চোখে পানি নিয়ে দিল্লি ছাড়ছে মুসলিমরা

সাম্প্র্রদায়ীক হামলার জেরে দিল্লি ছেড়ে পালাতে শুরু করেছে মুসলিমরা। ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমের খবর অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকালে দিল্লির পরিস্থিতি একটু শান্ত হতেই ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে শুরু করে স্থানীয় মুসলিমরা।

উত্তর-পূর্ব দিল্লির একটি শহর খাজুরি খাস। এর চার নম্বর গলির মুখটায় দাঁড়িয়ে কাঁদছিলেন ৬৫ বছর বয়সী মোহাম্মদ তাহির। কাঁদছিলেন পাশে দাঁড়ানো তার দুই পুত্রবধূও। গলির মুখ থেকে তাদের বাড়িটা ছিল খান চার-পাঁচেক বাড়ির পরেই। সেই সুন্দর বাড়িটার এখন আর কোনো চিহ্ন নেই। এখন গোটা বাড়িটাই উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের দেয়া আগুনে ছাই হয়ে গেছে।

মঙ্গলবার গভীর রাতে ‘জয় শ্রী রাম’ ধ্বনি দিতে দিতে প্রায় এক হাজার যুবক ঢুকেছিল তাহিরদের গলিতে। তাদের হাতে ছিল বন্দুক, ধারালো অস্ত্রশস্ত্র। গলিতে ঢুকেই তারা মারধর শুরু করে সেখানকার বাসিন্দাদের। ঘরে ঘরে ঢুকে শুরু করে লুটপাত। তারপর একটা একটা করে বাড়িতে আগুন লাগাতে থাকে। লোকজন যে বাড়িগুলোর ভেতরে রয়েছেন, তার পরোয়াই করেনি তারা।

এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন ভুক্তভোগী মুসলিম তাহির। বাড়ি দাউদাউ করে জ্বলছে দেখে প্রাণে বাঁচতে আর কয়েক জন প্রতিবেশীর মতো তিনিও তার পরিবারের লোকজনকে নিয়ে উঠে যান ছাদে। তারপর এক এক করে সেই ছাদ থেকে পাশের বাড়ির ছাদে ঝাঁপ দেন। সেই বাড়ির ছাদ থেকে তার পরের বাড়ির ছাদে। এভাবে ছাদ টপকে টপকে তাহিররা পৌঁছে যান গলির শেষ প্রান্তে। ততক্ষণে সেখানে পৌঁছাতে পারেনি উগ্রপন্থীরা। ওইদিন এভাবে তাহিরের মতো অন্যরাও পালিয়ে প্রাণে বাঁচে।

অনেক কষ্টে বাড়িটা বানিয়েছিলেন তাহির। বুধবার বিকেলে দুই পুত্রবধূকে নিয়ে বাড়িটা দেখতে এসেছিলেন তিনি। গিয়ে দেখেন, গোটা বাড়িটাই ছাই হয়ে রয়েছে। পাশের বাড়িটারও একই দশা। তার পরেরটাও...। নিজের বাড়ির ভস্মরূপ দেখে ডুকরে কাঁদতে থাকেন তিনি। গলির মুখে এসে কাঁদতে কাঁদতে বারবার পেছনে ফিরে ছাই হয়ে যাওয়া বাড়িটার দিকে তাকাচ্ছিলেন। আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারেননি। দুই পুত্রবধূকে নিয়ে চার নম্বর গলির মুখেই বসে পড়েছিলেন তাহির।

এই কাহিনী শুধু খাজুরি খাসের নয়। মৌজপুর বাবরপুর, ভাগীরথী বিহার, সর্বত্রই ছবিটা এক। গাড়ি নিয়ে সব্জি বেচেন বছরকুড়ির মহম্মদ এফাজ, খাজুরি খাসের চার নম্বর গলির মুখে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘‘এমন ভয়াবহ ঘটনা এর আগে দেখিনি। ওদের সকলের হাতে ছিল বন্দুক, লাঠি, ধারালো অস্ত্রশস্ত্র। ওরা ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনি দিচ্ছিল। ওই ধ্বনি দিতে দিতেই গলির একের পর এক ঘরবাড়িতে ওরা আগুন লাগাতে শুরু করল। গুলি চালাচ্ছিল এলোপাথাড়ি।’’ তাঁর আড়াই মাসের মেয়েকে লক্ষ্য করেও দুষ্কৃতীরা ইট, পাথর ছুড়েছিল, জানালেন খাজুরি খাসের আর এক বাসিন্দা সিতারা। সিতারা বললেন, ‘‘ওই সময় নিজেকে দিয়ে আমার বাচ্চাটাকে আড়াল করেছিলাম। বাঁচিয়েছি ঠিকই, কিন্তু এখন ভাবছি, ওকে কী খাওয়াব, পরাব?’’

খাজুরি খাসের চার নম্বর গলির হিন্দু বাসিন্দারা কিন্তু ওই সময় তাঁদের মুসলিম পড়শিদের বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলেন। মুসলিমদের ঘরবাড়িগুলি যখন পুড়ছে, তখন তাঁরা নিজেদের বাড়ি থেকে বালতির পর বালতি জল ঢেলে আগুন নেভানোর চেষ্টা করেছিলেন। পারেননি, জানালেন চার নম্বর গলির এক হিন্দু বাসিন্দা। যিনি কিছুতেই তাঁর নাম জানাতে চাইলেন না। ভয়ে, যদি এর পর তাঁর উপরেও চড়াও হয় দুষ্কৃতীরা।

গলিতেই থাকতেন দিনমজুর মহম্মদ আরিফ। বিজয় পার্ক এলাকায় দিনদু’য়েক আগে একটি কাজ পেয়েছিলেন আরিফ। জানালেন, এই ঘটনার পর তিনি প্রাণে বাঁচতে সম্ভলে চলে যাচ্ছেন। সব কিছু ছেড়েছুড়ে।

গলিতে গলিতে ঢুঁ মেরে দেখা গেল, গত রবিবার থেকে টানা হিংসার ঘটনার পর খাজুরি খাস, মৌজপুর বাবরপুর, ভাগীরথী বিহারের মুসলিম এলাকাগুলি খাঁ খাঁ করছে।

বাড়িগুলি ছাই, তাই আক্ষরিক অর্থেই, শ্মশানের চেহারা নিয়েছে এলাকাগুলি।