কাউকে পেছনে ফেলে নয়— আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস আজ

আজ ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মিল রেখে বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে দিবসটি। প্রতি বছর এই দিনে বিশ্বজুড়ে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষার জন্য এই বিশেষ দিনটি পালন করা হয়ে থাকে।


১৯৯৪ সালে জাতিসংঘের গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৯৯৫ সাল থেকে ৯ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস পালন করে আসছে বিশ্বের প্রায় ৩০ কোটি আদিবাসী। ১৯৯২ সালে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের উন্নয়ন ও সংরক্ষণ উপকমিশনের কর্মকর্তারা তাদের প্রথম সভায় আদিবাসী দিবস পালনের জন্য ৯ আগস্টকে বেছে নেন। আদিবাসী জনগণের মানবাধিকার, পরিবেশ উন্নয়ন, শিক্ষা ও সংস্কৃতি সম্পর্কিত বিভিন্ন সমস্যা নিরসনের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সুদৃঢ় করা ও গণসচেতনতা সৃষ্টি করাই বিশ্ব আদিবাসী দশক, বর্ষ ও দিবস পালনের মূল উদ্দেশ্য।


বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ‘আদিবাসী’ শব্দটি ব্যবহার না করার বিষয়ে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সেক্ষেত্রে ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের মধ্যে বিরাট একটি অংশ দেশের পার্বত্য অঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকায় বাস করে। বাংলাদেশে বাংলা ছাড়াও ৪০টি ভাষা রয়েছে। যার প্রায় সবই ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর। তবে এসব ভাষার অধিকাংশই এখন বিলুপ্তির পথে। কার্যকর ব্যবহার ও উদ্যোগ না থাকায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করেন গবেষকরা।


তারা বলেন, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষা হারিয়ে যাওয়ার প্রধান কারণ তারা নিজেরাই। সরকার সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে। তারপরও নিজেদের ভাষা রক্ষা করতে পারছে না ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীরা। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার স্বার্থে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষা-সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখা প্রয়োজন।


জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তনিও গুতেরেস আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস ২০২২ উপলক্ষে তাঁর বাণীতে বলেছেন, ‘এই দিনে আমরা ঐতিহ্যগত জ্ঞান সংরক্ষণ ও বিকাশে আদিবাসী নারীর অবদান ও ভূমিকাকে গুরুত্ব সহকারে তুলে ধরছি। আদিবাসী নারীরাই ঐতিহ্যগত খাদ্যব্যবস্থা এবং ঐতিহ্যগত ওষুধপত্রসহ বিশেষ জ্ঞানের ধারক। এই নারীরা নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণে চ্যাম্পিয়ন। তারা পরিবেশ সংরক্ষণ ও নিজের জাতির মানবাধিকার সুরক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। “কাউকে পেছনে ফেলে নয়”—এই স্লোগান বাস্তবায়ন এবং একটি সমতাভিত্তিক সমাজ ও টেকসই ভবিষ্যৎ গড়তে হলে আদিবাসী নারীর কণ্ঠকে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত করতে হবে। আদিবাসীদের ঐতিহ্যগত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা আমাদের অনেক যৌথ চ্যালেঞ্জ সমাধানে অবদান রাখতে পারে। আমি সম্প্রতি সুরিনাম সফরে গিয়েছিলাম। এই সফরে আমি প্রথম শিখেছি, কীভাবে আদিবাসীরা রেইনফরেস্ট এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করছে।’


জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসে সব সদস্য রাষ্ট্রকে জাতিসংঘ আদিবাসী অধিকার ঘোষণাপত্র বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়ে বলেন, সদস্য রাষ্ট্রসমূহকে তাদের ঐতিহ্যগত জ্ঞান বিকাশে ভূমিকা রাখতে হবে, যাতে সবাই উপকৃত হয়।


জাতিসংঘের মতে, বিশ্বের ৯০টি দেশে ৪৮ কোটি ইনডিজিনাস পিপলস বা আদিবাসী রয়েছে। এদের কোনো কোনো দেশে ফার্স্ট নেশনস, এবরিজিনাল, নেটিভ পিপল, ট্রাইবাল, জনজাতি ইত্যাদি নানা নামে অভিহিত করা হয়। এসব জনজাতি মানুষ দরিদ্রদের মধ্যেও দরিদ্রতম, অধিকতর প্রান্তিক। তারা ঐতিহাসিকভাবে শোষণ, বৈষম্য, বঞ্চনা ও অবিচারের শিকার, যাকে জাতিসংঘ বলছে হিস্টরিকাল ইনজাস্টিস। করোনার কারণে জনজাতিদের অবস্থা আরও শোচনীয় হয়েছে। আমরা করোনার সময় সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছিলাম, এদের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক প্রণোদনা সহায়তা দেওয়া হোক। কিন্তু করোনা-সহায়তা হিসাবে তাদের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো বরাদ্দ বাজেটে রাখা হয়নি। এমনি নানারকম অবহেলা উপেক্ষার মধ্য দিয়ে আমরা এই দিবস উদ্‌যাপন করছি।


আমরা শুধু আশা করব, দেশে সংখ্যালঘু জাতিসত্তার জীবনধারা, মৌলিক মানবাধিকার, ভাষা ও সংস্কৃতি, আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার সম্পর্কে সদস্য রাষ্ট্র, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম, সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ সবাই আরও বেশি সচেতন হবেন, সংবেদনশীল হবেন। এটিই এই দিবস উদ্‌যাপনের মূল লক্ষ্য।


বাংলাদেশ সরকার বিশ্বের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার, স্বীকৃতি ও দাবির প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তবে নৃ-তাত্ত্বিক ও সাংবিধানিকভাবে বাংলাদেশে কোনো সুনির্দিষ্ট কোনো আদিবাসী জনগোষ্ঠী নেই। বাংলাদেশের ভূমিজ সন্তান বা আদি বাসিন্দা হলো এখানকার মূল জনগোষ্ঠী যারা নানা পরিচয়ের পরিক্রমায় বাঙালি বলে পরিচিতি লাভ করেছে। কিন্তু বিগত শতকের শেষ দশকে বাংলাদেশে বিভিন্ন সময় আগত, বিশেষ করে ভারত ও মিয়ানমার থেকে ৭০০ থেকে ৩০০ বছর আগে আগত বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, যাযাবর, তপশিলি সম্প্রদায় বিদেশি বিভিন্ন দাতা দেশ ও সংস্থার ইন্ধনে নিজেদের আদিবাসী বলে দাবি করে স্বীকৃতির জন্য আন্দোলন শুরু করে। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলোর এই আদিবাসী স্বীকৃতির দাবি কোনো সাধারণ ও মামুলি ব্যাপার নয়। এর সঙ্গে জাতীয় সার্বভৌমত্ব, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, অখণ্ডতা, সরকারের কর্তৃত্ব ও মর্যাদার প্রশ্ন জড়িত। সে কারণে বিগত আড়াই দশক ধরে বাংলাদেশের সরকারসমূহ এ বিষয়ে নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রেখে চলেছে। বিশেষ করে বর্তমান সরকার এ বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর ও বলিষ্ঠ নীতি প্রদর্শন করেছে।