কাশ্মীর: ভারতের সব দাওয়াই ব্যর্থ

জম্মু ও কাশ্মীরের স্পেশ্যাল স্ট্যাটাস তুলে নিয়ে গত ৫ আগস্ট উপত্যকাকে আলাদা দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এরপর গতকাল আনুষ্ঠানিকভাবে ভাগ করা হয় রাজ্যটিতে। কাশ্মীরের নিজস্ব পতাকার পরিবর্তে ঝুলানো হয় ভারতের পতাকা।

ওই ঘোসণার পরই পুরো কাশ্মীরজুড়ে জারি করা হয় জরুরি অবস্থা। বন্ধ করে দেওয়া হয় মোবাইল ফোন, ল্যান্ডলাইনসহ ইন্টারনেট পরিষেবা। ফলে থমকে যায় গোটা উপত্যকার মানুষের জীবন। বন্ধ হয়ে যায় স্কুল কলেজসহ পর্যটনও।

এর ২ মাস পর আংশিক মোবাইল সেবা চালু হয়। তবে ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধই ছিল। সম্প্রতি খুলে দেওয়া হয় পর্যটন শিল্পও। তবে তাতে কোনো পরিবর্তন আসেনি। কারণ আতঙ্ক নিয়ে কেউ আসছেন না কাশ্মীরে।

কাশ্মীরের দীর্ঘদিন ধরেই বিচ্ছিনতাবাদীদের টার্গেটে ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তবে সম্প্রতি তাদের টার্গেট পাল্টেছে। এখন তাদের টার্গেটে ভীন রাজ্যের মানুষ। গত ১৫ দিনে অন্তত ২০ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে যারা ভারতের অন্যসব রাজ্য থেকে কাশ্মীরে এসেছে। এতে পর্যটকদের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়েছে।

এছাড়াও কাশ্মীরকে স্বাভাবিক দেখাতে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের একটি দলকে কাশ্মীর নিয়ে আসা হয়। তবে তাতে ঘটেছে ঠিক উল্টো। কাশ্মীরে গিয়েই বিক্ষোভের মুখে পড়েন ইউ প্রতিনিধিরা। ফলে বাতিল হয় তাদের সফর।

অন্যদিকে, মানবাধিকার লঙ্ঘন করায় ভারতের বিরুদ্ধে সুর চড়াচ্ছে আমেরিকা। এছাড়াও প্রতিদিনই ঘটছে বোমা হামলার ঘটনা। তাতে করে সাধারণ মানুষ ঘর থেকেই বের হচ্ছে না।

সম্প্রতি ভারতীয় একটি সংবাদমাধ্যম কাশ্মীরের স্থানীয় বাসিন্দাদের একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছে। তাতে ফুটে উঠেছে কাশ্মীরের বর্তমান অবস্থা। এক দোকানি বলেন, স্বাধীনতার আগে গাঁধীজি এই আন্দোলন করেছিলেন। এটাও ধরে নিন তেমনই। আমরা কি হাতের পুতুল? যখন দোকানবাজার বন্ধ রাখতে বলবে, বন্ধ রাখব, খুলতে বললে খুলব?

৫ আগস্ট ৩৭০ অনুচ্ছেদ রদের পর থেকে প্রশাসনের নির্দেশে শ্রীনগরের সমস্ত দোকানপাট বন্ধ ছিল। তার পর প্রশাসন দোকানপাট খুলতে বলছে। কিন্তু কাশ্মীরি ব্যবসায়ীরা দোকান খুলছেন না। সকালে নিত্যপ্রয়োজনের জিনিসপত্রের দোকান খুলছে ঘণ্টা দুয়েকের জন্য। তার পর সব বন্ধ। সন্ধ্যা নামলে শ্রীনগর যেন অন্ধকার মরুভূমি।

শ্রীনগরের অন্যতম পুরনো হোটেলের মালিক বলেন, উন্নয়ন আনতে গিয়ে তো পুরো পর্যটনের মরসুম চৌপাট হয়ে গেল। অগস্ট, সেপ্টেম্বর, অক্টোবর—এই তিন মাসেই তো পর্যটকেরা কাশ্মীরে আসেন। গত তিন মাসে তো হোটেলে সাংবাদিকেরা ছাড়া আর কেউ এসে থাকেননি। ‘

ট্যুরিস্ট সিজন’-এ ডাল লেকের শিকারাওয়ালাদের মাসে অন্তত ৩০ হাজার টাকা আয় হবেই। এ বার? খালি হাত। ডাল লেকের ভাসমান বাজারে মুক্তোর গয়না বেচে রোজগার করা কাশ্মীরি যুবকের গলায় অন্য ক্ষোভ, গোস্ত না হয় খেলাম না। গাজরের সবজিই খাব। কিন্তু ওরা তো মনের শান্তিটাই কেড়ে নিল। ডাল লেকের হাউসবোট মালিকের প্রশ্ন, জম্মু-পঞ্জাব-হরিয়ানা থেকে ব্যবসায়ীরা এসে না কি এখানে জমি কিনবে। ওঁরাও কি হাউসবোট নামাবেন?

মুখ খুললেই ক্ষোভ বেরিয়ে আসছে। কিন্তু লাল চকের দোকানদার থেকে ডাল লেকের শিকারাওয়ালাদের একটাই অনুরোধ—নামটা লিখবেন না। সন্ধ্যাবেলা এসে তুলে নিয়ে যাবে। পাবলিক সেফটি অ্যাক্ট-এ ভিতরে ঢুকিয়ে দেবে।

লাল চক ট্যাক্সি স্ট্যান্ডের অধিকাংশ গাড়িই হলুদ নম্বর প্লেট বদলে সাদা নম্বর প্লেট লাগিয়ে ফেলেছে। যাতে দূর থেকে ব্যক্তিগত গাড়ি বলে মনে হয়। অনেক টেম্পো-মিনি ট্রাকের মতো পণ্যবাহী গাড়ির পিছনের নম্বর প্লেট হলুদ রঙের, সামনের নম্বর প্লেট সাদা। গাড়ির চালকদের জবাব, পাথর ছোড়ার ভয় রয়েছে ঠিকই। কিন্তু যারা ছুড়ছে, তাদেরই বা দোষ কী? আমরা কেউই তো সিদ্ধান্তটা মানতে পারছি না।

এদিকে, বৃহস্পতিবার রাত ১ টা ২০ নাগাদ আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হয় দুটি গাড়ি। তারমধ্যে একটি গাড়ি বিজেপির শীর্ষ নেতা আদিল আহমেদ গনাইয়ের। ঘটনাটি ঘটেছে কুলগামের বোনিগাম গ্রামে। জানা গিয়েছে ঘটনার সময় ওই গাড়িতে ছিলেন না ওই বিজেপি নেতা। গাড়িটি তাঁর বাড়ির সামনে পার্কিং-এ রাখা ছিল।

এ থেকে বোঝাই যাচ্ছে এখনই শান্ত হচ্ছে না কাশ্মীর। এ সমস্যা ভবিষ্যতে আরও জটিল রূপ ধারণ করবে।