চলুন ঈদের শপিং করি

ঈদের আগে শপিং মল খোলার সিদ্ধান্তে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। একজন সামান্য এপিডেমিওলজিস্ট হিসেবে আমার মনে হয়েছে, এ ধরণের সিদ্ধান্ত আত্মঘাতি। সেইসব দেশই লকডাউন শিথিল করার চিন্তাভাবনা করেছে যাদের জনপদে করোনা সংক্রমণের হার নিম্নমুখী। অথচ আমাদের দেশে করোনা সংক্রমণের হার যখন উর্ধ্বমুখী, তখনি আমরা বিভিন্ন সেক্টরে লকডাউন শিথিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। জনস্বাস্থ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে এই সিদ্ধান্তটি স্বস্তিদায়ক নয়।

প্রত্যেকটি জনস্বাস্থ্য সমস্যার যেমন একটি স্বাস্থ্যগত দিক থাকে, তেমনি এর একটি অর্থনৈতিক দিকও থাকে। এ ক্ষেত্রে যারা স্বাস্থ্য-অর্থনীতি (হেলথ ইকোনমিক্স) নিয়ে কাজ করেন, তাদের দায়িত্ব তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে আমাদের দেখানো যে কোন জনস্বাস্থ্য সমস্যার জন্য আমাদের অর্থনীতির উপর কতটুকু বিরূপ প্রভাব পড়ছে। বিশেষ করে নীতি-নির্ধারকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য এই হিসেবটা জানা খুব জরুরী।

ঈদের আগে শপিংমল ও দোকান খুলে দেবার অন্যতম কারণ সম্ভবত এর সাথে জড়িত ব্যবসায়ী এবং কর্মচারীদের অর্থনৈতিক অবস্থা। সারা বছরের প্রধান উৎসবসমূহকে কেন্দ্র করেই এসব দোকান-শপিংমলের অনেক ব্যবসায়ীই মূল ব্যবসাটা করে থাকেন। এবার নববর্ষকে কেন্দ্র করে কেনা-কাটাটা তেমন হয়নি। এরপর যদি ঈদকে কেন্দ্র করেও তাদের ব্যবসা না হয়, তাহলে অনেক ব্যবসায়ীর ব্যবসাই মুখ থুবড়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং ঢাকার বাইরের ব্যবসায়ীদের ব্যবসা বেশী ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। এ অবস্থাটাও আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে। এইসব ব্যবসায়ী- কর্মচারীদের পরিবারও তাদের উপার্জনের উপর নির্ভরশীল।

বর্তমানে পৃথিবীব্যাপী আমরা একটি অস্বাভাবিক সময় অতিক্রম করছি। প্রতি শতাব্দীতে এরকম দু:সময় দুয়েকবার হয়তো আসে। এ ধরণের বৈশ্বিক মহামারী মোকাবেলায় আমাদের সবাইকে তাই গতানুগতিকতার বাইরে গিয়ে ভাবতে হবে। কেবলমাত্র আমলাতন্ত্রের নির্বাহী আদেশ দিয়ে পার পাওয়া যাবে না, বরং সবক্ষেত্রে আমাদের নানান উদ্ভাবনী চিন্তার প্রয়োগ করতে হবে। প্রয়োজনে তথ্যপ্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

আমরা নিশ্চয়ই অনুধাবন করতে পারি যে, লকডাউন কোন দেশে অনন্তকালের জন্য চলতে পারে না। পাশাপাশি, জনস্বাস্থ্য রক্ষার্থে প্রয়োজনীয় সময়ব্যাপী লকডাউনও কাম্য। জনস্বাস্থ্য সমস্যা ও অর্থনীতির উপর তার প্রভাব, এ দুটোকে বিবেচনায় নিয়েই তাই আমাদের সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া উচিত।

এই প্রেক্ষিতেই আমার সুনির্দিষ্ট কিছু প্রস্তাব আছে। এবারের ঈদকে সামনে রেখে সারাদেশের সংখ্যাগরিষ্ট ব্যবসায়ী এবং কর্মচারীরা যাতে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ না হয়, সে জন্য শপিংমল খোলার মত সম্ভাব্য বিপর্যয়কর সিদ্ধান্ত না নিয়ে বিকল্প কিছু বিপণন ব্যবস্থার কথা আমরা ভাবতে পারি। প্রথমতই আমরা অনলাইন শপিংয়ের পরিধি বাড়াতে পারি। এর ফলে যাদের ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ আছে, তাদের অনেকেই এর মাধ্যমে ঈদের প্রয়োজনীয় শপিংগুলো সারতে পারবেন।

দ্বিতীয়ত, তথ্য প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে প্রত্যেকটা উপজেলা, এমনকী ইউনিয়ন পর্যায়েও কিভাবে বিকল্প বিপণনের ব্যবস্থা করা যায়, তা নিয়েও ভাবতে হবে। এখনো সময় আছে, আমাদের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির (বিসিএস), বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস), ব্রান্ডিং বাংলাদেশ ফোরাম, ডি নেট, ই সেবীর মত সংগঠন ও দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের মেধাবী তরুণদের নিয়ে যদি বসা যায়, তারা নিশ্চয়ই বিকল্প বিপণনের অনেক পথ বাতলে দিতে পারবেন। আমাদের তরুণদের উপর আস্থা রাখতে হবে। তাদের দায়িত্ব দিয়ে দেখুন, আমার দৃঢ় বিশ্বাস তারা চমৎকার সব কার্যকরী সমাধান নিয়ে আসবেন। আগামী তিন-চারদিনের মধ্যেই তা সম্ভব বলেই আমার ধারণা।

তৃতীয়ত, যারা অনলাইন শপিংয়ে অভ্যস্ত নন বা এর আওতার বাইরে, বিশেষ করে প্রধান শহর এলাকার বাইরে, তাদের জন্যও বিকল্প ব্যবস্থার কথা ভাবতে হবে। শপিংমলের পরিবর্তে শহর ও মফস্বলের বড় বড় মাঠে বা খোলা জায়গায় নিরাপদ দূরত্ব রেখে অস্থায়ী স্টল তৈরী করে স্বাস্থ্যবিধি মেনে কেনাকাটার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এক জায়গায় যাতে সব ভীড় উপচে না পড়ে, তাই শহরের একাধিক জায়গায় এরকম কেনাকাটার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এ সময়ে ঝড়-বৃষ্টির কথা মাথায় রেখেই স্টলগুলো নির্মাণ করতে হবে।

সরকারের প্রতি আমাদের অনুরোধ থাকবে, বিকল্প বিপণন উপায়গুলোর সদ্ব্যবহার করুন। এভাবে হুট করে শপিংমল-দোকান খুলে দেবার সিদ্ধান্ত সবার জন্য বুমেরাং হতে পারে। দেশের অধিকাংশ শপিংমল বা বাজারে দোকানগুলো আকারে ছোট। এখানে মালিক-কর্মচারী-ক্রেতার ভীড়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে কেনাকাটা করা প্রায় অসম্ভবই বলা চলে। এর ফলে দোকান মালিক- কর্মচারীসহ ক্রেতাদের মধ্যে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যাবে। পরিণতিতে আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার উপর চাপ বেড়ে যাবে, যা সামলানো কষ্টকর হয়ে উঠবে।

মানুষের বেঁচে থাকার জন্য ঈদের শপিং জরুরী না। আমি শেষ কবে নিজের জন্য ঈদের শপিং করেছি মনে পড়ে না, তবু তো দিব্যি ভালো আছি বেঁচে আছি। উৎসবের আনন্দেও ঘাটতি হয়নি কোন। তবে এবারের ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে আমাদের সবাইকে মিলে অর্থনীতিকে সচল রাখার চেষ্টা করতে হবে, কারণ অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্থ হলেও আমাদের বিপদ। করোনার হাত থেকে বাঁচতে গিয়ে নিশ্চয়ই আমরা দুর্ভিক্ষের কাছে ধরা খেতে চাই না। সে কারণেই, প্রতিকূল পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে ক্ষতিকর সিদ্ধান্তের পরিবর্তে চাই উদ্ভাবনী চিন্তাভাবনা ও তার দ্রুত বাস্তবায়ন।

দেশের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সম্প্রদায় ও কর্মচারীদের বাঁচাতে ঈদ উপলক্ষ্যে সাধ্যমত বেশী বেশী কেনাকাটা করুন, তবে তার জন্য শপিংমলের মত ভীড়ের এলাকায় গিয়ে নিজের এবং অন্যের জীবনকে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকির মধ্যে ফেলবেন না। ঘরে থাকুন, নিরাপদে থাকুন। বিকল্প বিপণন ব্যবস্থায় ঈদের কেনাকাটা করুন।

প্রতিকূল পরিবেশেও উৎসব আসে, এটাই জীবনের ধর্ম। নিরাপদে থেকে উৎসবকে উদযাপন করুন। সবাইকে ঈদের অগ্রিম শুভেচ্ছা।

লেখক

অধ্যাপক ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন

চেয়ারম্যান, ফাউন্ডেশন ফর ডক্টরস সেফটি, রাইটস এন্ড রেসপন্সিবিলিটিজ (এফডিএসআর)।