মানুষ কি মানবিক হবে না?

জামালপুরে ৫০৪ বস্তা চাল উদ্ধার, আওয়ামী লীগ সহ-সভাপতি আটক (বাংলাদেশ প্রতিদিন)। 

নওগাঁয় আওয়ামী লীগ নেতার বাড়ি থেকে ৫৫০০ কেজি চাল উদ্ধার (ডিবিসি নিউজ)।

বগুড়ায় আওয়ামী লীগ নেতার হেফাজতে ২১২ বস্তা চাল উদ্ধার (জাগো নিউজ)।

রংপুরে বাবুপাড়ায় চাল, পেঁয়াজ, মসুর ডাল ও তেল আটক (যমুনা টিভি)।

পীরগঞ্জে ৯০ বস্তা চালসহ আটক ২ (বিবার্তা২৪ডটনেট)।

আওয়ামী লীগ নেতার বাড়ি থেকে ১৩৮ বস্তা চাল উদ্ধার (৭১ টিভি)।

সিলেট ওয়ার্ড কাউন্সিলরের বাসা থেকে ১২৫ বস্তা চাল উদ্ধার (একুশে জার্নাল)।

মেলান্দহ থেকে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ৩০ বস্তা চাল উদ্ধার (বিবার্তা২৪ডটনেট)।

ভাঙারির দোকানে মিলল আওয়ামী লীগ নেতার ছেলের রাখা ৯০ বস্তা চাল (বাংলাদেশ প্রতিদিন)।

বড়লেখায় ৩২ বস্তা চাল জব্দ (ইত্তেফাক)।

সিরাজগঞ্জে ৬৫ বস্তা সরকারি চালসহ আটক ৩ (বিবার্তা২৪ডটনেট)।

যশোর চৌগাছায় ১০ টাকা কেজির ৫৮ বস্তা চাল উদ্ধার (যুগান্তর)।

দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে সরকারি চাল জব্দ (ভোরের বার্তা)।

চট্টগ্রাম ত্রাণের চাল খেয়ে ফেলেছেন চেয়ারম্যান (মানবজমিন)।

শরনখোলায় সরকারি ১৮ বস্তা চালসহ আওয়ামী লীগ নেতা আটক (মানবজমিন)।

কিশোরগঞ্জে ত্রাণের তালিকায় নাম তুলতে টাকা আদায়। (সময় নিউজ)।

বরিশাল সরকারি অফিস থেকে চাল উদ্ধার (বিডি বুলেটিন)।

নবীগঞ্জে ত্রাণ বিতরণের অনিয়ম তুলে ধরায় সাংবাদিক পেটালেন চেয়ারম্যান (দেশ রূপান্তর)।

ময়মনসিংহ ত্রিশালে ১৬ বস্তা চাল উদ্ধার (নতুন বার্তা)।

ঝালকাটিতে ২৫০০ বস্তা চাল উদ্ধার (প্রথম আলো)।

যশোর মনিরামপুরে ৫৪৯ বস্তা চাল উদ্ধার (সময় নিউজ)।

ঠাকুরগাঁওয়ে ৬৩০ বস্তা চাল জব্দ; ৪ গুদাম সিলগালা (বাংলাদেশ প্রতিদিন)।

গত কয়েকদিন ধরে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের সামান্য অংশ এটি। এই শিরোনামগুলো পড়ে পাঠকের মনে হতেই পারে - দেশে বুঝি চাল চুরির প্রতিযোগিতা চলছে ! এর থেকে পরিত্রাণের উপায় কি? মানুষ কি খাবারের অভাবে মরবে?

করোনাজনিত লকডাউন পরিস্থিতিতে দিন আনে দিন খায় মানুষসহ যারা কর্মহীন হয়ে খাদ্য সংকটে আছেন এমন ৭৫ লাখ পরিবার অর্থাৎ ৩ কোটি মানুষকে খাদ্য সহায়তা দেয়ার জন্য সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে সেটা অবশ্যই প্রশংসনীয়। প্রধানমন্ত্রীর বার বার হুশিয়ারি সত্ত্বেও খাদ্য ত্রাণ সহায়তা প্রার্থীদের তালিকা প্রণয়নে বহুক্ষেত্রেই সমন্বয়হীনতা-দুর্নীতি-স্বজনপ্রীতি-দলবাজী-দলীয়করণ করা হচ্ছে। যাদের সাহায়্য দরকার নেই তাদের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আবার যাদের নাম তালিকায় আছে তারা সাহায্য পায়নি। আবার কেউ কেউ একাধিকবার নিয়েছে। কেউ কেউ একবারও পায়নি। স্বজনপ্রীতি ও দলবাজী এমন জঘন্য পর্যায়ে পৌঁছেছে যে খোদ সরকার দলীয় সাধারণ কর্মীও নিরুপায় অসহায়। প্রকৃত খাদ্য ত্রাণ প্রার্থীদের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত না করে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা তাদের ব্যক্তিগত পছন্দের লোকদের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করছে ; যাদের কোন সাহায্যের দরকারই নেই।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী ৭৫ লাখ পরিবারকে তালিকাভূক্ত করার কথা সেখানে এখন পর্যন্ত  ৩৯ লাখ ৭৫ হাজার পরিবারকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এখনও ৪৫ লাখ ২৫ হাজার পরিবারের তালিকা তৈরিই হয়নি।

সহায়তা প্রার্থীদের তালিকা প্রণয়ন ও বিতরণে যে সমন্বয়হীনতা-দুর্নীতি-দলীয়করণ-স্বজনপ্রীতি-দলবাজী হয়েছে তা দূর করে প্রকৃত অভাবী সহায়তাপ্রার্থীদের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা জন্য সরকার ও প্রশাসনকে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। একইসাথে লকডাউন পরিস্থিতি বিবেচনা করে সরকার ঘোষিত ৭৫ লাখ পরিবার অর্থাৎ ৩কোটি মানুষকে খাদ্যসহায়তা প্রদানের কর্মসূচি সম্পসারিত করে আরও ৭৫ লাখ পরিবার অর্থাৎ আরও ৩ কোটি সর্বমোট ১কোটি ৫০ লাখ পরিবার অর্থাৎ ৬ কোটি মানুষকে খাদ্যসহায়তা কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত যত দ্রুত সম্ভব।

সুষ্ঠু ও নির্ভুল তালিকা প্রণয়নের জন্য গ্রাম বা শহরে একটি ওয়ার্ডকে একটি ইউনিট ধরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির সাথে, ইউএনও বা ডিসির একজন প্রতিনিধি হিসাবে ১জন সরকারি কর্মকর্তা, ১জন মাধ্যমিক স্কুল শিক্ষক, ১ জন কলেজ শিক্ষক, ঐ ওয়ার্ডে বসবাসকারী ১ জন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী বা কর্মকর্তা, ১ জন অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্য, সরকারি কমিউনিটি ক্লিনিকের দায়িত্বপ্রাপ্ত ১ জন কর্মচারী, ১ জন রেজিস্টার্ড পল্লী চিকিৎসক, ১জন পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শককে সদস্য করে ত্রাণ কমিটি গঠণ করতে হবে। এই কমিটির তত্ত্বাবধানে গ্রামপুলিশ, চৌকিদার, স্বেচ্ছাসেবী যুবক নিয়ে স্বেচ্ছাসেবক টিম গঠনও করতে হবে। কারণ লকডাউন ও  সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা কার্যকর রেখে জনসমাগম ও সংক্রমণ বিস্তারের ঝুঁকি এড়িয়ে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করতে স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে  বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেয়ার পদ্ধতি চালু করতে হবে। খাদ্যত্রাণ সহায়তাপ্রার্থীদের নাম, মোবাইল নাম্বার, বিকাশ/নগদ/রকেট নাম্বারসহ নির্ভুল ও সঠিক তালিকা প্রণয়ন করে ডাটাবেজ তৈরি করতে হবে। যেন প্রয়োজনে খাদ্য দেয়ার বদলে সমপরিমান টাকা তালিকাভুক্ত মানুষদের কাছে সরাসরি পৌঁছে দেয়ার পদ্ধতি নিয়েও সরকার এগুতে পারে।

তবে আশার কথা হচ্ছে গতকাল ত্রাণ বিতরণে অনিয়মে জড়িয়ে পড়া জনপ্রতিনিধি এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনিয়ম-দুর্নীতির তথ্য-প্রমাণসহ প্রতিবেদন স্থানীয় সরকার বিভাগে পাঠাতে জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) নির্দেশ দিয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ।

ডিসিদের পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের কারণে শহর ও গ্রামে বিপুল সংখ্যক মানুষের আয়-রোজগারের পথ বন্ধ হয়ে পড়েছে।

‘উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সকল ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের খাদ্য সহায়তা হিসেবে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, দপ্তর, সংস্থা এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো নিজস্ব অর্থায়নে ত্রাণ কার্যক্রম যেমন, চাল, নগদ অর্থ, শিশু খাদ্য ও অন্যান্য সামগ্রী বিতরণ করছে।’

চিঠিতে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুসারে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরাদের সঙ্গে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের জনপ্রতিনিধিদেরও তৃণমূল পর্যায়ে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ কাজে সরাসরি সম্পৃক্ত করা হয়েছে।

‘কিন্তু বিভিন্ন সামজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং পত্রপত্রিকার মাধ্যমে জানা যায় কোথাও কোথাও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের জনপ্রতিনিধি এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ত্রাণ বিতরণে অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছেন।’

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় বলছে, ‘এরূপ অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িত জনপ্রতিনিধি ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাময়িক বরখাস্তকরণ, তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারী মামলা রুজুসহ কঠের আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকদের অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণসহ প্রতিবেদন তাৎক্ষণিকভাবে স্থানীয় সরকার বিভাগে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র এবং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদেরও এই চিঠির অনুলিপি পাঠানো হয়েছে।

এখন দেখার বিষয় ব্যাপারটা শুধু চিঠি চালাচালির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে নাকি কোন কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়!

শুরু হয়েছে প্রকৃতির প্রতিশোধ। মানুষ তার বাড়াবাড়ির চূড়ান্ত স্তরে পৌঁছে গেছে। কোটি কোটি জীবের আবাসস্থল এই পৃথিবীকে মানুষ শুধু তাদের নিজেদের প্রয়োজনে গ্রাস করেছে, দখল করেছে অনান্য জীবন্ত প্রাণীর আবাস। উজাড় করেছে অরণ্য আর নীড়হারা হয়েছে কোটি কোটি প্রাণ। মানুষ তার জীবন ধারণ করার জন্য প্রতিদিন কত কোটি জীব হত্যা করে তার হিসেব কোনদিন করিনি আমরা। কেন করতে যাবো, যেখানে মানুষই তার স্বজাতি মানুষকে হত্যা করছে ভূমির জন্য, খাবারের জন্য, বিশ্বাসের জন্য। হত্যা করছে সভ্যতার জন্য, হত্যা করেছে ক্ষমতা, লোভ, মোহ ও ভোগ উপভোগের জন্য। সেখানে আমরা ভুলে গেছি এই প্রকৃতির দানে সমগ্র প্রাণ বেঁচে আছে ছোট্ট এই গ্রহে। বায়ু, জল আর ভূমির আদি দানের কথা ভুলে আমরা ছুটছি ভিনগ্রহে ঠাঁই হয় কিনা। আমরা ভুলে গেছি প্রকৃতি স্থবির নয়, সে সজীব। এমনকি প্রতিটি বৃক্ষ অনুভূতিপ্রবণ, আঘাতে সে ন্যুব্জ হয়, ভালোবাসায় উৎফুল্ল হয়।

প্রকৃতি তার প্রাণ এবং সজীবতা ফিরে পেতে শুরু করেছে।

মানুষ কি মানবিক হবে না? এই মহাদুর্যোগেও স্বার্থপরতায় মত্ত থাকবে! আইন শাসন বিচার শাস্তি এসবের চেয়েও বড় আদালত হচ্ছে মানুষের বিবেক। ক্ষমতাবানদের বিবেক কি ঘুমিয়েই থাকবে?


লেখক:

বাণী ইয়াসমিন হাসি

সম্পাদক, বিবার্তা২৪ডটনেট।