তানী মতাদর্শের প্রেতাত্মারা থামিয়ে দিতে চেয়েছিল, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ইতিহাসের কালোরাতে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে। সেদিন ধানমণ্ডির বাসভবনে বঙ্গবন্ধুকে যখন সপরিবারে হত্যা করা হয়, ঘাতকরা শুধু বঙ্গবন্ধুকেই হত্যা করেনি। তাদের হাতে একে একে নির্মমভাবে প্রাণ হারিয়েছেন বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, বঙ্গবন্ধুর সন্তান শেখ কামাল, শেখ জামাল ও ১০ বছরের শিশু শেখ রাসেলসহ পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রোজি জামালসহ অনেকে। সেদিনের সেই ভয়াল বীভৎসতা স্মৃতিতে আনলে পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট খুনিও বোধ হয় আঁতকে উঠবে।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বঙ্গবন্ধুর বাসভবনসহ তিনটি বাড়িতে সংঘটিত খুনিদের নারকীয় পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞের ভয়াল বীভৎসতার হৃদয়স্পর্শী বর্ণনা দিয়েছিলেন সেনাবাহিনীর তৎকালীন মেজর আলাউদ্দিন আহমেদ পিএসসি। “কী বীভৎসতা! রক্ত, মগজ ও হাড়ের গুঁড়ো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল প্রতিটি তলার দেয়াল, জানালার কাঁচ, মেঝে ও ছাদে। রীতিমত রক্তগঙ্গা বইছে যেন ওই বাড়িতে। গুলির আঘাতে দেয়ালগুলোও ঝাঁঝরা হয়ে গেছে। চারপাশে রক্তের সাগরের মধ্যে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল ঘরের জিনিসপত্র। প্রথম তলার সিঁড়ির মাঝখানে নিথর পড়ে আছেন ঘাতকের বুলেটে ঝাঁঝরা হওয়া চেক লুঙ্গি ও সাদা পাঞ্জাবি পরা স্বাধীনতার মহানায়ক বঙ্গবন্ধু লাশ হয়ে। তলপেট ও বুক ছিল বুলেটে ঝাঁঝরা। নিথর দেহের পাশেই তার ভাঙা চশমা ও অতিপ্রিয় তামাকের পাইপটি। অভ্যর্থনা কক্ষে শেখ কামাল, টেলিফোন অপারেটর, মূল বেডরুমের সামনে বেগম মুজিব, বেডরুমে সুলতানা কামাল, শেখ জামাল, রোজি জামাল, নিচতলার সিঁড়িসংলগ্ন বাথরুমে শেখ নাসের এবং মূল বেডরুমে দুই ভাবির ঠিক মাঝখানে বুলেটে ক্ষতবিক্ষত রক্তাক্ত অবস্থায় পড়েছিল ছোট্ট শিশু শেখ রাসেলের লাশ।” এভাবেই ভয়াল ও নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞের বর্ণনা দেন তিনি।

প্রিয় প্রজন্ম,আজ যখন জাতীয়ভাবে বছরব্যাপী বাংলাদেশের মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করতে, বরণ করতে সমগ্র জাতি প্রস্তুত, ঠিক তখন সঙ্গত কারণেই নবীন প্রজন্মকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই- নিজের জীবনের চেয়েও দেশ আর দেশের মানুষকে যিনি ভালোবেসে ছিলেন, ফাঁসি নিশ্চিত জেনেও যিনি পাকিস্তানের কারাগারে বসে আপোস করেননি স্বাধীনতার প্রশ্নে, যিনি বারবার জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বলেছিলেন, এ দেশের স্বাধীনতা আর জনসাধারণের আর্থ-সামাজিক মুক্তির কথা, এ জাতি তারই উত্তরসূরি। যিনি ১৫ আগস্ট কালরাতে ঘাতকদের মেশিনগানের মুখেও ছিলেন অকুতোভয়, প্রশ্ন করেছিলেন, ‘তোরা কী চাস? কোথায় নিয়ে যাবি আমাকে?- বাঙালি জাগরণের এই মহাজাদুকরের দৈহিক বিনাশ ঘটলেও তার আদর্শের মৃত্যু হতে পারে না। মানুষ মরে যায়, আদর্শ মরে না। তাই বঙ্গবন্ধু কোন ব্যক্তিমাত্র নন, অবিনশ্বর এক আদর্শ ও প্রেরণার নাম। সেই প্রেরণাতেই এগিয়ে যাবো আমরা। বাঙালির সর্বকালের শ্রেষ্ঠ সন্তান জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের মানবমুক্তির দর্শনে বলীয়ান হয়ে গড়বো প্রাণের স্বদেশ। তাই হোক মুজিববর্ষের শপথ। জয় বাংলা।

লেখক: এফ এম শাহীন

সম্পাদক, ডেইলি জাগরণ ডট কম, সাধারণ সম্পাদক, গৌরব ’৭১, সংগঠক, গণজাগরণ মঞ্চ।