'আমাদের ডাক্তাররা লড়তে জানে, প্রয়োজন সহযোগিতা'

একজন ডাক্তার তার সারাজীবনে যা পড়েন আমরা কেউ অতো পড়ি না। চার বছরে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে কেউ লাখখানেক টাকার চাকরি পায়, আর এর চেয়ে বেশি পরিশ্রম করা কাউকে আমরা এক্সপেক্ট করি প্রত্যন্ত গ্রামে গিয়ে খালি হাতে সব রোগী বাঁচাবে। না পারলে মারও খাবে। আবার মিষ্টি করে কথাও বলবে।

নিজেদের কোনো স্বাস্থ্য সচেতনতা নেই, ফার্মেসি থেকে এন্টিবায়োটিক কিনে খাওয়া লোকজন চারদিকে, এর পর ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া শরীরের সব দায়ভার ডাক্তারের। খারাপ ব্যবহার করা ডাক্তারের কথা বলেন, প্রতিবাদ করেন। অনেকের স্বভাবই রুক্ষ, এরপরও যদি দেখেন তার চেম্বারের বাইরে লাইন, তার মানে নিজের কাজটা উনি জানেন। একই সাথে স্বীকার করেন, অগুনতি ভালো ডাক্তারের জন্যই এখনো এই দেশে মানুষ চিকিৎসা পায়, সবার তো আর বিদেশ যাওয়ার সামর্থ্য নেই।

উন্নত স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া দেশগুলো করোনা সংকট মোকাবেলায় হিমশিম খাচ্ছে৷ সেখানে নাজুক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বাংলাদেশে ‘যত দোষ নন্দ ঘোষ’ এর মত চিকিৎসদের উপর সব দোষ চাপানো হচ্ছে বলে মত সরকারি-বেসরকারি চিকিৎসকদের৷

কোভিড-১৯ মহামারী বিশ্ব জুড়ে যে আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে তাতে দেবদূত এখন স্বাস্থ্যকর্মীরাই৷ সারা বিশ্বেই স্বাস্থ্যকর্মীরা প্রাণপণ করে এই মহামারীর বিরুদ্ধে লড়াই করে যাচ্ছেন৷ করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করতে করতে প্রাণ দিয়ে দেওয়া ডাক্তার-নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থকর্মীর সংখ্যাও নেহাত কম নয়৷

কিন্তু বাংলাদেশে এই চিকিৎসকদের উপরই উঠছে অভিযোগের আঙুল৷ সারাদেশ থেকে বিনা চিকিৎসার মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া যাচ্ছে৷  সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মানুষ ডাক্তারদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন৷

অন্যদিকে চিকিৎসকেরা বলছেন, এখন তাদের ‘বলির পাঁঠা’ বানানো হচ্ছে৷ শুরু থেকেই কোভিড-১৯ প্রতিরোধে চরম অব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়হীনতার কারণেই আজ পরিস্থিতি এত সংকটজনক অবস্থায় উপনীত হয়েছে৷

দরিদ্র দেশ বলে আমরা সঠিক সময়ে সঠিক কাজটা করতে পারি না। উন্নত দেশের মতো আমাদের অবকাঠামো উন্নত নয়, বেশ দুর্বল। ফলে স্বাস্থ্য আমাদের অনেক দুর্বল রয়ে গেছে। স্বাস্থ্য সেক্টরের দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত এবং মেরামত করে একটি দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা করার এখনই সময়। চীন, ইটালির মতো উন্নত চিকিৎসা আমরা হয়তো দিতে পারব না। কিন্তু তাদের মতো নিজেদের গড়ে নেয়ার পরিকল্পনা করতে পারব এবং তা বাস্তবায়নে চেষ্টা করতে পারব। ইতোমধ্যে প্রবাসীরা বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে। তাদের স্বেচ্ছা কোয়ারেন্টিনে থাকার কথা থাকলেও তারা কথা শোনেনি। যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। কিন্তু এখনই আমরা চিকিৎসকদের পরামর্শ শুনে, আইইডিসিআরের পরামর্শগুলো মেনে চলতে পারি। তাহলে যারা এখনো সংক্রমিত হয়নি তাদের বাঁচাতে পারি। দেশের বাইরে থেকে যেসব প্রবাসী ভাই এসেছে দয়া করে তারা আর বাইরে ঘুরবেন না, ঘরে থাকুন। আপনারা ঘরে থাকলে (কোয়ারেন্টিন) আপনার আপনজনরা বেঁচে যাবে। তা ছাড়া আপনারা প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজনরা বেঁচে যাবেন।

এই সময়টা সাধারণ ফ্লুর সময়। সর্দি-কাশি হলে গরম পানি দিয়ে গড়গড়া করুন, প্যারাসিটামল খান। এর যেহেতু কোনো চিকিৎসা নেই সে কারণে জটিল কিছু না হলে চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। কেবল শ্বাসকষ্ট হলে আপনাকে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। চিকিৎসকের কাছে গিয়ে আপনার সব উপসর্গে কথা বলুন। কোনো তথ্য গোপন করবেন না। যাদের বয়স কম তাদের কিছু হবে না। কিছু দিন পর আপনা থেকে তরুণরা সুস্থ হয়ে যাবে। আশার কথা হলো আমাদের দেশে তরুণদের সংখ্যা অনেক বেশি।

শ্বাসকষ্টটা নিউমোনিয়া হলেই হয়ে থাকে। তখন হাসপাতালে যেতে হবে। আক্রান্তদের ৮০ ভাগেরই কিছু হবে না। তারা এমনিতেই সুস্থ হয়ে যাবে। আবার সুস্থ হয়ে ওঠা অনেকের মধ্যে ভাইরাসটির বিরুদ্ধে ইমিউনিটি (প্রতিরোধক) গড়ে উঠবে। ৫০ ভাগ মানুষের মধ্যে ইমিউনিটি গড়ে উঠলে ভাইরাসটি আর টিকতে পারবে না। ধীরে ধীরে এর প্রকোপ কমতে থাকবে। অপর দিকে আক্রান্তদের মধ্যে যে ৫ ভাগের শ্বাসকষ্ট হবে এর মধ্যে কারো অক্সিজেন লাগতে পারে। এই ৫ ভাগ শ্বাসকষ্টের রোগীর মধ্যে কয়েকজনের ভেন্টিলেশনের প্রয়োজন হতে পারে। আমাদের ভেন্টিলেশন সুবিধা কি রকম তার আমাদের সংশ্লিষরা জানেন। খুব দ্রুত আরো কিছু ভেন্টিলেশন মেশিনের ব্যবস্থা করতে পারলে অনেক রোগী বাঁচানো যাবে। আমাদের শুধু ঢাকা শহরের কথা চিন্তা করলেই হবে না। ঢাকার বাইরে জেলা অথবা উপজেলা হাসপাতালে আসা রোগীদের কথাও চিন্তা করতে হবে। আমি আবারো বলব, এ সময় ঘরের বাইরে প্রয়োজন না হলে যাবেন না। বয়স্কদের বাঁচানোর জন্য চেষ্টা করতে হবে। কারণ বয়স্করাই বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। যতদূর সম্ভব পরীক্ষা করে চিহ্নিত করে চিকিৎসা দেয়া উচিত।

আমাদের চিকিৎসকরা লড়তে জানে। এখন প্রয়োজন তাদের সমালোচনা না করে সহযোগিতা করা।

লেখক: তানভীর তেহরিম

ফ্রিল্যান্স জার্নালিস্ট